জীববিজ্ঞানরসায়ন

রসায়নে এক নতুন আবর্তন ও বিবর্তন – পর্ব ১

২০১৮ সালে রসায়ন বিভাগে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হন মোট তিনজন বিজ্ঞানী

এ বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে রসায়ন বিভাগে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হোন মোট তিনজন বিজ্ঞানী। যাঁদের অবদান হচ্ছে, বিবর্তনের ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করে তা তারা মানবজাতির কল্যাণের জন্য ব্যবহার করেন। এই তিনজন বিজ্ঞানী হচ্ছেন, ফ্রান্সেস এইচ আর্নোল্ড (Frances H. Arnold), জর্জ পি স্মিথ (George P. Smith) এবং স্যার গ্রেগরি পি উইন্টার (Sir Gregory P. Winter)।
আমরা এমন এক গ্রহে বাস করছি যেখানে বিবর্তনের মত এক শক্তিশালী মাধ্যম প্রতিষ্ঠালাভ করেছে। বিবর্তনের ক্ষমতা বা সামর্থ্য জীবনের বৈচিত্র্য বা বিভিন্নতা থেকেই উন্মোচিত হয়েছে যা সহজেই উপলব্ধ। আজ থেকে প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে যখন প্রথম জীবনের উদ্ভব এই পৃথিবীতে ঘটে সেদিন থেকেই পৃথিবীর প্রতিটা কোণায় কোণায় বিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া জীবই তাদের স্থান করে নিয়েছিল। লাইকেন (lichens), যা শৈবাল ও ছত্রাকের মিথোজীবিতার ফল, সেই জীব নগ্ন পর্বতের চূড়ায়ও বেঁচে থাকতে পারে; আর্কিয়া (archaea) নামের এককোষী জীব অত্যাধিক তাপমাত্রায়ও টিকে থাকতে পারে; আঁশটে সরীসৃপ উষ্ণ মরুভূমিতেই বিকাশলাভ করেছে এবং জেলিফিশ (jellyfish) অতল সমুদ্রের গহীন আঁধারেও তার দীপ্তি ছড়ায়।

নির্দেশিত বিবর্তনের (directed evolution) মাধ্যমে এনজাইমের উন্নতিসাধন করে তা এখন জীবাশ্ম জ্বালানি ও ঔষধ প্রস্তুতকারকসহ অন্যান্য নানা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। নির্দেশিত বিবর্তন অনুপ্রাণ বিজ্ঞান (molecular biology) -তে ব্যবহৃত এমন এক কৌশল যেখানে প্রোটিন সম্পাদনের জন্য সরাসরি প্রাকৃতিক নির্বাচন পদ্ধতিকেই অনুকরণ করা হয়, এবং তা আকাঙ্ক্ষিত ফলাফলকে লক্ষ্য করেই করা হয়ে থাকে।
ফাজ ডিসপ্লে (phage display) পদ্ধতি ব্যবহার করে এমনভাবে অ্যান্টিবডির (Antibody) বিকাশ ঘটানো হয়েছে যা স্ব-অনাক্রম্য রোগের (autoimmune diseases) বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে; কিছু ক্ষেত্রে মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সার (metastatic cancer, বা পর্যায়-৪ ক্যান্সার, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রাগ্রসর ক্যান্সার বা advanced cancer নামেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে পরিচিত; যখন ক্যান্সার শরীরের নির্দিষ্ট জায়গা থেকে অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়ে) -এর প্রতিকারও করে। ফাজ ডিসপ্লে পদ্ধতিতে ব্যাক্টেরিওফাজকে ব্যবহার করে প্রোটিনকে তার জেনেটিক তথ্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত করার জন্য প্রোটিন-প্রোটিন, প্রোটিন- পেপটাইড (অ্যামিনো এসিডের সংক্ষিপ্ত শিকল) এবং প্রোটিন-ডিএনএ এর এক প্রকার পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার পর্যালোচনা করা হয়।

স্কুলের জীববিজ্ঞানে আমরা এসব জীব সম্পর্কে জেনেছি। এখন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি একটু পরিবর্তন করি চলুন। এবার আমরা একজন রসায়নবিদের চোখ দিয়ে এই জীবগুলোকে উপলব্ধি করব। পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্ব আছে কারণ বিবর্তন অনেক জটিল রাসায়নিক সমস্যাকে সমাধান করে দিয়েছে। সব জীবই তাদের উপযুক্ত প্রাকৃতিক বাসস্থান (niche) থেকে নানা উপকরণ ও শক্তি আহরণে সক্ষম এবং তা ব্যবহার করে তারা এক অনন্য রাসায়নিক বুননের সৃষ্টি করে, যে বুনন দ্বারা তারা গঠিত।
মাছের অতি নিম্ন তাপমাত্রার মেরু সমুদ্রে সাঁতার কাটতে পারার কৃতিত্ব এর রক্তে উপস্থিত জমাটরোধী প্রোটিনগুলোর। তেমনি পাথরের গায়ে লেগে থাকার জন্য ঝিনুকও এক ধরনের আণবিক আঠার বিকাশ ঘটিয়েছে যা জলের তলায় কার্যকর। এগুলো হচ্ছে প্রকৃতির অসংখ্য উদাহরণের মধ্যে মাত্র কয়েকটি। জীবনের রসায়নের সৌন্দর্য আমাদের জিন যেভাবে নকশা করে রেখেছে তার মধ্যেই নিহিত হয়ে আছে, এবং তা বংশপরম্পরায় স্থানান্তরযোগ্য ও বিকশিত। জিনের মধ্যে যেকোনো ক্ষুদ্র যাদৃচ্ছিক পরিবর্তন এই সংগঠনে পরিবর্তন আনতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন কোনো জীবকে দুর্বল করে দিতে পারে অথবা দুর্বল জীবের উদ্ভব ঘটাতে পারে, আবার অনেক ক্ষেত্রে এটি অনেক বলিষ্ঠ কোনো জীবের বিকাশও ঘটাতে পারে।
আধুনিক রসায়ন ধাপে ধাপে বিকাশ লাভ করেছে এবং পৃথিবীতেও জীবন ক্রমেই জটিলতর হয়ে উঠেছে। এই বিকাশ এখন এতদূর এগিয়েছে যে এই তিন বিজ্ঞানী বিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করার মত যথাযথ অবস্থায় উপনীত হতে পেরেছেন।২০১৮ সালের রসায়ন বিভাগে নোবেল পুরষ্কার উক্ত তিন বিজ্ঞানী পাচ্ছেন তার কারণ তাঁরা একই সাথে রসায়ন ও নতুন ঔষধ শিল্পে নির্দেশিত বিবর্তনের মাধ্যমে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেন।

Frances Hamilton Arnold
George P. Smith
Sir Gregory P. Winter

বিজ্ঞানী সমাচার:

এ বছরের রসায়নে নোবেল পুরষ্কারের অর্ধেক পরিমাণ অর্থ পাচ্ছেন ফ্রান্সেস এইচ আর্নোল্ড। তিনি ১৯৫৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া (University of California) থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (California Institute of Technology) -র রসায়ন কৌশল (Chemical Engineering) এবং বায়োইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রাণরসায়নের একজন লিনাস পাউলিং প্রফেসর (Linus Pauling Professor)। ১৯৯৩ সালে সর্বপ্রথম তিনি উৎসেচকের নির্দেশিত বিবর্তন পরিচালনা করেন। উৎসেচক (enzyme) হচ্ছে এক ধরনের প্রোটিন, যারা রাসায়নিক বিক্রিয়া পরিচালনা করে ও বিক্রিয়ার গতি ত্বরান্বিত করে। প্রথম কাজের পর থেকেই তিনি তার উদ্ভাবিত পদ্ধতির পরিমার্জন করেছেন। বর্তমানে নতুন প্রভাবক বা উৎসেচক তৈরির ক্ষেত্রে তার এই পদ্ধতিটি বেশ জনপ্রিয় এবং নিত্যই ব্যবহৃত হচ্ছে। আর্নোল্ডের এনজাইমগুলোর ব্যবহারের মাধ্যমে ঔষধের মত নানা রাসায়নিক দ্রব্যসামগ্রী অনেকটাই পরিবেশবান্ধব উপায়ে উৎপাদিত হচ্ছে। একই সাথে সবুজ অর্থাৎ পরিবাশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা সৃষ্টির লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানীর উৎপাদনও চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
পুরষ্কারের বাকি অর্ধেক যৌথভাবে পাচ্ছেন জর্জ পি স্মিথ এবং স্যার গ্রেগরি পি উইন্টার।
জর্জ পি স্মিথ ১৯৪১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নরওয়াকে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭০ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় (Harvard University) থেকে তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব মিসৌরি (University of Missouri) –র জীববিজ্ঞান অনুষদের একজন স্বনামধন্য অধ্যাপক।
স্যার গ্রেগরি পি উইন্টার ১৯৫১ সালে যুক্তরাজ্যের লিচেস্টারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৬ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজ (University of Cambridge) থেকে তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি এমআরসি ল্যাবরেটরি অব মলিকুলার বায়োলজি (MRC Laboratory of Molecular Biology) –র একজন স্বনামধন্য প্রধান গবেষক হিসেবে কর্মরত আছেন।
১৯৮৫ সালে জর্জ পি স্মিথ নতুন প্রোটিনের বিকাশের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অভিজাত একটি পদ্ধতির সাথে সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেন যার নাম “ফাজ ডিসপ্লে”। এই পদ্ধতিতে ব্যাক্টেরিওফাজ (bacteriophage) নামক ব্যাকটেরিয়া আক্রমণকারী ভাইরাসকে ব্যবহার করে নতুন প্রোটিনের বিকাশ ঘটানো হয়। স্যার গ্রেগরি পি উইন্টার নতুন ঔষধ সৃষ্টির লক্ষ্যে অ্যান্টিবডির নির্দেশিত বিবর্তনের এই ফাজ ডিসপ্লে পদ্ধতি ব্যবহার করেন। উক্ত পদ্ধতিতে সর্বপ্রথম প্রস্তুতকৃত ঔষধের নাম আদালিমুমাব (Adalimumab), যা ২০০২ সালে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। আদালিমুমাব ঔষধটি প্রদাহজনিত পেটের রোগ (infammatory bowel diseases), রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (rheumatoid arthritis) এবং সোরিয়াসিস (psoriasis) ইত্যাদি স্ব-অনাক্রম্য রোগের পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সেই থেকে ফাজ ডিসপ্লে পদ্ধতির মাধ্যমে উৎপাদিত অ্যান্টিবডি বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থকে প্রশমিত করতে পারে, স্ব-অনাক্রম্যতাকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে, এমনকি মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সারেরও প্রতিকার করতে পারে।

উৎসেচক – জীবনের সূক্ষ্মতম রাসায়নিক যন্ত্র:

১৯৭৯ সালে সদ্য যন্ত্রকৌশল ও মহাকাশ প্রকৌশলে স্নাতক ফ্রান্সেস আর্নোল্ডের লক্ষ্য ছিল নতুন নতুন প্রযুক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে মানবতার কল্যাণে তা ব্যবহার করা। তৎকালীন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তাদের মোট শক্তির ২০ শতাংশ আসবে নবায়নযোগ্য উৎস হতে। তখন ফ্রান্সেস আর্নোল্ড সৌরশক্তির সাথে কাজ করেছিলেন।
১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর উক্ত শিল্পে অনেকটা নাটকীয়ভাবেই পরিবর্তন আসতে থাকে। ফলে আর্নোল্ড তার সাধনা ডিএনএ প্রযুক্তিতে নিবেশ করেন। তাঁর ভাষায় তিনি বলেন, “জীবনের সংকেতলিপিকে পুনরায় সাজানোর যোগ্যতা অর্জন করার মাধ্যমেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় রাসায়নিক ও অন্যান্য উপাদানকে সম্পূর্ণ নতুন করে তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব।”
ঔষধ শিল্পের পরিবর্তে বর্তমানে প্লাস্টিক ও অন্যান্য রাসায়নিক শিল্প সনাতন ও প্রথাগত রসায়নকেই ব্যবহার করে চলেছে। এদের জন্য শক্তিশালী দ্রাবক, ভারী ধাতু এবং উচ্চমাত্রার ক্ষয়কারী এসিড প্রায়শই দরকার। ফ্রান্সেস আর্নোল্ডের ভাবনা ছিল এক্ষেত্রে জৈবনিক প্রভাবক অর্থাৎ এনজাইম বা উৎসেচককে তিনি ব্যবহার করবেন। উৎসেচক পৃথিবীর সকল জীবের জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়া পরিচালনার ও সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব পালন করে থাকে। তিনি ভাবলেন, যদি তিনি নতুন কোনো উৎসেচকের নকশা করতে পারেন তবে তিনি মূলতঃ রসায়নেই পরিবর্তন আনতে পারবেন।

[চলবে…]

তথ্যসূত্র:
নোবেল কমিটি কর্তৃক প্রকাশিত: https://www.nobelprize.org/
• https://www.cancer.net/navigating-cancer-care/cancer-basics/what-metastasis

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close