মহাকাশ

নেপচুন ও হীরকবৃষ্টিঃ অবশেষে আসল কারণ জানতে পারলেন বিজ্ঞানীরা

বেশ আগে থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানী মহলের মধ্যে নেপচুন এবং ইউরেনাসকে নিয়ে বিভিন্ন জল্পনা কল্পনার শেষ ছিল না। এর মধ্যে অন্যতম একটা অনুকল্পনা ছিল যে নেপচুনে হীরক বৃষ্টি হয়! কী আজব ব্যাপার, হীরা আবার একই সাথে যদি সেটার বৃষ্টি হয় তবে তো কথাই নেই! ভ্রু কুঁচকে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমান এক অনুসন্ধান বলছে যে  হীরকবৃষ্টি হওয়া মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয় এবং সেটাও বলা হয়েছে যে কীভাবে এরকম হওয়াটা সম্ভব।

প্রচণ্ড তাপ এবং চাপে ভূমির প্রায় হাজার কিলোমিটার নিচের বরফ শিলা গুলো নিজের হাইড্রোকার্বন আলাদা করে দেয়। ঠিক তখনই কার্বন প্রচণ্ড চাপে সংকুচিত হয়ে হীরকের পরিণত হয় এবং গ্রহের আরো গভীরে সেগুলো যাত্রা করে। যে পরীক্ষাটি করা হয়েছে সম্পূর্ণ ঘটনাটি অনুধসবন করার জন্য তা সংঘটিত হয় SLAC National Accelerator Laboratory তে। সেখানে ব্যবহার করা হয় উন্নত প্রযুক্তির Linac Coherent Light Source(LCLS) যা একপ্রকার অতি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন এক্সরে লেজার। এটির মাধ্যমে দেখা যায় কার্বন সরাসরি হীরক ক্রিস্টালে পরিণত হয়ে যায়!LCLS এর পরিচালক এবং একজন প্লাজমা পদার্থবিজ্ঞানী হিসেবে Mike Dunne জানান যে তাদের অনুসন্ধানটি এমন একটা ঘটনার উপাত্ত দিয়েছে যার প্রসেসড মডেল তৈরি করা খুব কঠিন। অর্থাৎ হাইড্রোকার্বন ভেঙে কার্বনের হীরক হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা বিশ্লেষণ করা একটু জটিল বটে। এখানে এটাই দেখার বিষয় যে কীভাবে সেগুলো যৌগ অবস্থায় থাকে এবং কীভাবেই বা আবার সঠিকভাবে আলাদা হয়ে যায় মিশ্রিত অবস্থা থেকে। সহজে উপস্থাপনের জন্য ব্যাপারটিকে খাবার মায়োনিজের সাথে তুলনা করা যায়। এখান এটাই দেখা হবে যে কীভাবে সেই মায়োনিজ থেকে পুনরায় তেল এবং ভিনেগার ফেরত পাওয়া যাবে।

SLAC National Accelerator Laboratory

নেপচুন এবং ইউরেনাস, আমাদের সৌরজগতের মধ্যে সবচেয়ে কম অনুসন্ধানকৃত দুটি গ্রহ। কারণটা অবশ্যই যৌক্তিক যে গ্রহ দুটি আমাদের থেকে অনেক দূরত্বে অবস্থান করছে। একমাত্র ভয়েজার ২ ই দুটো গ্রহের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে গিয়েছে, এমনকি কোনো দীর্ঘকালীন গবেষণার জন্যও নয়। নাসা’র মতে নেপচুনের মতো “Ice Giant” আমাদের গ্যালাক্সিতে খুবই বিস্তৃত এবং দশ গুণ বেশি সহজপ্রাপ্য। আমাদের সৌরজগতের ”বরফ দানব” সম্পর্কে জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেননা এর মাধ্যমেই গ্রহ সম্পর্কিত সব রহস্যের অবসান ঘটবে। আমরা জানি যে নেপচুন এবং ইউরেনাসের বায়ুমণ্ডল হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম দ্বারা গঠিত। তন্মধ্যে কিছু পরিমাণ মিথেনও রয়েছে। এই বায়ুমণ্ডলীয় স্তরের নিচে আরেকটি অতি তাপযুক্ত এবং অতিমাত্রায় ঘন স্তর রয়েছে যা “বরফীয়” পদার্থ যেমন পানি, মিথেন এবং এমোনিয়া দ্বারা গঠিত। পূর্ববর্তী হিসাব-নিকাশ দেখিয়েছে যে নির্দিষ্ট পরিমাণ তাপ এবং চাপ প্রয়োগ করলে মিথেনও ভেঙে গিয়ে হীরায় পরিণত হয়; এত ঘন এবং উচ্চ তাপমাত্রায়ও এরকম প্রক্রিয়ায় হীরা তৈরি হতে পারে! SLAC এ সংঘটিত হওয়া পূর্ববর্তী আরেকটি পরীক্ষায় একই ঘটনা X-Ray Diffraction এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়। এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন পদার্থবিদ Dominik Kraus এবং এটি করা হয়েছিল জার্মানিতে। Kraus জানান যে তাদের পরীক্ষাটি অত্যন্ত সফলতার সাথে এই হীরকবৃষ্টি সংক্রান্ত ঘটনাগুলোর উপাত্ত প্রদর্শন করছে এবং ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ নিশ্চিতভাবে প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে জানা যাবে, যা আগে ছিল শুধুই ধারণা এবং অনিশ্চয়তা।

LCLS

জিনিসটা আসলেই চ্যালেঞ্জিং যে পৃথিবীতে সেই অতিকায় গ্রহের মতো একটা পরিবেশ তৈরি করা, আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সঠিক যন্ত্রপাতি। এরজন্য রয়েছে LCLS এবং হাইড্রোকার্বন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে পলিস্টাইরিন(C8H8) মিথেনের পরিবর্তে। প্রথম ধাপ হচ্ছে পলিস্টাইরিনকে প্রচন্ড তাপ এবং চাপ প্রয়োগ করা, যেটা হয় নেপচুনের ভূমি থেকে প্রায় দশ হাজার কিলোমিটার গভীরে। অপটিক্যাল লেজার একধরনের শকওয়েভ উৎপন্ন করে যা পলিস্টাইরিনকে প্রায় ৫০০০ কেলভিন বা ৪৭২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে। এছাড়াও তৈরি হয় প্রচন্ড চাপ যা প্রায় দেড় বিলিয়ন বার। অর্থাৎ ২৫০ আফ্রিকান হাতি যদি একসাথে কোনো মানুষের উপর দাঁড়ায় তাহলে যে পরিমাণ চাপ অনুভূত হবে ঠিক সেরকমই! কী ভয়ংকর ব্যাপার! Kraus জানান যে আগের পরীক্ষায় যে এক্স-রে ব্যবহার করা হয়েছিল তা শুধু ক্রিস্টাল পদার্থের ক্ষেত্রে কাজ করত কিন্তু যেসব অণুর মধ্যে ক্রিস্টাল বন্ধন পাওয়া যেত না সেগুলোর ক্ষেত্রে কাজ হতো না। নতুন পরীক্ষাটিতে বিজ্ঞানীরা ভিন্ন পদ্ধতিতে এক্স-রে ব্যবহার করেন ফলে দেখা যায় কীভাবে ইলেক্ট্রনগুলো পলিস্টাইরিন থেকে ছিটকে যাচ্ছে। এটা যেভাবে বিজ্ঞানীদের দেখায় কীভাবে হাইড্রোকার্বন থেকে কার্বন আলাদা হয়েছে সেইভাবে এটাও পরিলক্ষিত হয় যে পরবর্তী ঘটনা কী ঘটে, মানে কার্বনের যে কোনো অবশিষ্টাংশ থাকেনা তা প্রমাণিত হয়। Kraus বলেন যে এভাবেই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় কীভাবে হাইড্রোকার্বন আলাদা হয়ে কার্বন হীরকে পরিণত হয়, এর অনুপস্থিতি ব্যাপারটিকে নিশ্চিত করে। নেপচুনের আরেকটি রহস্যময় ব্যাপার হচ্ছে এর অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি, অর্থাৎ সূর্য থেকে যে তাপ সে গ্রহন করে তা থেকেও প্রায় আড়াই গুণেরও বেশি শক্তি বর্জন করে। হীরা গুলো যদি আশেপাশে থাকা বস্তু থেকেও বেশি ঘন হয় তাহলে সেখানে একধরনের মহাকর্ষিক শক্তি উৎপন্ন হয়।যেটা পরিণত হয় তাপ শক্তিতে হীরা এবং অন্য বস্তু সমূহের মধ্যকার ঘর্ষণের ফলে।

সম্পূর্ণ পরীক্ষাটি আমাদের দেখায় যে কীভাবে যেকোনো জটিল পরিবেশ পৃথিবীতেই তৈরি করে সেটার ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ করা যায়। এছাড়াও এই প্রক্রিয়া গুলো সেসব ঘটনার বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দিতেও পারবে যা অনুকল্প ছাড়া সমাধান করা যেত না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় গ্যাস দানব তথা বৃহস্পতি এবং শনি গ্রহের অভ্যন্তরীণ হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম গ্যাস কীভাবে মিশ্রিত অবস্থায় থাকে তা পর্যবেক্ষণ করা যাবে। তাছাড়াও LCLS প্রযুক্তির আরো বিস্তৃত ব্যবহারে আমরা হয়ত জানতে পারব ফিউশনের ফলে তৈরি হওয়া শক্তির ভবিষ্যত রূপ এবং দূরবর্তী গ্রহ সম্পর্কিত বিশদ তথ্য!

তথ্যসূত্রঃ Sciencealert, Nature Communications

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close