পরিবেশ

ঢাকা কি সত্যিই পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত শহর ?

বেঁচে থাকার জন্য বায়ুর প্রয়োজনীয়তা হয়তো নতুন করে আর কাউকে বলতে হবে না। বায়ুর গুরুত্ব সকলেই বুঝি। কিন্তু যেটা বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকি সেটা বিশুদ্ধ বায়ুর গুরুত্ব। এই বাংলার প্রকৃতির গন্ধে মুগ্ধ হয়ে কত রাত অনিদ্রায় কাটিয়েছেন কবি-সাহিত্যিকেরা। আজ সেখানে বেঁচে থাকার জন্য নিঃশ্বাসটুকু নেয়া দায়। এরা প্রধান কারণ বায়ু দূষণ।

বায়ু দূষণ

বর্তমান পৃথিবীতে চলতে থাকা হাজারো সমস্যার ভিড়ে একটির নাম বায়ু দূষণ। এটি আর পাঁচটি সমস্যার মতো নয়। এর সাথে মানব প্রজাতির অস্তিত্বের বিষয় জড়িত। বায়ু দূষণের কারণে মৃত্যুর হার প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। ২০১৭ সালের হিসেব অনুযায়ী প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫ মিলিয়ন বা ৫০ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে বায়ু দূষণের কারণে।

বিভিন্ন কারণে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা

সারা পৃথিবীর মোট মৃত্যুর শতকরা ৯ ভাগ মৃত্যুর জন্য দায়ী বায়ু দূষণ। নিচের ম্যাপটি ভালো মতো লক্ষ্য করবেন। বায়ু দূষণে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় এই ভারতীয় উপমহাদেশে।

মানুষের বিভিন্ন কারণে মারা যাওয়ার পার্সেন্টেজ এনালাইসিস

এছাড়াও মানুষের রোগবালাই হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ বায়ু দূষণ। বায়ু দূষণ মানব প্রজাতির থেকে কেঁড়ে নিচ্ছে মহা মূল্যবান জীবনসীমা। এজমা, ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ মরণফাঁদে পতিত হচ্ছে লক্ষাধিক মানুষ। আচ্ছা লেখক নিজেও কিন্তু এজমা রোগী।  বায়ু দূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি রোগাক্রান্ত হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের দেশগুলোর মানুষ। আর এই দেশগুলো হচ্ছে আফ্রিকা (সাহারা রিজিওন) আর সাউথ এশিয়ায় অবস্থিত দেশগুলো। সবাই হয়তো জানেনই আমাদের বাংলাদেশ সাউথ এশিয়ায় অবস্থিত। বায়ু দূষণের কারণে মৃত্যুঝুঁকি ইউরোপ ও নর্থ আমেরিকার তুলনায় এসব দেশে প্রায় ১০০ গুণ বেশি।

এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স

এই তো গেলো বায়ু দূষণের কথা। কিন্তু কোন দেশ কতটা দূষিত সেটা বুঝবো কি করে? এর জন্য আছে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ( Air Quality Index- AQI )।

AQI একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য প্রতিদিনকার বায়ুর কোয়ালিটি বা গুণাগুণ পরিমাপ করে। এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আজকের বায়ু কতটা স্বাস্থ্যসম্মত আর কতটা ক্ষতিকর। আর এটা আমাদের স্বাস্থ্যে কি ধরণের প্রভাব ফেলবে সেটাও জানিয়ে দেয়। AQI আমাদের যেই রিপোর্ট দেয় তা আমাদের জানান দেয় যে, সামনের কয়েক ঘন্টায় আমরা কি ধরণের পরিবেশের সম্মুখীন হব।

AQI পরিমাপ করা হয় পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এমন পাঁচটি এলিমেন্ট বা উপাদানের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে। উপাদান পাঁচটি হলঃ

  1. গ্রাউন্ড লেভেলের ওজোনের পরিমাণ
  2. পার্টিকেল পলিউশন
  3. কার্বন মনো-অক্সাইড
  4. সালফার ডাই-অক্সাইড
  5. নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড    

এদের মধ্যে প্রথম দুটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর। এরাই মানব জীবনের জন্য প্রধানত হুমকি সরূপ। ১-৫০০ স্কেলের মধ্যে AQI পরিমাপ করা হয়। AQI এর মান কত হলে সেটা পরিবেশের জন্য ভালো আর কত হলে খারাপ সেটাও নির্ধারণ করা হয়েছে।     

AQI মানের উপর ভিত্তি করে পরিবেশের অবস্থা

    

AQI  পরিমাপের জন্য প্রথমে মাটিতে ও মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইট থেকে দরকারী ডেটা বা তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তারপর সেগুলোকে কম্বাইন্ড বা একীভূত করে এটিকে AQI স্কেল ভেল্যুতে নিয়ে আসা হয়। এভাবে প্রতিদিনই পৃথিবীর প্রতিটি দেশের প্রতিটি শহরের AQI মান নির্ণয় করে তা আপডেট করা হয়। উপরের ছবিটিতে AQI মানের উপর ভিত্তি করে বায়ুর গুণগত মান কেমন মান হবে ও তার অর্থ কি সেটা স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে।   

চাইলে আপনিও আপনার শহরের AQI মান বের করতে পারবেন। তবে প্রয়োজনীয় তথ্য গুলো আপনাকে জানতে হবে। অনলাইনে AQI ক্যালকুলেটরে তথ্যগুলো ইনপুট দিলে তারা AQI মান আপনাকে দেখিয়ে দেবে। অনলাইন AQI ক্যালকুলেটর দেখতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাদেশের বায়ু দূষণ

বায়ু দূষণে সাউথ এশিয়ার দেশগুলোই এগিয়ে। আমাদের অবস্থাও ভালো না। বাংলাদেশে  ২০১৭ সালে ১ লক্ষ ২৩ হাজার মানুষ বায়ু দূষণের কারণে মারা যায়। বিশ্ব-স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী যদি আমাদের দেশের বায়ু গুণগত মান স্বাস্থ্যকর হত তবে গড়ে প্রত্যেক ব্যক্তির আয়ু ১.৩ বছর বেড়ে যেত। তাই বায়ু দূষণকে সাইলেন্ট কিলার হিসেবেও আখ্যা দেওয়া হয়।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে ৩.৬ বিলিয়ন অর্থ্যাৎ পৃথিবীর ৪৭ শতাংশ মানুষ হাউজহোল্ড এয়ার পলিউশনের শিকার। এর উৎস হচ্ছে ঘরবাড়ির ময়লা ও রান্নার ধোঁয়া। ঘড়বাড়ি অপরিষ্কার থাকলে এমনটা হয়।

 বাংলাদেশ ও বিভিন্ন অঞ্চলের AQI মান

আমরা প্রায়ই টিভিতে, অনলাইন পোর্টালে বা সংবাদপত্রে এরকম খবর দেখি যে, পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত শহর ঢাকা। কথা হচ্ছে এই তথ্যগুলো স্বল্প সময়ের জন্য সত্য। এই তথ্যের স্থায়িত্ব কম। AQI প্রতিনয়ত পরিবর্তন হয় কারণ বায়ু কখনো স্থির থাকে না।

যদি কোথাও দেখেন যে ঢাকা সবচেয়ে দূষিত শহর। তবে বুঝবেন সেটা শুধুমাত্র ঐ দিনের জন্য। পুরো মাস বা বছরের জন্য নয়। অর্থ্যাৎ প্রতিদিন AQI মানের পরিবর্তন ঘটে আর প্রতিদিনই দূষিত শহরের তালিকারও পরিবর্তন ঘটে। এজন্য একদিন শুনবেন ঢাকা, একদিন দিল্লী আবার একদিন করাচী।

গত ২০শে নভেম্বর ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় এক নম্বরে ছিল। সে সময় ঢাকার AQI মান ছিল ১৯৩ আর পাকিস্তানের লাহোরের ছিল ১৭১। তবে ঢাকা সবসময়ই প্রথম দশটি দূষিত শহরের মধ্যেই থাকে। প্রথমে খুব কমই আসে।

আপনি চাইলে যেকোন সময় যেকোন শহরের AQI মান দেখতে পারেন। অনলাইনে রিয়েল টাইম AQI মান দেখার সুযোগ রয়েছে। যেমন এই মুহূর্তে (২৩শে নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টা বেজে ৩৩ মিনিটে) ঢাকার AQI মান ১৫৫ আর ভারতের নাগপুরের AQI মান ১৯৮।

এভাবে রিয়েল টাইম AQI মানের উপর ভিত্তি করে তৈরি ম্যাপ

এভাবে রিয়েল টাইম AQI মানের উপর ভিত্তি করে তৈরি ম্যাপে যেকোন শহরের AQI মান যখন তখন জানা যাবে। যেকোন শহরের AQI মান জানতে ক্লিক করুন এখানে

পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত শহরের অধিকাংশ অবস্থিত ভারতে আর চায়নাতে। প্রথম ৫০টি দূষিত শহরের প্রায় ৪০টি ভারত আর চায়নাতে অবস্থিত। এই ৫০টির মধ্যে বাংলাদেশের ৪ টি রয়েছে। এরা হল ঢাকা, বরিশাল, গাজীপুর আর খুলনা। পাকিস্তানের রয়েছে করাচী ও লাহোর। তালিকাটি দেখতে ক্লিক করুন এখানে

একটি জিনিস হয়তো খেয়াল করেছেন, বায়ু দূষণের সাথে জনসংখ্যার একটি গভীর যোগাযোগ রয়েছে। যে দুটি দেশে দূষিত শহর সবচেয়ে বেশি সে দুটি পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দুটি দেশ। আর বাংলাদেশও জনসনংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে এক নম্বরে।

আমরা এখন বায়ু দূষণের প্রধান সমস্যা গুলোর দিকে একটু তাকাই।

  • যানবাহন দ্বারা নিঃসৃত ধোঁয়া
  • ফসিল ফুয়েলের উপর নির্ভর করা পাওয়ার প্ল্যান্ট
  • অতিরিক্ত কৃষিকাজ
  • নির্মাণ কাজ
  • গৃহস্থালির কাজ। ইত্যাদি

আবারো লক্ষ্য করুন, এগুলো সবই জনবহুল দেশের বৈশিষ্ট্য। লোক বেশি থাকলেই যানবাহন বেশি চলবে, ফসিল ফুয়েলের প্রতি নির্ভর হতে হবে, কৃষিকাজ বেশি হবে আর গৃহস্থালির কাজও বেশি হবে। ফলাফল বায়ু দূষণ।

এবার সবচেয়ে বিশুদ্ধ বায়ু আছে এমন দেশ গুলোর দিকে তাকাই। ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড,সুইডেন, ডেনমার্ক, স্লোভেনিয়া, স্পেন, পর্তুগাল ইত্যাদি। এই প্রত্যেকটি দেশেরই জনসনংখ্যা ও ঘনত্ব খুবই কম।

তাই বায়ু দূষণের কারণ অনেকগুলোই হতে পারে। কিন্তু পেছনে রয়েছে অতিরিক্ত জনসনংখ্যার বোঝা। ফলে অবকাঠামো ও সার্বিক অর্থনীতির কোন উন্নয়ন হচ্ছে না। উলটো বায়ু দূষণে জর্জরিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

এই বায়ু দূষণের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে হলে, বেশি করে গাছ লাগাতে হবে। বনভূমিকে ফিরিয়ে আনতে হবে। কৃষিনির্ভরতা কমাতে হবে। নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে এগিয়ে যেতে হবে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের দেশগুলোর জন্য খুবই কঠিন একটি কাজ। আশা করছি ভাগ্য দেবতা একদিন তার সুনজর এই দেশগুলোতে ফেলবেন। আর দেশগুলোও অভিশাপের গন্ডি থেকে মুক্তি পাবে।

তথ্যসূত্রঃ National Weather Service, waki.info, AirNow, Dhaka Tribune, SciJinks, Our World in Data, CbsNews, IMPROB, Conserve Energy Future, The Telegraph, American Lung Association, Harvard Health.

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close