জীববিজ্ঞানটিপসবিবিধ

দেহঘড়ির গল্প

“মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি,
বানাইছেন কোন মিস্তিরি!”

হ্যা, এবার তবে দেহঘড়ির সন্ধান পাওয়া গেল অবশেষে! এর পেছনে রয়েছে তিন মার্কিনীর অক্লান্ত পরিশ্রম আর সাধনা! যার ফলে জেফরি সি হল, মাইকেল রসবাশ এবং মাইকেল ডব্লিউ ইয়ং ২০১৭ সালের চিকিৎসাবিদ্যার নোবেল টা ছিনিয়ে নিলেন।

মানুষের দেহঘড়ির কাঁটা টিক্ টিক করে কী বলে? বলে, ঠিক্ ঠিক্ ঠিক্ ঠিক্! কি ঠিক্ ঠিক্? ঠিক্ ঠিক্ কাজ করো। এই যেমন, সকাল ছয়টায় স্ট্রেস বা উদ্বেগ-দুশ্চিন্তা তৈরির হরমোন কর্টিসলের প্রবাহ ঘটে, সকাল নয়টার দিকে রক্তচাপ বাড়ে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে, দুপুর বারোটার আগে আগে মস্তিষ্ক সজাগ থাকে সবচেয়ে বেশি, দুপুর বারোটার পর সমন্বয়ের কাজ হয় সবচেয়ে ভাল, বিকেল তিনটে নাগাদ প্রতিক্রিয়া জানানোর কাজটা হয় খুব দ্রুত, সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত শরীরের তাপমাত্রাও থাকে সবচেয়ে বেশি। এরপর? সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত নয়টার ভেতর রক্তচাপ বাড়ে সবচেয়ে বেশি। রাত নয়টার দিকে শুরু হয় রাত পছন্দকারী আলোক সংবেদনশীল হরমোন মেলাটোনিনের নিঃসরণ। রাত বারোটা থেকে রাত তিনটা পর্যন্ত গভীর ঘুমের সময়। রাত তিনটা থেকে শরীরের তাপমাত্রা কমতে থাকে। ভোর ছয়টায় আবার ঠিক্ ঠিক্ শুরু হয় করটিসলের মুক্তি। ঠিক্ ঠিক্ যদি দেহঘড়ির সময় মেপে দেহটা না চলে, তবে? দেহঘড়ির তালে না চললে ‘জেট ল্যাগ’ শব্দটি শুনতে হয়। রাতের ঘুম রাতে না ঘুমিয়ে জেগে থাকলে কি হয়? পরদিন চেহারা দেখেই অন্যরা বুঝে নেবে, শরীর ভাল নেই। যারা রাতজাগার কাজ করেন বা রাতে অনিদ্রা রোগে ভোগেন, তাদের খুব ভয়ে থাকতে হয়। ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হৃপিন্ডের অসুখ, স্থুলতা আর বিষণ্ণতায় ভুগতে হয় এদেরকেই বেশি।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই তিন বিজ্ঞানী গবেষণা করেছেন ফলের উপর বসে এমন এক মাছির দেহঘড়ি নিয়ে। নোবেল পুরস্কারটাও মিলেছে এই মাছিরই কল্যাণে। প্রকৃতির সাথে মেলানো মাছির ঘড়ি সময়মতো ঘুম পাড়ায়, জাগিয়ে তোলে। জিন কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, তা বুঝতে গিয়ে ১৯৯০ সালে হল এবং রসবাশ ডিএনএ এবং প্রোটিনের মধ্যবর্তী খবরবহনকারী আরএনএ’র একটি ধাপ খুঁজে পান। এই ধাপ নিয়ন্ত্রণ করে কখন প্রোটিন জিন-এর কর্মকাণ্ডকে থামিয়ে দেবে।
ঘড়ি তো মাত্র এক বছরের হিসাবের উপর স্থির। বিজ্ঞানী ইয়ং এমন একটি জিন খুঁজে পেলেন, যা সময়ের কোন ধার ধারে না। এ সময়হীন। এই জিন’এর প্রোটিনের নাম টিআইএম, যা জিন-এর কর্মকাণ্ডকে থামিয়ে দিতে সক্ষম প্রোটিনের সাথে কাজ করে ঘড়িটাকে চালায়। ঘড়ির কাঁটা কতটুকু পরে পরে গিয়ে টিক্ করবে, তা যেমন দাগ কাটা থাকে ঘড়ির ডায়ালে, সেভাবে ডিবিটি নামের প্রোটিন ঠিক করে দেহঘড়ির কতটুকু সময় পর পর টিক্ করবে। এরকম আরও অনেক বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করার পর বিজ্ঞানীত্রয় বুঝতে পারলেন, প্রাণীর প্রায় প্রতিটি কোষে একটি করে ঘড়ি সেট করা আছে। একই তালে চলে প্রতিটি কোষ-ঘড়ির প্রায় সব জিন। কোন কোন জিন তাল দেয় যকৃতে, কেউ ত্বকের কোষে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবে চলে সব কাজ। কোষ-ঘড়ির একটার সাথে আরেকটা তাল না মিললেই কিন্তু সর্বনাশ!

বিজ্ঞানী জোসেফ তাকাহাশি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, সিএমওয়াইসি এবং পি৫৩ নামের জিনদ্বয় কোষের বৃদ্ধি আর বিভাজনে সাহায্য করে। বিজ্ঞানীরা এখন জানেন, দেহঘড়ি টিক্ না করে উঠলে এরা নিজের থেকে এ কাজগুলো করে না। ঘড়ি ঠিক্ না থাকলেই কোষ ক্যান্সারের মতো কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও সংক্রমণ করতে বাধ্য হয় হয়তো। এর উল্টোটাও ভাবা যায়। ক্যান্সার এবং অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে ঘড়ির টিক্-এর সাথে মিলিয়ে ঔষুধ দেওয়া সম্ভব করা যায় কি না, বিজ্ঞানীরা দেখছেন।

মাছির দেহঘড়ির উপর ভিত্তি করে মানুষের দেহঘড়ি খুঁজে পাওয়ার কাজটা জোরদার হবে। মূল ক্লু যেহেতু মিলে গেছে, মানুষসহ সব প্রাণের দেহঘড়ির সন্ধান পাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার। ঘড়ির দোকানে নানান নকশার ঘড়ি সাজিয়ে রাখা হয়। এবার বিজ্ঞানীরা সাজাবেন সব প্রাণীর দেহঘড়ি।

দেহঘড়ির কথা এর আগেও একবার উঠেছিল বিজ্ঞানী মহলে। ১৯৭১ সালে সেইমর বেনজের আর রোনাল্ড কোনোপকা ফলের মাছির উপরই গবেষণা করেছিলেন। তাঁরা দেখেছিলেন, এই মাছির জিনে এক ধরনের পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে এর শরীরের তালটা কেটে যায়। তখন এ অকারণে দিনের নানান সময়ে উড়ে বেড়ায়। তাল না কাটলে ওড়ে না। মাছির এই জিনটাকে সনাক্ত করতে ১৯৮৪ সালে হল আর রসবাশ-এর নেতৃত্বে ব্রান্ডিস ইউনিভার্সিটির জিনবিজ্ঞানীদের দল গবেষণা শুরু করলেন। একই সময় রকফেলার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়ং মাছির ঐ জিনটির ডিএনএ-র পাঠোদ্ধার করতে ব্যস্ত হলেন। বেশ কয়েক বছর পর এক কনফারেন্সে আসার পর ইয়ং জানলেন হল আর রসবাশ কী করছেন। তিনজনের গন্তব্য একটাই বুঝে গেলেন। সেই থেকে কাজ করছিলেন একসাথে।

প্রেস কনফারেন্সে রসবাশ মজা করে বলছিলেন, নোবেল কমিটি ভোর সকালে টেলিফোন করে তাঁকে ঘুম থেকে উঠিয়ে তাঁর দেহঘড়ির কাজকে ঠিক্ থাকতে দেয়নি। পুরস্কার পাওয়ার খবর দিয়ে তাঁকে হতবাক করা হয়েছে। তিনি দম নিতে পারছিলেন না। তাঁর স্ত্রী তখন দম নিতে বললেন বলে বাঁচা!

তথ্যসূত্র – ইন্টারনেট

আপনার মতামত লিখুন :

Back to top button
Close