বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী

ভিনগ্রহের ডুয়েল ও ডি-টুয়েন্টি (প্রথম অংশ)

‘এ কোন অপরাহ্ণ, এটা পৃথিবীর অন্য ধারান্তর নাকি মনের কোন এক কোনে বিস্ময়ের ভয়? এটা দিন নাকি রাত দোটানায় পরখ করাও কষ্টকর, একবার জানালায় কখনোবা উপরে সদৃশ কাঁচে তাকিয়ে চেষ্টা অনবরত চলছে। তবুও বুঝতে পারছি না। জানালার প্রান্তে গেলে মনে হয় গোধূলি লগ্ন আবার উপরে তাকালে রাত এবং গোধূলি একই সাথে বিরাজমান?’ সাত-পাঁচ ভাবতে লাগলো সজল।

হঠাৎ ঘরটির এক কোন আলগা হলে, কেউ ভেতরে প্রবেশ করলো বলে মনে হল তার; কিন্তু সাদা এবং আবছা কুয়াশা ঘরটির মতো তারাও একই রকম হওয়ায় ছায়াগুলোকে দেখা গেল না। কি যেন কথা বলছে? তাদের ভাষাগুলো বোঝার অবকাশ নেই, এমন ভাষা সজল আগে কখনো শুনেছে বলে বোধ হয় না। কিছুক্ষণ পর তাকে একি রকম অন্য একটি ঘরে নিয়ে এলো তবে এই ঘরটি আগের চেয়ে একটু বেশি শীতল।

একটি বেডে শয়ন করানো হলো, কি ঘটবে তার সাথে, কে এই মানুষগুলো, তারা কি আদৌ মানুষ? এসবের উত্তর খুঁজতে লাগল সজল ভাবতে লাগলো, এ কোন রবোমানুষের আবাসস্থল ? কিছুক্ষণ পর সজল বুঝতে পারল তার সাথে খারাপ কিছু একটা ঘটবে? সামনে কতগুলো ছায়া; গনা চার থেকে পাঁচটি যন্ত্র তার সামনে, যন্ত্রগুলোর সাথেও সে পরিচিত নয়, অনেক উন্নত যন্ত্রাংশ দিয়ে এগুলো তৈরি তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এমন যন্ত্র পৃথিবীতে আছে বলে মনে হয় না।

কিছু বুঝে উঠার আগেই তার মাথায় একটি যন্ত্রাংশ জুড়ে দিল। প্রচন্ড যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলো সজল কিন্তু নিরাপত্তার জন্য হয়তো তারা আপাদমস্তক শক্ত কিছু দিয়ে বেধে রেখেছে তাই হয়তো এত যন্ত্রণার মাঝেও নড়াচড়া করার শক্তি পায়না। তার মনে হচ্ছে সে এখনি শেষ হয়ে যাবে, ভাবতে লাগলো তার প্রিয়জনদের কথা, ক্ষানিকবাদে সজল অনুভব করছে কেউ একজন তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে!

“ডি-টুয়েন্টি! আমার কথা শুনতে পারছ?”

সজল উত্তর দিল,”হ্যাঁ,তোমরা কারা এবং কি চাও, আমি এখানে কি করে?”

“ডি-টুয়েন্টি, আমরা ‘টার্সবাসীর’ ‘আর্কী’; এখানে তোমাকে আমাদের আর্কশিপে করে এনেছি কাজের জন্য।”

“কি কাজ, ডি-টুয়েন্টি কি?” সজলের প্রশ্ন।

“ডি-টুয়েন্টি তোমার নাম,আমরা বিপদে পড়েছি যা থেকে বাঁচাতে সক্ষম বলে ধারণা একমাত্র তুমি; আমাদের শেষ উপায় হিসেবে তোমাকে আনা হয়েছে, তুমি নীলরঙা গ্রহের একজন বুদ্ধিমান প্রাণী, তুমিই পারো আমাদের কে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে।”

“শুধু আমি কেন, অন্য মানুষরাও ছিল তাদের আনতে পারতে।”

“হ্যাঁ, আমরা তোমার মতো পূর্বেও আরো উনিশটি মানুষকে এনেছি তারা সমাধান দিতে ব্যর্থ, তাই তোমাকে এনেছি।” এতক্ষণে সজল বুঝেছে কেনো তার নাম ডি-টুয়েন্টি রাখা হয়েছে।

“কি বিপদ?” সজল প্রশ্ন করে।

“আমদের টার্স গ্রহটির পাশে দুই হাজার আলোক বর্ষ দূরে ‘থিনাস’ গ্রহের অবস্থান, থিনাস থেকে প্রায় কাছে পাঁচশত আলোক বর্ষ দূরে এবং তোমাদের গ্রহ হতে তিন হাজার কোটি আলোকবর্ষ দূরে রাইপ-অ্যারিস্কা (দক্ষিণ-পূর্ব) দিকে ‘রিকাস’ গ্রহ যেখানে আমাদের প্রধান কে আটক করে রাখা হয়েছে এবং তার অনুপস্থিতির জন্য আমাদের বিপদ মাত্রা বেড়ে গিয়েছে।”

“তোমাদের প্রধান কে আটক করা হয়েছে জন্যই কি আসল বিপদ?”

“না। পরের অন্যতম কারণ হল; থিনাস এবং রিকাস গ্রহবাসীরা চায় আমাদের গ্রহকে দখল করতে। তিনশ প্র-এথেন্স পূর্বে থিনাসরা আমাদের গ্রহটিতে প্রথম আক্রমণ করে, তোমার অজানা যে আমাদের গ্রহটি ঠিক আলো-অন্ধকারে নিমজ্জিত কারণ তোমাদের সৌরের মত আমাদের ‘ফিউরিস’ আছে; তা থেকে এই গ্রহটি দুইশত হাজার কোটি আলোকবর্ষ দূরে থাকায় এখানে মাত্র একরকম আলো আসে আর তাই গ্রহটি আলো-অন্ধকারে।

আবার আমরা যেখানে আছি তাতে আলো-অন্ধকার একই সময়ে বর্তমান (সজল ভাবছে, হয়তো এই কারণে জানালা এবং উপরে এমন প্রতিফলন দেখেছিল)। আমদের প্রধান থাকতেন সেই অন্ধকারাচ্ছন্নে যেখানে খুব কম যোগাযোগ থাকে, সেখানেই আক্রমণ করে থিনাসের আর্কীরা আটক করে, তার ঠিক একশ প্র-এথেন্স পর রিকাসরা; কিন্তু প্রধানের এমন ঘটনার পর আমরা তৎপর হওয়ায় রিকাসদের বিরুদ্ধে পাল্টা জবাবে যুদ্ধ হয়, ফলে রিকাসদের অনেক আর্কী বন্দী হয়। এই ঘটনা থিনাসরা জানতে পেরে যায় ফলস্বরূপ তারা এবং রিকাসরা সম্মিলিতভাবে কয়েকদিন পর আঘাত হানে, যেহেতু দুপক্ষ তাই আমাদের হারটাই ছিল মুখ্য। এরপর আমাদের কে তারা শাসন করতে লাগলো, কিন্তু যেভাবে শাসন করছে তাতে প্রতিদিন আমাদের কম বেশি আর্কী মারা যাচ্ছে, এমন করে চললে মনে হয় আমদের গ্রহটি হারিয়ে যাবে। তুমি নীলরঙাগ্রহের বুদ্ধিমান এবং শক্তিশালী মস্তিষ্কধারী একজন মানুষ তাই আমাদের ধারনা তুমি সাহায্য করতে সক্ষম।”

সজল ভাবছে, কি করে এত বড় বিপদ কে পাড়ি দিবে;আবার তাকে যে নিয়ে আসা হয়েছে তা রিক-থিনারা জানেনা?

“তোমরা আমাকে নিয়ে এসেছো এটা রিক-থিনারা জানে?”

“না। প্রতি ১ এন্থেসে একবার তাদের গ্রহে ঘুরতে যায় তাই আজকেও গিয়েছে এবং তিন থেকে চার ইন্থস পর ফিরে আসবে, এই সুযোগে আমাদের আর্কী সেনাপ্রধান তোমাকে আনার জন্য অর্ডার করেছেন।”

সজল বিপদে পড়েছে, সে বুঝতে পারছে হয়তো এটাই তার ভাগ্যের জীবন ইতির একটি অধ্যায়।

“কি ভাবছ? তারা কেউ জানতে পারবে না তুমি এখানে কারণ এই সম্পর্কে তাদের ধারনা নেই, এটা আমাদের গ্রহের গুপ্ত গবেষণাগার, এখানে আর্কী সেনারা ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারেনা।”

“সঠিক তা ভাবছি না, তোমাদের কি ভাবে উদ্ধার করা যায় সেটা ভাবছি (সঙ্গে সঙ্গে অন্যআর্কীগুলো পরস্পরের মাঝে কথা বলতে লাগল অনেকটা প্রায় উম্মাদের মতো করে হয়তো এটা তাদের আনন্দক্ষণ)।

“এখন তোমাকে অন্য ঘরে ট্রান্সফার করা হবে, আমরা এই কথাটা জানাতে সেনা প্রধানের কাছে যাচ্ছি।

সজল একাকীত্ব বোধ করে,ভাবতে থাকে, এমন মহাবিপদ কে কি ভাবে অতিক্রম করবে যদি নাই পারে তাহলে কেনোই বা সম্মত হলো?

কেউ যেন শিশমহলে প্রবেশ করলো ,সজল দেখতে পারছেনা কারণ তাদের রঙ আর ধোঁয়া একই!

“ধন্যবাদ ডি-টুয়েন্টি আমদের সাহায্য করার জন্য।” সজল বুঝতে পারছে কেউ ঘরটিতে আছে এবং এই কণ্ঠটি আগের জনের চেয়ে আলাদা।

“আমি দেখতে পারছি না তাই কথা বলেই স্বস্তিবোধ করছি না!”

“তোমাকে আমাদের মতো দেখার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি? ‘সুয়ান’ এখনো সেই ক্ষমতা দেওয়া হয়নি কেন?”

“দুঃখিত, আপনার অনুমতি ছাড়া তা সম্ভব ছিলনা।”

“ঠিক আছে এখনি করো।”

“এখন দেখতে পারছ? ”

“হ্যাঁ।”

ঘরটিতে পাঁচ জন আছে এবং এবারে যে কথা বলছে তাকে অন্য চারজনের মতো লাগছে না, হয়ত সে মেয়ে আর্কী!

“তোমার সাথে এর আগে কথা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না আমার?”

“তোমার ধারনা সঠিক ডি-টুয়েন্টি,আমি ‘সুখোসি’; টার্স আর্কীদের সেনাপ্রধান এবং আমি অর্কী, আমাদের দুইটা ভাগ ঠিক তোমাদের মতো। তোমার সাথে আগে যে কথা বলেছিল সে সুয়ান এবং এখানে অন্যান্য যারা আছে তারা আমাদের সহকর্মী। আমাদের সাহায্য করবে এটা জানতে পেরে খুশি হয়েছি, এর আগে তোমার মত আরো ইনসান এসেছিল কিন্তু অপারগতা প্রকাশ করেছে ফলে প্রতিনিয়ত দুর্বল হয়ে পড়ছিলাম, একমাত্র তুমি সাহায্য করার জন্য সম্মত হয়েছ।”

সজল বুঝতে পারছে সামনে ঘোর বিপদ এবং অনেক বড় দায়িত্ব কারণ পুরো টার্স এখন তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে কি করবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না, কি করে এই ঘোর আঁধার থেকে আত্মরক্ষা এবং পরোপকার করা যায়,আদৌ পারবে? পরিবারের কথা ভেবে চোখে অশ্রু আসে।

“তোমার চোখদিয়ে ওগুলো কি গড়িয়ে পরছে? ডি-টুয়েন্টি তুমি কি শুনতে পারছ আমার কথা?”

ঘোর কেটে গেলে সজল বুঝতে পারে এক মুহূর্তের জন্য কল্পনার জগতে হারিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু হারালে চলবে না। “হ্যাঁ আমি শুনতে পারছি।”

“তোমার চোখে ওগুলো কি?

“অশ্রু”

“এটা কি?”

“আমাদের হৃদয়ের মাঝে বেদনা থেকে এর উদ্ভব হয়।”

” হৃদয় এবং বেদনা কি?”

“হৃদয় হল আমাদের জীবন আর বেদনা হল কোন কষ্টকর মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি।” সুখোসি কিছুই বুঝলনা কি বলছে সজল, তবে এটুকু বুঝেছে হয়ত কষ্ট বলে কিছু আছে যা তার অজানা। এমতাবস্থায় সুখোসি আজকের মতো বিদায় জানালো,

“আজ আর বেশি কথা না বলি,প্রস্তুতি নাও আমরা পরিকল্পনা মতো কাজ করব!”

সজল আঁটতে থাকে পরিকল্পনার জাল, কিন্তু কিভাবে তার সব পরিকল্পনা কাজ করবে সে সূত্র মিলছে না! কিভাবে শক্তিশালী দুইগ্রহবাসীদের পরাস্ত্র করবে? ঐ দুই গ্রহবাসীদের কেমন দেখতে,কতটা ভয়ংকর, সামান্য শিশমহলের ঘর থেকেই বা কতটা ঠিকঠাক কাজ করা যাবে! তাহলে হার মেনে নেবে, কখনই না যদি এমনটা ঘটত তার মাতৃভূমির সঙ্গে তাহলে তখনও পারত হার মেনে নেওয়াটাকে? এ হতে দেওয়া যায়না যেভাবেই হোক তাকে পারতেই হবে। এই যুদ্ধে সে একা নয়,পুরো টার্স আছে তার সাথে,তাকে যুদ্ধ করেই হোক বা ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করেই হোক, পারতেই হবে।

সুয়ানের আগমনে একটু খারাপ লাগে।

(চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close