ঔষধদৈনন্দিন বিজ্ঞান

মানসিক সমস্যার এ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট ঔষধ যেভাবে প্রভাব ফেলছে প্রাণিজগতে

কদল বিজ্ঞানীদের করা এক গবেষণায় সম্প্রতি এমন চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য উঠে এসেছে

Antidepressant ঔষধের ব্যাপারে অনেকেই হয়তো জানি। অনেকে নামও শুনেছি কয়েকবার।
এজাতীয় ঔষধ হল মানসিক সমস্যার জন্যে প্রচলিত ঔষধ। যেহেতু নামেতেই Depressant কথাটা আছে সেহেতু বুঝার কথা অনেকেরই যে এধরণের ঔষধ ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা, মানসিক চাপ, উদ্বেগ, হতাশা, দুশ্চিন্তা বা এনজাইটি, প্যানিক এঅ্যাটাক ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হয়। এবং যেহেতু এই সমস্যাগুলো বিশ্বজুড়েই সব জায়গার মানুষের মাঝেই কমবেশি রয়েছে, সেহেতু এই গোত্রের ঔষধ সব বিশ্বের সব দেশের সাইকিয়াট্রিস্টরাই দিয়ে থাকেন এবং এটি সাইকিয়াট্রিক ড্রাগ বা ঔষধগুলোর মধ্যে অন্যতম বহুল প্রচলিত ঔষধ।

কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এল মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহার হওয়া এইসব এ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট ঔষধ প্রাণিজগতের উপরও প্রভাব ফেলছে। এগুলো যে মানুষের উপরেও প্রভাব ফেলে না তা না। যেমন ক্লোনাজেপাম জাতীয় তাবৎ বিশ্বে বহুল প্রচলিত এ্যান্টিডিপ্রেসিভ এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ক্ষুধামন্দা, ঝিমুনি ভাব, নিজের ক্ষতি করার চিন্তা, এমনকি উলটো বিষণ্ণতা বেড়ে যেতে পারে! মানুষের বেলাতেই যেখানে এমন ভয়াবহ সব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে সেখানে এ জিনিষ অন্যান্য পশুপাখিদের মাঝে ছড়িয়ে গিয়ে কি অবস্থা করছে ভাবুন একবার!

U.S. Geological Survey (USGS) এর একদল বিজ্ঞানীদের করা এক গবেষণায় সম্প্রতি এমন চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য উঠে এসেছে! USGS এর বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আমেরিকার Fourmile Creek এর পানিতে থেকে নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করা মাছের উপর গবেষণা চালিয়ে যা পেয়েছেন তাতে ব্যাপারটা অবাক করার মত ছিল! তারা একটি চোষক মাছ (Sucker Fish) এর ব্যবচ্ছেদ করা মস্তিষ্কের নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছেন সেখানে মানুষের জন্যে দেয়া এ্যান্টিডিপ্রেসিভ এর উপস্থিতি রয়েছে!
শুধু কি তাই? একই জিনিষের উপস্থিতি Fourmile Creek এর পানিতেও পাওয়া গেছে।
সবচে অবাক করা ব্যাপার হল যেসব লোকালয় উৎস থেকে মানুষের ব্যবহৃত বর্জ্য এসে নালা’টিতে মিশছে, উক্ত এ্যান্টিডিপ্রেসিভ এর নমুনা তার থেকে ৮ কিলোমিটার জুড়ে পাওয়া গেছে! অর্থাৎ এ জিনিষ ছড়িয়েছে বহুদূর! সেই সাথে এগুলো বয়ে নিয়ে যাচ্ছে পরিবেশের জন্যে, বিশেষ করে প্রাণীকুলের জন্যে বিরাট ঝুঁকি।

তবে উপরের দিকের মূল স্রোতে আবার এই ঔষধ উপাদানের দেখা মেলেনি। কিন্তু তারপরেও ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
USGS এর বিজ্ঞানীরা প্রভাবটি দেখার জন্যে Colorado এর নিকটবর্তী Boulder Creek আর
Ankeny এর নিকটবর্তী Fourline Creek, এই দুই নালার স্রোত আর তাতে পাওয়া প্রাণীদের উপর গবেষণা চালান। যার মাঝে মিশে যাওয়া মিউনিসিপালিটির পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার মধ্যে দিয়েই ছড়িয়েছে এগুলো।

তবে পানিতে পাওয়া এ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট এর ঘনত্বের মাত্রার সাথে মাছের দেহের টিস্যুতে পাওয়া এ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট এর ঘনত্বের মাত্রা সম্পৃক্ত নয়। মাছের দেহে পাওয়া ড্রাগগুলো নির্ভর করে তার দেহ কোনধরনের এ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট নিচ্ছে তার উপর।।
এক্ষেত্রে গবেষণার জন্যে মাছের মস্তিষ্ককেই কেন ঘেঁটে দেখা হল তা অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে। কারণ যেকোনো এ্যান্টিডপ্রেস্যান্ট হল নার্কোটিক বা স্নায়বিক ঔষধ। এগুলো বানানোই হয় এমনভাবে যেন তা দেহের অন্য কোথাও না, সরসরি গিয়ে মস্তিষ্কেই কাজ করে এবং যেন মেজাজ, চিন্তা, ভাবনার সাথে সম্পৃক্ত উপাদান Serotonin, Dopamine, Nor-Epinephrine (নর এপিনেফ্রিন) এর মত নিউরোট্রান্সমিটার এ প্রভাব ফেলে।
গবেষক-দল গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য ঘেঁটে দেখেছেন নির্দিষ্ট কিছুধরণের এ্যান্টিডিপ্রেসিভেরই উপস্থিতি রয়েছে সেখানকার পানিতে৷ যার মধ্যে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার পানি আর নালার নিম্নস্রোতে সবচে বেশি পাওয়া গিয়েছে venlafaxine (ভেনলাফ্যাক্সিন), bupropion (বুপ্রোপিওন), ও citalopram (সিটালোপ্রাম) জাতীয় এ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট। এবং মাছেদের মস্তিষ্কের টিস্যু ঘেঁটে সবচে বেশি পাওয়া গিয়েছে যে এ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট উপাদানগুলো, সেগুলো হল fluoxetine (ফ্লুওক্সিটিন), norfluoxetine (নর্ ফ্লুওক্সিটিন যা fluoxetine এর রুপান্তরিত ড্রাগ), sertraline (সের্ট্রালিন) এবং norsertraline (নর্ সের্ট্রালিন, যা সেট্রালিন এর রুপান্তরিত ড্রাগ)।

অপরদিকে আরেক গবেষণায় দেখা গেছে যে,

শালিকজাতীয় স্টার্লিং (Starling) পাখিদের মাঝে স্ত্রী পাখি খাবারের মাধ্যমে এ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট Fluoxetine (Prozac) গ্রহণের ফলে তাদের মাঝে পুরুষদের প্রতি আকর্ষণের মাত্রা কমে যাচ্ছে। ফলাফলস্বরুপ স্বাভাবিকভাবে যৌনক্রিয়ায় (Mating) যেমন লিপ্ত হবার কথা, তা হচ্ছেনা। আর এর সুদূরপ্রসারী পরিণতি ইঙ্গিত করে প্রাণীদের মাঝে বংশবিস্তারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত হওয়াকে! ফলস্বরুপ তারা তাদের প্রজনন প্রক্রিয়াতে কেবল আগ্রহই হারাচ্ছেনা, প্রজননেও ঘাটতি দেখা যাবার সম্ভাবনা রয়েছে!

উল্লেখ্য আমেরিকানরা এ্যান্টিডিপ্রেসেন্টকে সকাল-সন্ধ্যার নাশতা আর স্ন্যাকস (হাল্কা খাবার) এর মত করে গেলে। এদের মাঝে প্রযুক্তির ব্যবহার, তথাকথিত আধুনিকায়ন এর হার যেমন বেশি তেমনি হতাশার মাত্রাও বেশি আর হতাশা থেকে বাচার জন্যে এদের গণহারে হতাশা ও মানসিক সমস্যা নিরোধক বড়ি নেয়ার হারও অনেক বেশি। তবে এইসব ঔষধের প্রচলন আর ব্যবহার আমেরিকায় মাত্রাতিরিক্ত হলেও বিশ্বের বহু দেশেও তা বাড়ছে। আজকাল দেখবেন মানসিক সমস্যায় ভোগা মানুষের সংখ্যা দিনকে দিন আগের যেকোনো সময়ের চাইতে অনেক বেশি চোখে পড়ে। নগরায়ন আর প্রযুক্তির বিরূপ প্রভাব হোক বা সমাজব্যবস্থা, কোনো না কোনোভাবে এর প্রকোপ বাড়ছেই। আর সমস্যার প্রকোপ বাড়া মানেই হচ্ছে সমাধানের দিকে ঝোঁক বাড়া, সমাধান খুঁজতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা ক্রমে বাড়তে থাকা!

মানসিক সমস্যা থেকে বাচতে মানুষ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছে এবং ঔষধ নিচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রেতো অনেকে ক্লিনিক্যাল কোনো পরামর্শ ছাড়াই বড়ি নিচ্ছেন!
উল্লেখ্য, স্নায়বিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রভাব বিস্তারকারী এইসব এ্যান্টিডিপ্রেসিভ কিন্তু খাবার পরেও আমাদের পুষ্টিক্রিয়ায় পুরোপুরি দেহের সাথে মিশে যায়না। যার অনেকখানিই পরিপাক ক্রিয়ায় বেড়িয়ে আসে অপসারিত বর্জ্যের সাথে। সেইসব বর্জ্য আমাদের ধারণার অজান্তেই বয়ে নিয়ে যায় এইসব ড্রাগ বাসার কমোড বা প্যানের লাইন থেকে একেবারে পয়ঃনিষ্কাশন প্রণালিতে। সেখান থেকে অপসারণ অঞ্চল এবং সেখান থেকে পানিতে। আর পানি থেকে তা ছড়াচ্ছে মাছে, পাখিতে, অন্যান্য প্রাণিতে।
আর এদিকে মানবজাতি নির্বিঘ্নে ড্রাগগুলো ব্যবহার করেই যাচ্ছে।
এটা নিঃসন্দেহে একধরনের পরিবেশ দূষণ, কিন্তু তা ঘটছে এতোটাই সূক্ষ্মভাবে যে বুঝা যাচ্ছেনা। অথচ এর ফলাফল যখন অনবরত চোখে পড়া শুরু করবে, তখন হয়তো অনেক বেশী দেরি হয়ে যাবে।

ফলাফলের প্রসঙ্গ আসাতে বলতে হয়, যে কেনো? আদতে এটা নিয়ে এত চিন্তিত হবার কি আছে?
কিছু মানুষের মনে এমন প্রশ্ন আসতেই পারে! আমি এমনও উচ্চশিক্ষিত (!) মানুষ দেখেছি যিনি জোর গলায় বলেন সুন্দরবনের বাঘ না থাকলে আমাদের এমন আহামরি কি ক্ষতি হয়ে যাবে? সাথে আরো কিছু প্রাণী টিকে না থাকলেই বা কি? তাতে তো আমাদের কিছু যায় আসেনা!
অথচ সত্য এটাই যে আমরা না থাকলে এই ধরিত্রীর কিছু যায় আসেনা। আমরা যেই প্রযুক্তিতে “সভ্য” হতে শুরু করেছি, তখন থেকেই একের পর এক পরিবেশের ক্ষতি করেই চলেছি। প্রতিটা প্রাণীই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার সাথে কোনো না কোনোভাবে জড়িত আছেই। আর তাদের জীবনব্যবস্থায় প্রভাব পড়া মানে গোটা প্রাকৃতিক পরিবেশে তার প্রভাব পড়া। এবং আমরা ঐ একই পরিবেশের অংশ হওয়াতে ঘুরেফিরে সেটার প্রভাব আমাদের উপর পড়তে বাধ্য! সেটা কেউ নাক সিটকে অমান্য করুক বা কেউ জোর গলার স্বীকার করুক।

এধরণের দুষিতকরণের ফলাফল সুদূরপ্রসারী। আজ মাছ আর পাখির মাঝে এর সমস্যা উপস্থিতি ধরা পড়েছে। তা এদের থেকে বাস্তুসংস্থানের উচ্চশ্রেণীর খাদকের কাছে ছড়াবে। বিভিন্ন পর্যায়ের প্রাণীদের বংশবিস্তার আর আচরণে চলে আসবে বিপর্যয়। এবং তা এদের থেকে প্রভাব ফেলবে উদ্ভিদকুলের মাঝেও। এবং যেহেতু আমরা মাংসাশী (Carnivorous) হই বা তৃণভোজী (Herbivorous) বা মিশ্রভোজী (Omnivorous) হই, উপাদানগুলো ঘুরেফিরে গাছপালা আর প্রাণী দুই ক্ষেত্রেই ছড়িয়ে গিয়ে আরো বাজেভাবে আমাদের কাছেই ফিরে আসবে।
এবং গণহারে নির্বিচারে তা আমাদের সবার মাঝেই ছড়াবে।
শুধুই কি তাই?
এমন একটা কৃত্রিম উপাদানের হুট করে প্রাণীদের মাঝে ছড়িয়ে যাওয়ায় তা তাদের মিউটেশন ও অন্যান্য জৈবরাসায়নিক ক্ষেত্রেও একেবারে গোড়া থেকে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। যার ফল হতে পারে খুব ভয়াবহ কিছু!

সমস্যা থেকে উত্তরণের দায়িত্বটাও তাই আমাদের উপরই। এসবক্ষেত্রে আরো বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকেই হয়তো বের হয়ে আসতে পারে কোনো সম্ভাব্য সমাধানের পথ। পাশাপাশি নির্বিচারে এ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট ব্যবহারের বেলাতেও সচেতনতা সৃষ্টি করা উচিত। কারণ ঔষধগুলো কিন্তু আমাদেরো কম ক্ষতি করার ঝুঁকিতে রাখছেনা। এগুলোর মাত্রা, ব্যবহারে বিধিনিষেধ ইত্যাদির ব্যাপারে আরো সচেতন হওয়া জরুরী। সমস্যা থেকে উত্তরণের পাথেয় হিসেবে এগুলোর প্রচলন বন্ধ করা সম্ভব নয় ঠিকই, তবে আশা রাখা যায় সমস্যা সমাধানের ভাল কোনো বিকল্প চলে আসবে নিশ্চই।

আজ আমাদের আলোচনা এপর্যন্তই। পরেরবার আবারো আসবো অন্য কোনো বিষয় নিয়ে হয়তো। ততক্ষণ, ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিজের খেয়াল রাখুন আর বিজ্ঞানবর্তিকার সাথেই থাকুন।

তথ্যসূত্রঃ theconversation.com ,  toxics.usgs.gov , independent.co.uk

আপনার মতামত লিখুন :

Back to top button
Close