পরিবেশপৃথিবী

এন্টার্কটিকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দুঃস্বপ্ন

অ্যান্টার্কটিকায় হিমায়িত বরফের শীতে বিশ্বের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি জল বিস্তৃত রয়েছে, তবে পরবর্তী শতাব্দীতে মানবতার সিদ্ধান্তগুলি সেই জলকে অপরিবর্তনীয়ভাবে সমুদ্রের মধ্যে প্রেরণ করতে পারে। প্রি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল লেভেলের উপর ভিত্তি করে যদি বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি অবধি বাড়ে তবে একা অ্যান্টার্কটিকা গলে শেষ পর্যন্ত বিশ্ব সমুদ্রের স্তর ছয় মিটারেরও বেশি বাড়িয়ে তুলতে পারে। পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার গড় তাপমাত্রার দীর্ঘকালীন বৃদ্ধিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বলা হয়। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের একটি প্রধান দিক। ২৩ সেপ্টেম্বর Nature  জার্নালে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা অনুযায়ী যদি গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর মাত্রা প্রতিনিয়ত চেক করা না হয় এবং পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়া না হয় তবে অ্যান্টার্কটিকা এমন এক সীমা অতিক্রম করে যাবে যা থেকে আর ফিরে আসতে পারবে না এবং যা এই মহাদেশকে ৩০ মিলিয়নেরও বেশি সময়ে প্রথমবারের মতো অনুর্বর, বরফ-মুক্ত করতে পারে! মোটেও ব্যাপারটা আমাদের জন্য সুখকর নয়।

“প্রায় ৩৪ মিলিয়ন বছর ধরে অ্যান্টার্কটিকা মূলত পৃথিবীর ইতিহাসে আমাদের চূড়ান্ত ঐতিহ্য,’’ – জার্মানির পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের (পিআইকে) গবেষক এক বিবৃতিতে বলেছেন, “এখন আমাদের সিমুলেশন দেখায় যে এন্টার্কটিকার বরফ একবার গলে গেলে , তা প্রাথমিক অবস্থায় ফিরে আসেনা , এটি একটি অত্যন্ত অসম্ভব দৃশ্য! অন্য কথায়: অ্যান্টার্কটিকার কাছে যা হারায়, তা চিরতরে হারিয়ে যায়।

PIK গবেষকরা আধুনিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের কারণে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা কীভাবে বৃদ্ধি পায় তার উপর নির্ভর করে এখন থেকে হাজার হাজার বছর পর অ্যান্টার্কটিকা কীভাবে দেখাবে তা মডেল করার জন্য কম্পিউটার সিমুলেশন চালিয়েছিলেন। তারা দেখেছেন যে কোনো স্থায়ী সময়ের জন্য প্রি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল লেভেলের গড় তাপমাত্রা ৭.২ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পর্যন্ত বৃদ্ধি পেলে পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার বেশিরভাগ বরফ চূর্ণবিচূর্ণ হবে, এতে বৈশ্বিক সমুদ্রের উচ্চতা ২১ ফুট (৬.৫মিটার) বৃদ্ধি পাবে; এই পরিমাণে বৃদ্ধি নিউ ইয়র্ক, টোকিও এবং লন্ডনের মতো উপকূলীয় শহরগুলিকে ধ্বংস করে দেবে। কয়েক দশকের মধ্যে এই দৃশ্য বাস্তবরূপ ধারণ করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত জাতিসংঘের আন্তঃসরকারী প্যানেল (আইপিসিসি) অনুসারে,যদি বর্তমান গ্রীনহাউস গ্যাস ২১০০ সাল পর্যন্ত প্রতিনিয়ত নির্গমন হতে থাকে তবে গড় তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বৃদ্ধি (৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) পাবে। বর্তমানে উষ্ণায়নের পরিস্থিতিটিকে “সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি” হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

যদি এই আইপিসিসির অনুমানগুলি বন্ধ থাকে তবে সিচ্যুয়েশন অনেক বেশি খারাপ হতে পারে, নতুন গবেষণা থেকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা যদি আসন্ন সহস্রাব্দ ধরে যে কোনও স্থায়ী সময়ের জন্য প্রি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল লেভেলের উপরে ১১ এবং ১৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৬ থেকে ৯ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) এর মধ্যে বেড়ে যায়, তবে অ্যান্টার্কটিকার বর্তমান সময়ের বরফের ৭০% এরও বেশি গলে যেতে পারে যা আর পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যাবে না।( যেসব গবেষকরা অনুসন্ধান চালিয়েছেন তাদের মতে।) এবং, যদি তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (১০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) বেড়ে যায়, তবে এই মহাদেশটি ” বরফ-মুক্ত” হয়ে যাবে। মহাদেশটি যদি তার সমস্ত বরফ হারায় তবে বিশ্ব সমুদ্রের স্তর প্রায় ২০০ ফুট (৫৮মিটার) বৃদ্ধি পাবে! কী ভয়ংকর! যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ লিডস-এর জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু শেফার্ড এর মতে, পুরো প্রভাবগুলি প্রায় ১৫0,000 বছর ধরে দেখা যায় নি তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন, মানবজাতির এই শতাব্দীতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস করার ব্যর্থতা একটি অপরিবর্তনীয় প্রতিক্রিয়াচক্রকে ট্রিগার করতে পারে যা সহস্রাব্দ ধরে অ্যান্টার্কটিকার ভাগ্যকে সীলমোহর করে।

গবেষকদের মতে, অ্যান্টার্কটিকার বরফের স্তর দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে- একদিকে মূল ভূখণ্ডে নোঙর করা বড় বড় বরফ প্লেট এবং অন্যদিকে সমুদ্রের উপরে অবাধে ভাসমান বরফখন্ড- যা একটি বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে উষ্ণ সমুদ্রের জল বরফের স্তরের নীচ দিয়ে চলে, ফলে বরফ যখন পানির সাথে মিলিত হয় (একে গ্রাউন্ডিং লাইনও বলা হয়)তখন তা বরফের স্তরকে অস্থিতিশীল করে তোলে এবং মূল ভূখণ্ড থেকে প্রচুর পরিমাণে বরফকে সমুদ্রের দিকে সরিয়ে দেয়। জিওফিজিকাল রিসার্চ লেটারস জার্নালে ২০১৯ এর এক গবেষণা অনুসারে, পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার অনেক বরফখন্ড ইতিমধ্যে খন্ডে খন্ডে ভেঙ্গে সমুদ্রে ভেসে গিয়েছে, প্রায় ২৫% অঞ্চলের বরফ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।  

অ্যান্টার্কটিকার ভাগ্য বর্তমান পৃথিবীর নীতিনির্ধারকদের হাতে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, যাতে ৭৩টি দেশ ২০১৫ সালে সম্মত হয়েছিলো (এবং রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্র জুন ২০১৭ এ পরিত্যাগ করেছিলেন), যার লক্ষ্য ছিলো জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ প্রভাব দূর করার জন্য প্রি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল লেভেল অনুসারে গড় তাপমাত্রা ২.৭ ডিগ্রী ফারেনহাইট (১.৫ সেন্টিগ্রেড) এর চেয়ে বেশি বাড়ানো থেকে সতর্ক থাকা। এই বছরের শুরুর দিকে গ্রিন হাউজ নির্গমন ক্ষুদ্র পরিমাণে কমে গেলেও, মহামারী চলাকালীন জনগণকে পৃথক করে দেওয়ার কারণে, এ মাসের শুরুর দিকে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন সতর্ক করেছে যে প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত লক্ষ্যগুলি অর্জনের জন্য বিশ্ব বর্তমানে ট্র্যাকে নেই। ২০১৬ থেকে ২০২০ এর মধ্যে বিশ্বব্যাপী গড় তাপমাত্রা প্রাক-তাপমাত্রার চেয়ে ২ ডিগ্রি ফারেন্হাইট (১.১ সেন্টিগ্রেড) এর উপরে রয়েছে। 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে ২০২৪ সালের মধ্যে বার্ষিক বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা কমপক্ষে অস্থায়ীভাবে ২.৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট(১.৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড) এর বেশি বেড়ে যাওয়ার ২০% সম্ভাবনা রয়েছে। সময় খুবই কম, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হলেও আমাদেরকে এন্টার্কটিকা বাঁচাতে হবে, বন্ধ করতে হবে এই চরম বিপর্যয় সৃষ্টিকারী দুঃস্বপ্ন গুলো।

তথ্যসূত্রঃ livescience.com

 

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close