জীব রসায়নপরিবেশপৃথিবী

অ্যামাজনের নদীর ৮০% মাছের পেটেই প্লাস্টিক!

প্লাস্টিকের ভয়াবহতা নিয়েছে নতুন মোড়! আর তাও আমাদের অজান্তেই...

অ্যামাজন বন আর এর নদীব্যবস্থা, আধুনিক বিশ্বের সাথে জড়িত এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর যে এই দুই নাম শুনেনি। অ্যামাজনের নদীর বহমান ধারা বিশ্বের স্বচ্ছ পানি আর দূষণমুক্ত পানির উদাহরণ ছিল বিশ্বের কাছে। কিন্তু সম্প্রতি এক গবেষকদলের করা গবেষণা থেকে উঠে এলো বাকরুদ্ধ করা হতাশাজনক আর কষ্টদায়ক সত্য! ষিঙ্গু (Xingu) নদী, যা আমাজনের নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম নদী মানব সভ্যতার অন্যতম অভিশাপ প্লাস্টিক দ্বারা দুষিত! অথচ ১,৯৭৯ কিলোমিটার লম্বা এই সুবিশাল ষিঙ্গু নদী যা কিনা Freshwater বা স্বচ্ছ – শুদ্ধ পানির একটা সমাদৃত উৎস, তাতেই পাওয়া মাছেদের দেহ পরীক্ষা করে ৮০ শতাংশেরো বেশি মাছের দেহতে পাওয়া গিয়েছে প্লাস্টিক বর্জ্য!
ভাবা যায়, দুষণ কতদূর পৌছে গিয়েছে?!
সেই সুদুর, প্রত্যন্ত অঞ্চল আমাজনের নদীটা পর্যন্ত রেহাই পায়নি আমাদের দূষণের করাল থাবা থেকে!
ষিঙ্গুর একশো বাহাত্তরটা (১৭২) নমুনা মাছ (Specimen) নিয়ে পরীক্ষা করে দেখা গেল সেগুলোর আশি শতাংশেরো বেশি মাছের দেহে ১ – ১৫ মিলিমিটারের প্লাস্টিক বর্জ্যের উপস্থিতি রয়েছে! এদের কোনোটা দুই গ্রাম ওজনের, তো কোনোটা কেজিখানেক ওজনের। বাদ যায়নি কোনোটাই!
ভাবা যায়, কি বিভৎস ব্যাপার?
তাও যে এগুলোর উপস্থিতি মাছেদের খাদ্যাভ্যাসের উপর ভিত্তি করে পাওয়া গিয়েছে তেমন নয়! মাংশাসি (Carnivorous), তৃণভোজী (Herbivorous) আর মিশ্রভোজী (Omnivorous), উভয় প্রকার খাদ্যাভাসের মাছের মধ্যেই পাওয়া গিয়েছে এইসব প্লাস্টিক বর্জ্য।


কেবলমাত্র ৪৬টা মাছের পেটেই পাওয়া গিয়েছে ৯৬টা প্লাস্টিকের টুকরা! এইসব মাছেদের মধ্যে রয়েছে লালপেট পিরানহা (Red Bellied Piranha) , লালপাখা ডলার মাছ (Redhook Silver Dollar) প্রভৃতি। এগুলোর পেটে পাওয়া প্লাস্টিক বর্জ্যগুলো মূলত ব্যাগ, বোতল, নিত্যব্যবহার্য প্লাস্টিক আইটেমেরই টুকরো বা অবশিষ্টাংশ। সবচে বড় কথা হল খোদ গবেষক দলের কাছেই এটা ছিল স্তব্ধ করে দেয়ার মত বিষয়! কেননা তাদের নাইবা উদ্দেশ্য ছিল এমন কিছু খুঁজে পাবার, নাইবা তারা এমন কোনো গবেষণায় গিয়েছিলেন!
এপ্রসঙ্গে গবেষণা দলের যুগ্ম নথি লেখক Federal University of Pará এর Tommaso Giarrizzo বলেন, “ব্যাপারটা আমাদের কাছে কষ্টদায়ক চমক ছিল কারণ প্রাথমিকভাবে আমাদের উদ্দেশ্য ছিল মাছেদের খাদ্যাভাসের উপর গবেষণা চালানো। কিন্তু যখন আমরা একাজ করতে গিয়ে মাছেদের পাকস্থলী পরীক্ষা করি, তখনি আমরা পাই প্লাস্টিক!”
তিনি আরো বলেন, “এই ব্যাপারটা টনক নাড়িয়ে দেবার মত বটে, কেনোনা এগুলোর সংখ্যা গোটা অ্যামাজন অববাহিকা (Basin) জুড়ে বেড়েই চলেছে)।”
প্লাস্টিকগুলোর পলিমার বিভিন্নভাবে পানিতে গিয়ে মিশছে যা বাহারী রঙের হওয়াতে তৃণভোজী/প্লাংকটনভোজী এবং মিশ্রভোজী মাছেরা সেগুলোকে উদ্ভিজ খাদ্য ভেবে খেয়ে বসছে। আকারে এত ছোট হওয়াতে অনেকসময় খেয়ালও করতে পারছেনা। আর সেইসব মাছগুলো থেকে যেগুলোকে শিকারী মাছগুলো খাচ্ছে সেইসূত্রে তাদের দেহতে যাচ্ছে প্লাস্টিকগুলো। আর সেখান থেকে আবার কোথায় ফিরবে?
ফিরবে আমাদের কাছেই। আমাদের খাদ্য হয়ে। দেহে মিশে গিয়ে জন্ম দিবে নানা রোগবালাইয়ের। Federal University of Pará এর Marcelo Andrade এ প্রসঙ্গে বলেন, “ব্যাপারটা জেনে খুবই ভয়াবহ মনে হল যে পরীক্ষা করা মাছের প্রজাতীগুলোর ৮০ শতাংশই প্লাস্টিক ভক্ষণের শিকার। যেখানকার অনেকগুলোকেই অ্যামাজনের মানুষ খাবার হিসেবে খায়। প্লাস্টিক দূষণ সারা পৃথিবীজুড়েই এখন মানবজাতির কাছে বিশাল এক হুমকি।”

নদী সমুদ্রের পানিতে প্লাস্টিক দূষণের উৎসগুলোর একটা হলেও এতদিন প্লাস্টিক দূষণের ব্যাপারটা সাগর আর এর উপকূলীয় অঞ্চলকে তুলে ধরেই প্রকাশ করা হত। কিন্তু সম্প্রতি পাওয়া এই তথ্য বিজ্ঞানী, গবেষক আর জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে পাশাপাশি নদীর দিকেও। গবেষণা বলছে শুধুমাত্র অ্যামাজন নদীর অববাহিকা থেকেই বছরে ছিষট্টি হাজার (৬৬,০০০) টন প্লাস্টিক বর্জ্য গিয়ে মিশছে সাগরের সাথে। পরিমাণটা কত বেশি বুঝতে পারছেন? ছয় কোটি ষাট লক্ষ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য!
সাগরে মেশা প্লাস্টিক বর্জ্যের শতকরা ৯০ ভাগই আসে পৃথিবীর দশটি নদীর অববাহিকা থেকে, যার মাঝে আটটিই হল এশিয়ায় আর দুইটি আফ্রিকায়। এখন এদের কাতারে চলে এলো ল্যাটিন আমেরিকার ব্রাজিলও…
প্লাস্টিক বর্জ্য যেখান থেকেই মিশুক না কেনো চলমান পরিস্থিতি আর গবেষণালব্ধ ফলাফল আমাদেরকে এটাই নির্দেশ করে যে তা ক্রমে ছড়াচ্ছে। এবং কোনো না কোনোভাবে প্রাণিদেহে মিশে গিয়ে পরে আমাদের কাছে, আমাদের দেহতেই ফিরে আসছে!
Giarrizzo বলেন, “যদিও মানুষ দ্বারা মাইক্রোপ্লাস্টিক (প্লাস্টিকের ক্ষুদ্রকণা ও টুকরো) গ্রহণের মাত্রাটা আমাদের জানা নেই, তবু এটা বিশ্বজুড়ে বেশ বড় রকমের স্বাস্থ্য সচেতনতার ব্যাপার, যেহেতু অ্যামাজন পৃথিবীর নদীর মাছদের সবচে বড় পূর্বসঞ্চিত খাদ্যভান্ডার।”

এতদিন প্লাস্টিক বর্জ্যের দুষণের ব্যাপারে কেবলমাত্র সাগর আর সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল, বেলাভুমি বা সমুদ্র সৈকত এইসব জায়গার উপরই আলোকপাত করা হয়েছে বেশি। কিন্তু ব্যাপারটা যখন অ্যামাজনের মত বৃহত্তর বনের ব্যাপারে হয় যা গোটা পৃথিবীর বাস্তুসংস্থানের সাথে খুব ভালভাবে এবং প্রগাঢ় ভুমিকার সাথে জড়িত, সেক্ষেত্রে নদীতে প্লাস্টিক দুষণের ব্যাপারটা রাষ্ট্রগুলোর নজরে আনাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ আর জরুরী ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে।

এপ্রসঙ্গে Cardiff University Water Research Institute এর যুগ্ম পরিচালক প্রফেসর Steve Ormerod বলেন, “যদিও বেশিরভাগ প্রচারণা আর জোর দেয়া হয় বিশ্বের সমুদ্রগুলোর পরিবেশের উপরই, কিন্তু (গবেষণালব্ধ) এই নথিগুলো এই বিষয়টারই ক্রমবর্ধমান প্রমাণ প্লাস্টিক বর্তমানে নদীসমূহের বাস্তুসংস্থানেও খুব বড় রকমের ঝুঁকি।”

সুতরাং সবকিছু স্বাপেক্ষে বলা চলে, বিশ্বে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সাথে সাথে তাল মিলিয়ে বাস্তুসংস্থনের প্রতি আমাদের সৃষ্ট বহু হুমকির মাঝে অন্যতম বড় হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে এখন প্লাস্টিক। প্লাস্টিক খুব ক্ষুদ্র কণার রুপে গিয়ে মিশছে মাছেদের দেহে, অন্যান্য প্রাণিদেহে। মিশে মিশে চলে আসছে সাগর থেকে আনা লবণেও। সেই থেকে চলে আসছে অতি পরিচ্ছন্ন প্রক্রিয়ায় যাচাই বাছাই করে বানানো আর বাজারজাত করা তথাকথিত “শুদ্ধ” লবণের প্যাকেটগুলোতেও! এমনকি প্রতিনিয়ত মিশছে আমাদের খাবারের পাত্র বা পানি রাখার ঐ নিরিহ বোতলটা থেকেও! অন্যান্য পশুপাখির মত যাচ্ছে আমাদের দেহতেও। ক্রমেই বাড়াচ্ছে নানারকম রোগবালাই ঝুঁকি। যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই ঘণঘণ যাকে তাকে দুরারোগ্য রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হবার মধ্যে! কথায় যেমন বলে “যেমন কর্ম তেমন ফল” ঠিক তেমন করেই আমাদের, গোটা মানবজাতির করা পরিবেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ক্ষতি থেকে শুরু করে বৃহত্তর ক্ষতি, প্রতিটা ক্ষতিরই বাজে প্রভাব পড়ছে আমাদের উপর। আজ আমরা সানন্দে একের পর এক পন্যদ্রব্য কিনে পলিথিনে এনে বা দোকান থেকে আকর্ষণীয় দেখতে কোনো পানীয় কেনে বোতলখানা আর ঐ পলিথিনখানা যেখানে ইচ্ছে সেখানে ফেলে দিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু নিয়তির আমোঘ বিধানের মত কর্মফল হয়ে তা বিষের মত আমাদের কাছেই ফিরে আসছে!

তবে এতোকিছুর মাঝেও, মানব সভ্যতার ভয়াবহ অভিশাপ এই প্লাস্টিক আর এর বিকল্প নিয়ে চলছে প্রতিনিয়ত বহু গবেষণা। তৈরী হচ্ছে প্লাস্টিকের বিকল্প নিত্য ব্যবহার্য্য জিনীস, উদ্ভাবন হচ্ছে আরো, যাতে রয়েছে আমাদের বাংলাদেশী গবেষকেরো অবদান! বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ওয়ান টাইম প্লাস্টিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। সেইসাথে ক্রমেই বাড়ছে প্লাস্টিক ব্যবহারের ভয়াবহতার প্রচারণা আর সচেতনতামূলক কার্যক্রম। তবে এতটুকুই যথেষ্ট নয়। আমাদের দরকার আরো বেশি প্রচারণা, আরো বেশি সচেতনতা। পাশাপাশি এই দূষণ রোধে প্রতিটা দেশের সরকার, আর প্রতিটা জেলা,বিভাগ, রাজ্য, রাষ্ট্র প্রভৃতির প্রশাসনকেও এবিষয়ে হতে হবে আরো অনেক বেশি সচেতন। যারা এইসব উৎপাদনের সাথে জড়িত, তাদের অন্তত ভাবা উচিত নিজেদের ব্যাপারে। নিজেদের পরিবার আর ভবিষ্যত প্রজন্মের ব্যাপারে। কি রেখে যাবে তারা তাদের জন্যে? আধুনিকতায় মোড়ানো আগামীর পৃথিবীর আকাশে – বাতাসে – পানিতে বিষ? তাই এব্যাপারে সবাই সচেষ্ট হলে যে সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন আমরা দেখি তা ফিরিয়ে আনাটাও অবাস্তব কিছু নয়! দুষণ পুরোপুরি নির্মূল না হয়ে গেলেও আমরা আশা করতেই পারি, দেখতেই পারি স্বপ্ন সুন্দর, স্বচ্ছ এক আগামীর…

প্রিয় পাঠকগণ, আজ তবে এ পর্যন্তই। আবারো হয়তো ফিরবো নতুন কোনো বিষয় নিয়ে আপনাদের কাছে। ততক্ষণ ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিজের, আপনজনের আর পরিবেশের খেয়াল রাখুন। আর বিজ্ঞানবর্তিকার সাথেই থাকুন।

তথ্যসূত্রঃ
https://www.iflscience.com/plants-and-animals/plastic-has-been-found-in-the-stomachs-of-amazon-fish-for-the-first-time/

https://www.google.com.bd/amp/s/amp.theguardian.com/environment/2018/nov/16/sad-surprise-amazon-fish-contaminated-by-plastic-particles

আপনার মতামত লিখুন :

Back to top button
Close