রিভিউ

বই রিভিউ: ‘কৃষ্ণ বিবর’ – জামাল নজরুল ইসলাম

কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে আমাদের সবারই কম বেশি আগ্রহ রয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের এক বিরাট বিস্ময় এই কৃষ্ণগহ্বর, যার সম্পর্কে অনেক জটিল গণিত ও উচ্চতর পদার্থবিজ্ঞানের অবতারণা ঘটলেও এর ভেতরের ঘটনা সবারই অজানা।মহাবিশ্বের সেই জটিল ও রহস্যময় বস্তু সম্পর্কে জানার প্রয়াসে সম্প্রতি একটি অতি জনপ্রিয় বই পড়লাম। ছোট্ট পাতলা এই বইটি দুই মলাটে কৃষ্ণ বিবর সম্পর্কে একেবারে মূল কথাগুলো তুলে এনেছে। প্রথমে বইটির ব্যাপারে জানতে পারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। জ্যোতির্বিজ্ঞানে আমার প্রবল আগ্রহের ফলে সেই প্রথম দেখাতেই মনস্থির করে ফেলি যে বইটি আমি যেভাবেই হোক পড়ব। আমাকে পড়তেই হবে, তা না হলে আমি এর সম্বন্ধে উচ্চতর বইগুলো পড়তে পারব না। যেই ভাবা, সেই কাজ। যদিও মাঝে একটা লম্বা সময় চলে গিয়েছে, একদিন বাংলা একাডেমি গিয়ে বইটা কিনেই আনলাম। হাতে নেওয়ার পর একাবারে আপনাআপনি মন থেকে বলতে লাগলাম – ‘পাইলাম ইহাকে পাইলাম।’

বইটি আমাদের দেশের প্রথিতযশা বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্যার অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম –এর লেখা ‘কৃষ্ণ বিবর’। । বইটি প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি। সর্বপ্রথম প্রকাশ হয় ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে (১৩৯২ বঙ্গাব্দের পৌষে)। বর্তমান প্রকাশনার বইটি মূল বইয়ের দ্বিতীয় পুনর্মুদ্রণ, যা প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে (১৪২৪ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে)। বর্তমান মুদ্রণের গায়ে মুদ্রিত মূল্য ১৪০ টাকা।  ৬২ পৃষ্ঠার এই বইটি কৃষ্ণ গহ্বর সম্পর্কে আপনি যা যা জানতে চান, তার একদম সুন্দর একটি মূলরেখা টেনে দিয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানের জটিল জটিল শব্দ আর ধারণা এখানে খুব সাবলীল ভাষায় ব্যাখ্যা করে গেছেন লেখক।

১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলা একাডেমি ১০১ টি বই নিয়ে প্রকাশ করে ‘ভাষা শহিদ গ্রন্থমালা’। উক্ত গ্রন্থমালার একটি উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে স্যার অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম –এর ‘কৃষ্ণ বিবর’। নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে বইটি শুধুমাত্র একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের উপর নির্ভর করে লেখা। এখানে নাম থেকে যেমন সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, তেমনি বইটিতেও কোনো রকমের জটিলতা ছাড়াই মূল বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

স্যার অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম
সূত্র: বিডি নিউজ ২৪ ডট কম

বইটির লেখক সম্পর্কে আমি এই লেখায় আলাদা করে কিছুই বলছি না। তার কারণ, তিনি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের একজন আর তার সম্পর্কে কমবেশি আমরা সবাই জানি। আমি সরাসরি আমার মূল রিভিউ তে প্রবেশ করছি।

কৃষ্ণ বিবর বইটির সম্মুখ প্রচ্ছদ
সূত্র: বিজ্ঞানদর্শন

বইটিতে মোট পাঁচটি অধ্যায় রয়েছে, যাদের আগে রয়েছে দু-পৃষ্ঠার একটি ভূমিকা এবং শেষে উপসংহার ও গ্রন্থপঞ্জি। অধ্যায়গুলো হল:

১। পদার্থবিদ্যার কিছু তথ্য ও তত্ত্ব

২। নক্ষত্রের তিন ধরনের মৃত্যু

৩। কৃষ্ণ বিবর ও কোয়েসার

৪। কৃষ্ণ বিবর চিরস্থায়ী নয়

৫। বিশ্বের নিয়তিতে কৃষ্ণ বিবরের ভূমিকা

এই পাঁচটি অধ্যায়ে পর্যায়ক্রমে ও ধৈর্য্য সহকারে লেখক কৃষ্ণগহ্বরের একটি সংক্ষিপ্ত ছবি এবং এর ভেতরকার জটিল বিজ্ঞানকে অনেকটা সহজভাবে তুলে ধরার যে চেষ্টা করেছেন, তাতে পুরোপুরি সফলতা অর্জন করেছেন।

এবার আসি বইয়ের ভেতরের আলোচনায়।

কৃষ্ণ বিবর বইটির পেছনের প্রচ্ছদ
সূত্র: বিজ্ঞানদর্শন

প্রথম অধ্যায়: পদার্থবিদ্যার কিছু তথ্য ও তত্ত্ব

শুরুতেই খুব সংক্ষিপ্ত ও সহজবোধ্য ভাষায় সর্বস্তরের পাঠকের জন্য দেওয়া হয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক কিছু ধারণা, যা কৃষ্ণ বিবর/ গহ্বরের মূল আলোচনায় প্রবেশের আগে খুব সংক্ষিপ্ত একটি পরিচিতি। এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:

  • মৌলিক কণাসমূহ
  • মৌলিক বলসমূহ
  • আণবিক পদার্থবিজ্ঞানের কিছু মৌলিক ও প্রয়োজনীয় ধারণা
  • তড়িত-চুম্বক তরঙ্গ
  • প্রাসঙ্গিক অতি সংক্ষিপ্ত কিছু ইতিহাস
বৃহৎ বিস্ফোরণ
সূত্র : ফোর্বস

দ্বিতীয় অধ্যায়: নক্ষত্রের তিন ধরনের মৃত্যু

এ অধ্যায়ের মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে নক্ষত্রের তিন ধরনের মৃত্যু বা পরিণতি। একটি নক্ষত্র জন্ম থেকে কীভাবে এর ধাপে ধাপে এর শেষ পরিণতির দিকে ধাবিত হয় এবং এদের এহেন পরিণতির জন্য পূর্ব-নির্ধারিত কোন কোন উপাদান কাজ করে বা প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে তা অতি সংক্ষেপে কিন্তু অত্যন্ত পরিষ্কার ও সাবলীল ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। বর্ণিত বিষয়গুলোর একটি তালিকা করলে তা দাঁড়ায়:

  • নক্ষত্রের জন্ম
  • নক্ষত্রের জ্বালানী ব্যয় ও সক্তি উৎপাদন
  • নক্ষত্রের শক্তি উৎপাদন বা জ্বালানী শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে এর চূড়ান্ত অবস্থায় পদার্পণের ধারা বিবরণ
  • ফার্মি চাপ বা অধঃপতিত ইলেক্ট্রন চাপ
  • নক্ষত্রের তন ধরনের পরিণতির জন্য আলাদা আলাদা পূর্বশর্ত
একটি তারার জন্ম
সূত্র: আর্থ স্কাই

তৃতীয় অধ্যায়: কৃষ্ণ বিবর ও কোয়েসার

এ অধ্যায়ে সরাসরি কৃষ্ণ গহ্বর ও কোয়েসার সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। এই অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয়গুলোর তালিকা:

  • কৃষ্ণ বিবর জন্মের পূর্বশর্ত
  • কৃষ্ণ বিবরের ঘটনা দিগন্ত
  • ঘূর্ণায়মান কৃষ্ণ বিবর
  • কেন কৃষ্ণব বিবর থেকে কোনো আলো বাইরে যেতে পারে না
  • কৃষ্ণ বিবরে ঢোকার পর কোনো বস্তুর অবস্থা কী হতে পারে
  • কী কী জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উপায়ে আমরা একটি অদৃশ্য কৃষ্ণ বিবরকে সনাক্ত করতে পারি
  • কোয়াসারের সংক্ষিপ্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ
  • কোয়েসার ও কৃষ্ণ গহ্বরের মধ্যকার সম্পর্ক
শিল্পীর চোখে কোয়েসার
সূত্র: উইকিপিডিয়া

চতুর্থ অধ্যায়: কৃষ্ণ বিবর চিরস্থায়ী নয়

এ অধ্যায়টি আমার মতে এই বইটির সবচেয়ে মজার ও আকর্ষণীয় একটি অধ্যায়। এতদিন আমরা সাধারণ জনগণ বা বিজ্ঞানপ্রিয় মানুষেরা জেনে এসেছি কৃষ্ণ গহ্বর সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলে। কিন্তু এই কৃষ্ণ বিবরের স্থায়িত্ব নিয়ে আমরা আপাতদৃষ্টিতে তেমন একটা মাথা কখনই ঘামাইনি। কিন্তু এই অধ্যায়ের নামে এবং ভেতরের আলোচনায় একেবারে সুস্পষ্ট করে উল্লেখ করা আছে যে – কৃষ্ণ বিবর চিরস্থায়ী নয়। এর কারণ, কৃষ্ণ গহ্বর থেকেও এক প্রকার বিকিরণ নির্গত হয়, যা এই সর্বগ্রাসীকেও ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের দিকে ত্বরাণ্বিত করে। এই অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয়ের সংক্ষিপ্ত তালিকাটি নিম্নরূপ:

  • চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান ও কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের কণা সম্পর্কিত মৌলক ধারণা
  • কৃষ্ণ বিবর থেকে নির্গত বিকিরণের কারণ ব্যাখ্যা
  • কৃষ্ণ বিবরের চূড়ান্ত বিলুপ্তি
  • সবশেষে মজার কিছু তথ্য
কৃষ্ণ গহ্বর
সূত্র: দ্য নেক্সট ওয়েব

পঞ্চম অধ্যায়: বিশ্বের নিয়তিতে কৃষ্ণ বিবরের ভূমিকা

বইটির শেষ অধ্যায়ে মহাবিশ্বের ভাগ্যের সাথে কৃষ্ণ গহ্বরের আচরণের সূক্ষ্ম বিষয়টি নিয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব কিছু মতবাদ, দর্শন এবং মন্তব্য প্রকাশ করেছেন। আলোচ্য বিষয়গুলোকে সংক্ষেপে প্রকাশ করলে:

  • বৃহৎ বিস্ফোরণ
  • প্রসারণশীল মহাবিশ্ব
  • উন্মুক্ত, বদ্ধে এবং সমতল মহাবিশ্ব ধারণার ব্যাখ্যা
  • উন্মুক্ত মহাবিশ্বের নিয়তি
  • কোয়ান্টাম সুড়ঙ্গকরণ (quantum tunneling) এর ব্যাখ্যা
  • শ্বেত বামন বা নিউট্রন নক্ষত্র থেকে কৃষ্ণ গহ্বরে রুপান্তরের ধারাবাহিকতা
  • প্রোটন –ক্ষয় ধারণা এবং বিশ্বের নিয়তি
  • মানব জাতির ভবিষ্যৎ
একটি সুপারনোভা

এছাড়াও, পুরো বইটি জুড়ে নানা চমকপ্রদ ও মস্তিষ্কপ্রসূত অনেক ধারণা ও মজার তথ্য রয়েছে। যেমন- সূর্যের সমান আকারের কোনো নক্ষত্র কৃষ্ণ বিবরে পরিণত হতেপারবে কি না, পৃথিবীকে একটি কৃষ্ণ বিবরে পরিণত করলে এর ব্যাসার্ধ কত হবে, আবার একটি ছোট পাথরের সমান ভরের কোনো কৃষ্ণ গহ্বরের আসলে ব্যাসার্ধ কত, একটি ক্ষুদ্র কৃষ্ণ গহ্বর বিস্ফোরিত হলে এর ফল কী হতে পারে, ইত্যাদি।

বইটি সম্পূর্ণ পদার্থবিজ্ঞানকে আশ্রয় করে লেখা। কৃষ্ণ গহ্বরের আলোচনা পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম জটিল, উচ্চতর এবং অগ্রসরমান বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। উচ্চতর পদার্থবিজ্ঞানে নানা ঘটনার সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যার জন্য উচ্চতর ও জটিল গণিতের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। নানা ঘটনা সংশ্লিষ্ট, বিশেষতঃ কৃষ্ণ গহ্বরের নানা ঘটনার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যায় তৎসংশ্লিষ্ট গণিত অনেক উচ্চতর পর্যায়ের এবং অনেক জটিলও বৈ কি, যা সর্বসাধারণের বোধগম্য নয়। তাই লেখক নানা ঘটনার অবতারণায় তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে উক্ত স্থানে গাণিতিক ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সর্বস্তরের পাঠকের জটিলতা কমাতে তিনি সেই জটিল ব্যাখ্যার দিকে অগ্রসর হন নি।

সবশেষে লেখকের আহ্বান ছিল, এই মহাবিশ্বের সকল ঘটনা এবং বস্তুকেই একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে অবলোকন করা। কেননা, তিনি মনে করেন, প্রতিটি সাধারণ ঘটনাকে একটু গুরুত্ব এবং বিশেষ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখলে সেই সাধারণ ঘটনাটিও অসাধারণ হয়ে যায়। আমাদের এই সুবিশাল মহাবিশ্ব এরকম অসংখ্য ঘটনার সমাহার যা আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে হয়তো তেমন একটা মনোযোগই দেই না।

কৃষ্ণ বিবর বইটি আকারে ছোট বা পুস্তিকা হলেও বাংলা ভাষায় এই বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। যারা আমার মত বাংলাভাষী এবং বাংলায় বলতে ও বাংলায় চিন্তাভাবনা করতে স্বচ্ছন্দ্যবোধ করেন – সেই সকল বিজ্ঞানপ্রেমী পাঠকের জন্য বইটি স্বররগের সুরার মতই মোহনীয় এবং মূল্যবান, কারণ বাংলাভাষায় এমন মৌলিক বিজ্ঞানের সর্বজনপাঠ্য ও সহজবোধ্য বই কমই আছে।

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close