বিবিধ

করোনা ভাইরাস কি?

বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ২লাখ৭৬ হাজার ছাড়িয়েছে

করোনা ভাইরাস কি?

করোনা ভাইরাস (সিওভি) হলো ভাইরাসগুলোর একটি বৃহৎ পরিবার। যা সাধারণ ঠান্ডা থেকে মিডেল ইস্ট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম (এমআরইএস-সিওভি) এবং সেভার অ্যাকিউট রেসপিরেট (এসএআরএস-সিওভি) এর মতো আরও মারাত্মক রোগের কারণ হতে পারে।
সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএইচও) একটি নতুন প্রতিবেদনে বলেছেন, করোনা ভাইরাস যা সিওভিইড -১৯ নামে পরিচিত যা এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫০ টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রায় ৩,৩১,০০০ কেসের মধ্যে ১৪,৪০০ জন মারা গেছে

এরা জুনোটিক অর্থাৎ এরা প্রাণী এবং মানুষের মধ্যে ভেসে বেড়ায় বা অবস্থান করে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এসএআরএস-সিওভি(SARS-CoV) বিড়াল থেকে মানুষের মধ্যে এবং এমএআরএস-সিওভি(MARS-CoV) ড্রোমডারি উট (এক কুঁজওয়ালা উট) থেকে মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল। এখনো করোনা ভাইরাসের কিছু প্রজাতি সুপ্ত অবস্থায় আছে যা এখনো মানুষের মধ্যে সংক্রামণ ছড়ায় নি।

সংক্রমণের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে :

শ্বাস প্রশ্বাসে বিঘ্ন ঘটে, জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট। আরও গুরুতর হলে, নিউমোনিয়া, কিডনি ফেইলিউর এবং এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

করোনা ভাইরাস উৎপত্তির কেন্দ্রস্থল উহানের একটি নতুন গবেষণায় কোভিড -১৯ কিভাবে তার লক্ষণগুলো প্রকাশ করেছে তার সম্পর্কে ধারণা দিয়েছে। এগুলো হলো জ্বর, ক্লান্তিভাব, শুষ্ক কাশি, শ্বাসকষ্টসহ সময়ের সাথে আরও লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে।

Day 1 – Day 3

বেশিরভাগ লোকের ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষণগুলো হলো সাধারণ সর্দিকাশি, হাল্কা গলা ব্যথা ।
*জ্বর (তাপমাত্রা ৩৭.৮ সেন্টিগ্রেড) এবং কাশি। সাধারণত শুষ্ক কাশি থেকে শুরু হয়।*
অন্য একটি প্রতিবেদনে ক্লিনিকাল ডিরেক্টর ডাঃ সারা জার্ভিস বলেছেন, পেশীতে ব্যথা এবং সাধারণত খুব ক্লান্ত বোধ হয়।
গলা বসে যাওয়া এবং বন্ধ নাক এই লক্ষণগুলো সাথে সর্দিকাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া,সর্দি পড়া ইত্যাদিও প্রকাশ পায়।

২০২০ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চীন থেকে কোভিড -১৯ কনফার্ম হওয়ার ক্ষেত্রে করোনা ভাইরাসটির সর্বাধিক সাধারণ লক্ষণ এবং উহানে ১৩৮ জন রোগীর মধ্যে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জ্বর প্রকাশের কয়েক দিন আগে প্রায় দশ শতাংশ লোকের ডায়রিয়া হয়েছে এবং বমি বমি ভাব অনুভব করেছে।
এই লক্ষণগুলি প্রকাশ পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, আপনিও কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত। এই লক্ষণগুলো সাধারণ ঠাণ্ডা বা ফ্লু এরও হতে পারে। কিন্তু সচেতনার জন্য এই লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলে যতটা সম্ভব নিজেকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে।

Day 4

শরীরের তাপমাত্রা ৩৭.৮ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড বা তার আশেপাশে অবস্থান করে, সেই সাথে শুষ্ক কাশি। প্রথম ৩ দিনের চেয়ে তুলনামূলক বেশি গলা ব্যথা,মাথা ঘোরা,মাথা ব্যথা এবং খানিকটা ভারসাম্যহীন অনুভব করা। মাঝে মধ্যে কথা বলতে কষ্ট হয়। খাওয়াদাওয়ার প্রতি রুচি কমে যাওয়া। অনেক সময় ডায়রিয়া শুরু হয়।

Day 5

শ্বাসকষ্টের লক্ষণ প্রকাশ পেতে প্রায় ৫ দিন সময় লাগে। শরীর আগের চেয়ে বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে,জয়েন্ট ব্যথা করে।

উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের Zhongnan হাসপাতালে কোভিড-১৯ টেস্ট পজিটিভ এমন ১৩৮ জন রোগী নিয়ে গবেষকরা একটি গবেষণা করে জানতে পেরেছেন যে, প্রথম লক্ষণগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর থেকে শ্বাসকষ্টের লক্ষণ প্রকাশ পেতে গড়ে পাঁচ দিন সময় নেয়

সাধারণতঃ বয়স্ক বা প্রবীণ ব্যক্তি যাদের আগে থেকেই কোন না কোন শারীরিক অসুস্থতা আছে যেমন হাই প্রেশার, ডায়াবেটিকস, কোলেস্টেরল ইত্যাদি শারীরিক জটিলতা রয়েছে তাদের শ্বাসকষ্টের সমস্যা “ডিসপেনিয়া” নামে পরিচিত ।

কোনও ব্যক্তির ডিসপেনিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্বাসকষ্ট হওয়া, দমবন্ধ হয়ে আসা, বুক ভারি হয়ে আসছে এমন অনুভব করা,দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া, হৃৎস্পন্দনে ব্যাঘাত ঘটছে এমন অনুভব করা । 

Day 6

জ্বরের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। সাথে শুকনো কাশিও হয় । কথা বলার সময় বা ঢোক গিলতে গেলে ব্যথা অনুভব করা। দূর্বলতা,বমি বমি ভাব, হাতের আঙুলের জয়েন্টগুলোতে ব্যথা শুরু হয়

Day 7

শুষ্ক কাশি থেকে কফসহ কাশি শুরু হয়। ডায়রিয়া অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
ডাঃ জার্ভিস বলেছিলেন, “বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে, বেশিরভাগ লক্ষণগুলো এক সপ্তাহের মতো সুপ্ত অবস্থায় থাকে।”
করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত প্রায় ৮৫ শতাংশ লোকের তাদের লক্ষণগুলো সাত দিনের মতো সুপ্ত থেকে তারপর ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় প্রকাশ পেতে থাকে।

তবে একদল ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছেন যে, আপনি যদি অন্যের সাথে থাকেন এবং আপনার বা আপনাদের মধ্যে করোনা ভাইরাসের লক্ষণ রয়েছে বলে মনে হয়, তবে পরিবারের সকল সদস্যকে অবশ্যই বাড়িতে থাকতে হবে অর্থাৎ হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে এবং ১৪ দিনের জন্য বাসা থেকে বের হওয়া যাবে না।

১৪ দিনের এই পিরিয়ডটি সে দিন থেকে শুরু হবে যখন বাড়ির প্রথম ব্যক্তির মধ্যে এই লক্ষণগুলো দেখা দিবে।

সিডিসি পরামর্শ দেয় যে কোনো ব্যক্তির কোভিড -১৯ আছে সেই সাথে অবিরাম বুকে ব্যথা বা চাপ, শ্বাসকষ্ট, ঠোঁট বা মুখমণ্ডল নীল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণগুলো দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে।

Day 8

৮ম দিনে কোন কোন সময় আক্রান্ত রোগীদের তীব্র শ্বাসকষ্টের (এআরডিএস) লক্ষণ দেখা দেয়।
মাথা ব্যথা,জয়েন্ট ব্যথা। সেই সাথে বিরতিহীন কাশি ৮ম দিনের লক্ষণ। শ্বাসপ্রশ্বাস কার্যক্রমে বুক ভারি মনে হয় এবং বুকে ব্যথা হয়।

এনএইচএস এর মতে, এমন পরিস্থিতিতে জীবন হুমকির মতো অবস্থায় থাকে। যেখানে ফুসফুস শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে না।

সংক্রমণ বা আঘাতের কারণে ফুসফুস মারাত্মকভাবে ফুলে উঠলে এআরডিএস হয় এবং প্রদাহটি ফুসফুসের ক্ষুদ্র বায়ু থলিগুলোর কাছের রক্তনালীগুলো থেকে তরল প্রবাহিত করে, ফলে শ্বাসপ্রশ্বাসকে ক্রমশ দ্রুততর হয়ে পড়ে

এআরডিএসের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্বাসকষ্ট, দ্রুত এবং অগভীর শ্বাস-প্রশ্বাস, ক্লান্তিভাব, তন্দ্রাভাব এবং নিজে একটা ঘোরের মধ্যে আছে এমন অনুভূত হওয়া

Day 9

আগের সব লক্ষণ থাকবে সেই সাথে শ্বাসকষ্টের পরিস্থিতির এমন অবনতি হবে যে রোগীর মৃত্যু ঝুঁকি পর্যন্ত থাকবে।

Day 12

১২ তম দিন থেকে জ্বর কমতে শুরু করে।

Day 18

১৮ তম দিন থেকে শ্বাসকষ্টের সমস্যাও কমতে থাকে।

     ১৪ দিন পার হওয়ার পর লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে কমতে       থাকে। তার মানে এটা নয় যে প্রোপার হোম     কোয়ারেন্টাইন,আইসোলেশন ছাড়া ব্যক্তি নিজে নিজেই সুস্থ হয়ে যাচ্ছে। বরং হোম কোয়ারেন্টাইন,আইসোলেশন ছাড়া মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

এখনো সেভাবে করোনা ভাইরাসের কোনো ওষুধ আবিষ্কার হয় নি। যার ফলে নিজেদের মধ্যে ‘প্রতিরোধ’ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই রোগে সংক্রামণ হতে নিজেদেরকে রক্ষা করার মোক্ষম হাতিয়ার।
কিছু প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিচে তুলে ধরা হলো :

  1.  যতটা সম্ভব নিজেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। হাঁচিকাশি দেয়ার পর হাত হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে ওয়াশ করে নিতে হবে। বাসায় কিংবা যাত্রাপথে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যাগে ক্যারি করতে হবে।
  2. সার্জিকাল মাস্ক ইউজ করার সময় ২টা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে :
    * যখন আপনি অসুস্থ(সর্দি, হাঁচিকাশি,জ্বর) থাকবেন তখন সার্জিকাল মাস্কের নীল দিক ব্যবহার করবেন।
    * যখন আপনি সুস্থ থাকবেন তখন সার্জিকাল মাস্কের সাদা দিক ইউজ করবেন।
  3. হাঁচিকাশির সময় টিস্যু ব্যবহার করতে হবে।
    এরপর দ্রুত আপনার হাত সাবান দিয়ে কমপক্ষে 20 সেকেন্ডের জন্য হাত ভালোভাবে ঘষে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। যদি সাবান,পানি সাথে না থাকে তাহলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করুন যাতে অন্ততপক্ষে 60% অ্যালকোহল থাকে।
  4. যতটা সম্ভব গণ পরিবহন,গণ সমাগম এড়িয়ে চলতে হবে।
  5. অন্যের ব্যবহার্য জিনিসপত্র ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
  6. স্ট্রিট ফুড কিংবা খোলা খাবার বর্জন করতে হবে।
  7.  যদি মনে হয় নিজের মধ্যে করোনা ভাইরাসের সিম্পটমগুলো প্রকাশ পাচ্ছে, তাহলে নিজেকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে। দরকার হলে IEECDR এ গিয়ে Covid -19 টেস্ট করাতে হবে।

কোয়ারেন্টাইন (Quarantine) কি?

সংক্রমণজনিত রোগের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি বা প্রাণীদের অন্যদের থেকে পৃথকভাবে রেখে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করাই হচ্ছে কোয়ারেন্টাইন। কোয়ারেন্টাইনে রাখার উদ্দেশ্য হচ্ছে সংক্রমিত ব্যক্তির দ্বারা যাতে অন্য কোন ব্যক্তি সংক্রমিত না হয়।

* বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ২লাখ৭৬ হাজার ছাড়িয়েছে।
* এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বজুড়ে মৃতের সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়েছে।
* ইতালিতে একদিনেই মারা গেছে ৬২৭ জন।
* ইতালিতে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৪০৩৭ জন ।
* বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ২জন এবং আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছ ২৪ এ।

রেফারেন্স :

1.https://www.cdc.gov/coronavirus/2019-ncov/prepare/prevention.html

2.https://www.thesun.co.uk/news/11198138/coronavirus-symptoms-day-by-day-when-signs-strike/amp/

আপনার মতামত লিখুন :

Back to top button
Close