ইতিহাসজীবনীবিদেশি বিজ্ঞানীবিবিধ
জনপ্রিয়

মধ্যযুগের জ্ঞানসাধনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নক্ষত্র ইবনে সিনা – জীবনী 

ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক হিসেবে ইবনে সিনার খ্যাতি থাকলেও দর্শনশাস্ত্রও তাঁর অপরিসীম অবদানে ঋদ্ধ। মুসলিম দর্শনচর্চায় অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব তিনি।   

একজন অজ্ঞ চিকিৎসক, রোগীর মৃত্যুর একজন সহকারী বৈ অন্য কিছু নয় ! 

An ignorant doctor is the aide-de-camp of death.

ইবনে সিনা

সূত্র –  ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত Familiar Medical Quotations বই

লেখক – মরিস বি স্ট্রস (Maurice B. Strauss)  

প্রখ্যাত দার্শনিক ফারাবির (মৃত্যু ৯৫০ খ্রিস্টাব্দ) পর এবং ইবনে রুশদের (১১২৬-১১৯৮ খ্রিস্টাব্দ) আগে আবির্ভাব ঘটে ইবনে সিনার। তিনি ছিলেন একাধারে চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, গণিতবিদ এবং আরও অনেক কিছুই। তিনি বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর মেধার সাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর মূল বিচরণক্ষেত্র চিকিৎসাবিজ্ঞান, অ্যারিস্টটলীয় দর্শন হলেও লজিক (যুক্তি), অধিপদার্থবিদ্যা (মেটাফিজিক্স), মনোবিজ্ঞান (সাইকোলজি), আধ্যাত্মবাদ (মিস্টিসিজম), ব্যাবহারিক গণিত ও পদার্থবিদ্যা, জীববিজ্ঞান, মানবদেহ প্রভৃতি বিজ্ঞানের অসংখ্য শাখা বিকশিত হয়েছে তাঁর হাত ধরে। ইবনে সিনা পাশ্চাত্যে আভিসেনা (Avicenna) নামে খ্যাত। 

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইবনে সিনার রচিত কিতাব আল শিফা (Book of the Cure) আক্ষরিক অর্থেই সেই শাস্ত্রের বিশ্বকোষ বলা চলে। বলা হয় সম্পূর্ণ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসেই ইবনে সিনার রচিত দুইটি বইয়ের তুলনা চলে না। একটি এই কিতাব আল শিফা আরেকটি হল তাঁর অমর সৃষ্টি আল কানুন ফি তিব্ব (The Canon of Medicine)। তাঁর সমসাময়িক বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হাসান ইবনে হায়সাম। তাছাড়া চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইবনে সিনার পরপরই যার নাম উচ্চারিত হয়, তিনি আল রাজি। ইবনে সিনার দর্শনের উপর পরবর্তীতে অনেক কাজ হয়েছে। ইমাম গাজালি (অনেকে গাজ্জালি নামে চেনে) তাঁর দর্শনের ব্যাপারে অনেক লেখালেখি করেছেন। ইবনে সিনার দর্শন প্রাচ্যে আলোচিত, সমালোচিত উভয়টিই হয়েছিল।ইবনে সিনার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে আমরা দুইটি পর্বে আপনাদের সামনে হাজির করবো। এই পর্বে তাঁর জীবনী আলোকপাত করবো। আগামী পর্বে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর অবদান নিয়ে কথা বলবো।

 

ইবনে সিনার একটি স্থিরচিত্র । ছবিসূত্র – Aljazeera

সংক্ষিপ্ত জীবনী 

সূত্র / উৎস 

ইবনে সিনার জীবনী নিয়ে আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে জানতে পারি। এর মধ্যে কিছু তাঁর আত্মজীবনী থেকে জানা যায়। অন্যান্য সূত্রের মধ্যে তাঁর শিষ্য আল জুজ-জানির লেখনী, ইমাম বায়হাকির বর্ণনা এবং ইবনে ওসায়বির রচনাবলি উল্লেখযোগ্য। এঁদের মধ্যে ইবনে ওসায়বির লেখনী অবশ্য মুসলিম ও খ্রিস্টান সমাজ তথা প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যে উভয় পরিমণ্ডলেই গৃহীত হয়েছে। ইবনে সিনার জীবনীকারদের মধ্যে আরও একজনের নাম না বললেই নয়। তিনি প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে কিফতি, যার নাম আমরা হাসান ইবনে হায়সামের নিবন্ধে পড়েছিলাম। প্রিয় পাঠক, মনে পড়লো?  

ইবনে সিনা । চিত্রসূত্র – Epic World History

জন্ম 

ইবনে সিনা তৎকালীন পারস্যের বুখারা নগরীর আফসানা গ্রামে ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে স্থানটি উজবেকিস্তানের অন্তর্গত। গুগল ডুডল অনুযায়ী দিনটি ছিল আগস্ট মাসের সাত তারিখ। তাঁর পূর্ণনাম আবু আলি আল হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হাসান ইবনে আলি ইবনে সিনা। মধ্যযুগের ইসলামি জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার যে স্বর্ণযুগ চলছিল সেসময়ের এক উজ্জল নক্ষত্র ইবনে সিনা। ইতিহাসে এসময়কাল ইসলামি স্বর্ণযুগ (Islamic Golden Age) নামে জায়গা করে নিয়েছে। 

তাঁর পুরো কর্মজীবনে তিনি তৎকালীন পারস্যের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের শাসকদের অধীনে চিকিৎসক, রাজনৈতিক পরামর্শদাতা, বিভিন্ন প্রশাসনিক পদের কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে সেই অঞ্চলগুলোর ব্যাপ্তি ইরান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান প্রভৃতি দেশে। 

ইবনে সিনার জন্মনগরী বুখারার মির ই আরব মাদ্রাসা । চিত্রসূত্র – Flickr

প্রাথমিক জীবন 

৯৮৬ সালে ইবনে সিনার পিতা তৎকালীন সামানি সাম্রাজ্যের রাজধানী বুখারায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ইবনে সিনার পিতা বেশ বিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন এবং তিনিই পুত্রের প্রাথমিক শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। ইবনে সিনার নিজ ভাষ্যমতে তিনি মাত্র দশ বছর বয়সে কুরআন হিফজ করেন। এরপর তিনি পারিবারিক ঘরোয়া পরিবেশেই জ্যামিতি, দর্শন, ভারতীয় গণিত প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানার্জন শুরু করেন। তিনি খুব অল্প বয়সেই দর্শনে প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করেন।

 

সামানি সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ অবস্থার মানচিত্র । চিত্রসূত্র – Wikimedia Commons

শিক্ষা দীক্ষা 

তাঁর কৈশোর এবং বেড়ে ওঠার এসময় ছিল সামানোগুলারির শাসনকাল। পিতার কাছেই তিনি ভারতীয় পাটিগণিত চর্চা করেন। পরে আইন চর্চা করেন ইসমাইল আল জাহিদ নামের একজন স্কলারের কাছে।  শেষে উচ্চতর দর্শন পড়ার জন্য তাকে সেসময়ের বিখ্যাত দর্শন চর্চার পণ্ডিত আবু আবদুল্লাহ আল নাতিলির কাছে পাঠানো হয়। ইবনে সিনা আল নাতিলিকে সন্তুষ্ট করতে সক্ষম হন। আল নাতিলি তাকে যেসব প্রশ্ন করেন তার ঠিক ঠিক জবাব ইবনে সিনা দেন কারণ, তাঁর সেগুলো পূর্বেই পড়া ছিল। আল নাতিলি তাকে লজিক (যুক্তি) সম্পর্কে দীক্ষা দেন। প্রখর ধী-শক্তির অধিকারী ইবনে সিনা দ্রুতই তাঁর শিক্ষককে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হন।

লক্ষণীয় 

এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার লক্ষণীয়। আর তা হল, ইবনে সিনা কিন্তু হুট করে মুসলিম জগতে দর্শনচর্চা নিয়ে আসেন নি। সেসময়ের ইতিহাস সম্পর্কে একটু কম জানা থাকলে এমনটা মনে হতে পারে। ইসলামি স্বর্ণযুগের সেসময়টায় দর্শনচর্চার ক্ষেত্র বলতে গেলে প্রস্তুতই ছিল। ধারণা করা হয়ে থাকে, ইবনে আল মুকাফফা বা তাঁর ছেলে মুসলিম জগতে অ্যারিস্টটলীয় লজিক বা যুক্তির ধারণা নিয়ে আসেন। ইবনে আল মুকাফফা ছিলেন ইবনে সিনার থেকে দুই শতক আগের মানুষ। এরপর এই বিষয়ে অবদান রাখেন আল কিন্দি এবং আল ফারাবি। এই দুজনের রচনাবলি থেকেই ইবনে সিনা অ্যারিস্টটলীয় মেটাফিজিক্স বিষয়ে জানতে পারেন। ইবনে সিনা, আল ফারাবির লেখা Fî Ağrad Kitabu mâ ba’d et-Tabia (on the subject of Aristotle’s metaphysics) বইটি পড়েন। 

প্রখ্যাত মুসলিম দার্শনিক আল ফারাবি । চিত্রসূত্র – Wikimedia Commons

চিকিৎসাবিদ্যায় ব্যুতপত্তি 

আল নাতিলি বুখারা থাকাকালে ইবনে সিনা লজিক ছাড়াও, ইউক্লিড ও টলেমির উপর পড়াশুনা করেন। একসময় আল নাতিলি বুখারা ছেড়ে কারকান্সে চলে যান, যা আজকের দিনে আজারবাইজানে অবস্থিত। এরপর ইবনে সিনা পদার্থবিজ্ঞান এবং গণিতের উপর লেখা বইগুলো অধ্যয়ন করেন। মাত্র ষোলো বছর বয়সেই তিনি ইসলামি আইনশাস্ত্র এবং চিকিৎসাশাস্ত্রের উপর একসাথে পড়া শুরু করেন। একসময় তিনি পুরোপুরি মনোযোগ দেন চিকিৎসাবিদ্যায়। তাঁর মতে এটিতে দক্ষতা অর্জন করা অপেক্ষাকৃত সহজতর ছিল।  

একবার বুখারার সুলতান নুহ বিন মানসুর অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাঁর দরবারের চিকিৎসকগণ তাকে সুস্থ করতে ব্যর্থ হন। তখন তরুণ ইবনে সিনা সাহস করে দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। তিনি সুলতানকে সারিয়ে তুলতে সক্ষম হন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ, রাজকীয় সামানি গ্রন্থাগার (royal Sāmānid library) তাঁর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এতে তাঁর জ্ঞান চর্চা অন্য মাত্রা লাভ করে। মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি সেকালের বিজ্ঞানের সকল শাখায় পাণ্ডিত্য অর্জন করে ফেলেন। তিনি বুখারা ছেড়ে কারকান্সে চলে যান। তিনি সেখানে তিনি আবুল হুসাইন আস সাহলির সাথে একসাথে কাজ করেন। 

রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্বের শিকার 

তিনি নেসা, বাভার্ড, তুস, সিক্কান, সেমনিকান এবং ক্যাসেম ভ্রমণ করেন। সুলতান কাবুসের পাশের রাজ্য কার্সানেও গিয়েছিলেন তিনি। সুলতান কাবুস কর্তৃক কারাবাসের পরে তিনি দুহিস্তানে স্থানান্তরিত হন এবং তারপরে তিনি আবার কার্সানে ফিরে আসেন। মেজদ উদ দৌলার স্ত্রী এবং ছেলের চিকিৎসা করতে তিনি রাইতে আসেন। তিনি মেজদ উদ দৌলারও চিকিৎসা করেন যিনি নৈরাশ্য রোগে (melancholy) আক্রান্ত ছিলেন। অতঃপর তিনি কাজভিন ও হামাদানেও যান। ইবনে সিনা সুলতানকে নিরাময় করেছিলেন, এবং পরবর্তীতে সুলতান শামস উদ দৌলা কর্তৃক উজির হওয়ার প্রস্তাব গ্রহণও করেছিলেন। 

কিন্তু কোনো এক সমস্যার কারণে তিনি পালিয়ে গিয়ে চল্লিশ দিন আবু সাইদের বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। তবে সেসময়ের সামরিক বাহিনী তাকে বন্দী করে। কিন্তু সুলতান অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে প্রাসাদে আনা হয় এবং দ্বিতীয়বারের মতো তিনি উজির হন। সুলতান মারা গেলে তিনি আলা উদ দৌলাকে তাঁর চাকরিতে প্রবেশের ইচ্ছার কথা জানিয়ে একটি চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু এই খবর পেয়ে যান নতুন সুলতান তাজ উল মুলক। তিনি ইবনে সিনাকে চার মাসের জন্য দুর্গে বন্দী করে রাখেন। কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি সুলতান আলা উদ দৌলার কাছে ইসফাহানে চলে যান।

মৃত্যু 

ইবনে সিনা তাঁর গবেষণার জীবনে কিছুটা স্বস্তি পান বলতে গেলে এই সুলতান আলা উদ দৌলার সাথে থাকাকালীন সময়ে। এসময় তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে মুক্তি পান এবং তাঁর কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। প্রতি শুক্রবার ইবনে সিনা সাপ্তাহিক আলোচনাসভার আয়োজন করতেন এবং বিভিন্ন স্কলারদের নিয়ে বিবিধ বিষয়ে তাদের আলাপ হত। কিতাব আল শিফা (Kitāb al-shifā), দানিশ নামা ই আলাই (Book of Knowledge), কিতাব আল নাজাত (Book of Salvation) এসবের মত প্রামাণ্য বইগুলো তিনি এই সময়েই লিখেছিলেন। সর্বশেষ তিনি হামদানে থাকা অবস্থায় কলিক রোগে আক্রান্ত হন। তাঁর অবস্থা দ্রুতই অবনতি ঘটতে থাকে। ১০৩৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারা যান এবং তাঁকে হামাদানেই দাফন করা হয়।

জীবন দর্শন সম্পর্কে ইবনে সিনার একটি উক্তি দিয়ে এই নিবন্ধ শেষ করছি – 

আমি সময়ের মাপকাঠিতে নয়, কর্মের মাপকাঠিতে দীর্ঘ জীবন পছন্দ করি 

I prefer a short life with width to a narrow one with length.

সূত্র – Genius of Arab Civilizations বই

লেখক – M.A. Martin.

বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ইবনে সিনার ইবনে অবদান নিয়ে আমরা আলোচনা করবো দ্বিতীয় পর্বে। তাই চোখ রাখুন বিজ্ঞানবর্তিকার ওয়েবসাইটে। শীঘ্রই আসবে দ্বিতীয় পর্ব।  

তথ্যসূত্র 

  1. Biyografya
  2. Encyclopedia Britannica
  3. Encyclopedia Iranica

ফিচার ছবিসূত্র – Wikimedia Commons

মধ্যযুগের আরেক বিশিষ্ট মুসলিম বিজ্ঞানী যিনি আলোকবিজ্ঞানের আবিষ্কারক হিসেবে খ্যাত, হাসান ইবনে হায়সাম সম্পর্কে জানতে এই নিবন্ধটি পড়ে দেখুন – 

হাসান ইবনে হায়সাম: আধুনিক আলোকবিজ্ঞানের জনক

আরও পড়ুন – 

গোলাকার সৌরকোষ কি পারবে সমতল সৌরকোষকে টেক্কা দিতে?

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close