পরিবেশপৃথিবী

বরফযুগে পৃথিবী – পর্ব ০৩ঃ (কোয়াটারনারি যুগ)

মানুষ পৃথিবীতে এসেছে এই কিছু বছর পূর্বে। তার পূর্বে অসংখ্য প্রজাতির প্রাণী, উদ্ভিদ, অণুবীক্ষণিক জীব (যেমন, ব্যাক্টেরিয়া) ইত্যাদি এই পৃথিবীতে অবস্থান করতো। অর্থাৎ, প্রায় অনেকগুলো প্রজাতি বিভিন্ন বরফযুগের মধ্য দিয়ে নিজেদের জীবন অতিবাহিত করেছে এবং অনেকে চিরতরে এই পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিয়েছে। এখন উন্নত জীব হিসেবে আজ থেকে প্রায় ৩ লক্ষ বছর পূর্বে মানুষের ( Homo sapiens) যখন এই পৃথিবীতে আবির্ভাব হয় তখন পরিবেশ কিছুটা অনুকূলে ছিল।

চিত্রঃ বরফে মোড়ানো পৃথীবী; ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহকৃত

অর্থাৎ, পেলিওজোয়িক বরফযুগের অনেক পরে মানুষের আগমন ঘটে, কিন্তু উন্নত মানুষের আগমন ঘটে কোয়াটারনারি বরফযুগের মধ্যে। কিন্তু মানুষ কিভাবে ঐযুগে এরূপ বিরূপ আবহাওয়ায় বেচে ছিলো? এটি এখনো অনেক বিজ্ঞানীদের নিকট রহস্য হিসেবেই রয়ে গিয়েছে। হয়ত এর রহস্য উন্মোচন করবে এই কোয়াটারনারি বরফযুগ।

কোয়াটারনারি বরফযুগ

কোয়াটারনারি বরফযুগ বা কোয়াটারনারি যুগের সূচনা হয় ২.৬ মিলিয়ন বছর পূর্বে যা বর্তমান পর্যন্ত বহাল রয়েছে। এই যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার ঠান্ডা এবং গরম আবহাওয়ার সময়সীমাগুলি। অর্থাৎ, কোয়াটারনারি যুগে নতুন একটি বরযুগের সূচনা হলেও তা কিছু সময়সীমায় ভাগ হয়ে আছে। পৃথিবী কিছু সময় (প্রায় ১০,০০০ বছর) ঠান্ডা ছিলো (বরফে ঢাকা) আবার কিছু সময় উত্তপ্ত ছিলো। ঠান্ডা সময়টিকে বিজ্ঞানীদের মতে গ্লাসিয়াল এবং উত্তপ্ত সময়টিকে ইন্টারগ্লাসিয়াল সময় হিসেবে ধরা হয়ে থাকে।

চিত্রঃ বিমান থেকে তোলা ছবি, গ্লেসিয়ার; National geographic

কিন্তু বরফযুগ হতে হলে অবশ্যই একটি সুদীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবীকে বরফের চাদরে ঢেকে থাকতে হতো। কোয়াটারনারি যুগের একদম প্রথম দিকে পৃথিবী প্রায় ১০০,০০০ বছর ধরে বরফের নিচে চাপা পড়ে ছিল। যেসকল কন্টিনেন্ট গুলো কোয়াটারনারির আওতায় পড়ে সেগুলো হচ্ছে উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়ার কিছু অংশ (বিশেষ করে রাশিয়া, চীন, মধ্যপ্রাচ্য), এবং এন্টার্ক্টিকা। (তথ্যসূত্রঃ ন্যাশেনাল জিওগ্রাফিক- কোয়াটারনারি যুগ)

চিত্রঃ কানাডায় অবস্থিত শেষ গ্লেসিয়ারের অংশ; ইন্সটারনেট থেকে সংগ্রহকৃত

প্রায় ১০০,০০০ বছর ধরে বরফের নিচে চাপা পড়ে থাকার পর পৃথিবী বরফ যখন গলতে শুরু করে তখনো বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় বরফের টুকরোগুলো রয়ে গিয়েছে। উত্তরে অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্লেসিয়ার “ল্যাম্বার্ট-ফিসার গ্লেসিয়ার” এই ইতিহাসের সাক্ষী। এই গ্লেসিয়ারটি এখনো প্রবাহমান। তাছাড়া এন্টার্ক্টিকা মহাদেশ সম্পূর্ণই বরফে ঢেকে আছে শুধুমাত্র মেরুতে অবস্থিত বলে (দুই মেরুতে সূর্যের তাপ খুব কম পৌছায়)।

তাছাড়া সাইবেরিয়া, আর্টিক মহাসাগরে অবস্থিত বরফখন্ডগুলো এখনো টিকে রয়েছে। যদিও বর্তমানে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির পথেই রয়েছে। যার প্রকৃতিক কারন হচ্ছে এটি ইন্টারগ্লেসিয়ালে অবস্থান করছে। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘হলোসিন’।

চিত্রঃ এশিয়ায় অবশিষ্ট গ্লেসিয়ার; ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহকৃত

তাছাড়া এই বরফযুগটি ছোট ছোট কয়েকটি বরফযুগের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে। যেহেতু এই বরফযুগে ১০ থেকে ১৫ হাজার বছরের একটি ইন্টারগ্লেসিয়াল যুগের অবস্থান রয়েছে। তাই বলা যায় পৃথিবী যতনা ঠান্ডা হতে পারে, তার চেয়ে বেশি উত্তপ্তও হতে পারে। (তথ্যসূত্রঃ The Ice Age World: an introduction to quaternary history and research with emphasis on North America and Northern Europe during the last 2.5 million years; Anderson,1997)

আবহাওয়ার পরিবর্তন

কোয়াটারনারি যুগের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার আবহাওয়ার পরিবর্তন। কোয়াটারনারি বরফযুগটি একটি চক্রের মত প্রতিনিয়ত আবর্তন করে যাচ্ছে। অর্থাৎ, পৃথিবীর তাপমাত্রা প্রথম ১০,০০০ বছরে যদি -৫৬ ডিগ্রী সেলসিয়াসে থাকে তা পরবর্তি ১০,০০০ বছরে ৪৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসেও উঠে যেতে পারে। এটি অবশ্য নির্ভর করছে পৃথিবীর আবর্তন এবং অভ্যান্তরিন প্রাকৃতিক অবস্থার উপর।

চিত্রঃ গ্লেসিয়ারের বরফ গলে যাওয়া; ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহকৃত

(তথ্যসূত্রঃ “Quaternary Period”: National Geographic) 

যদি সহজাভবে উল্লেখ করি তবে বলা যায় যে প্রত্যেকটি সময়কাল একেকটি স্পন্দনের মতো। এই স্পন্দনগুলো তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে উঠা নামা করবে। যেমন গ্রীষ্মকালে স্পন্দনটি সর্বোচ্চ হবে আবার শীতকালে স্পন্দন্টি নিচের দিকে চলে যায়। এভাবে ১০০ বছর অথবা ১০০০ বছরের একটি তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকে যা পরবর্তিতে অন্যান্য তথ্যগুলোর সাথে মিলিয়ে বিভিন্ন সময়ের তাপমাত্রাগুলো তুলে ধরা যায়।

চিত্রঃ এন্টার্ক্টিকায় জমে থাকা বরফ; ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহকৃত

যখন গ্লেসিয়ারগুলো মেরু থেকে সামনের দিকে অগ্রসর হয় তখন সমুদ্রের পানির উচ্চতায় কিছুটা পরিবর্তন দেখা দেয়। পূর্বে যখন পৃথিবীর বেশিরভাগ অঞ্চল বরফে ঢেকে যেত তখন দেখা যায় সমুদ্রের পানির উচ্চতা কমে যায়। আবার ইন্টারগ্লেসিয়াল সময়ে যখন বরফগুলো গলে যায় তখন সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে নিচু ভূমিগুলো পানির নিচে চলে যায়। পানি প্রবাহের পথ সম্পূর্ণভাবে পাল্টে যায়।

যেহেতু ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ বছরে বরফের অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে, সেহেতু পানির উচ্চতা উঠানামা করছেই। এক্ষেত্রে কিছু প্রজাতির পাণীর যেমন আবির্ভাব হয়েছে, তেমনি অনেক প্রাণী হারিয়ে গিয়েছে। এমন একটি সময়ের মধ্যে কোয়াটানারি যুগের মধ্যে উন্নত মানুষের পদচারণা শুরু হয়।  

বরফযুগে মানুষ বেচেছিলো?

আজ থেকে ১০,০০০ কিংবা ১৫,০০০ বছর পূর্বের কথা একবার চিন্তা করে দেখেন। ঐসময়ের মানুষগুলো কিভাবে বসবাস করতো। ততদিনে কিন্তু মানুষ আগুন আবিষ্কার করে ফেলেছে। তবুও, হিমাংকের নিচে কোনো মানুষের পক্ষে গরম কাপড়-চোপড় ছাড়া বেচে থাকা বর্তমানে কল্পনা করাই যায় না।

কিন্তু মানুষ পেরেছিলো। শেষ যেবার গ্লেসিয়ার যুগের আবির্ভাব হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ১০,০০০ বুছর পূর্বে। তারও পূর্বে, আজ থেকে প্রায় ১৯৫,০০০ বছর আগে তাপমাত্রায় হঠাৎ পরিবর্তন আসায় অনেক প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যায়। এমনকি অনেক সামুদ্রিক প্রানীও বিলুপ্ত হয়। সেখানে অনেক মানুষ বেচে ছিলো।

চিত্রঃ কোয়াটারনারি যুগের প্রাণি; ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহকৃত

কিছু বিজ্ঞানীদের মতে আফ্রিকার দক্ষিণ উপকূলে অনেক মানুষের বসবাস ছিল। তার কারণ হিসেবে তারা দেখিছেন সেই সময়ে ঐ এলাকার তাপমাত্রা অনুকূলে ছিল। অন্তত বেচে থাকার জন্য তো বটেই। ঐখানকার বিভিন্ন গুহায় মানুষ বসবাস শুরু করে। সেই জায়গাটিকে “দ্যা গার্ডেন অফ ইডেন” বলা হয়ে থাকে।

আবার কিছু বিজ্ঞানীর মতামত অনুযায়ী ( প্রোফেসর মোরেন্স, ২০১৩) কিছু মানুষ লোহিত সাগরের আসে পাশের এলাকায় অবস্থান নেয়। ঐ এলাকায় বিজ্ঞানীরা প্রচুর প্রত্নতত্বের জিনিসপত্র খুজে পান। তারা ভাবছেন ৭০,০০০ বছর পূর্বে এই এলাকা শুকনো ছিলো। কারণ বেশিরভাগ পানি বরফে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। এই সুযোগে মানুষগুলো লোহিত সাগর পার হয়ে আরবের দিকের স্থানান্তরিত হয়।

কিছু কিজ্ঞানী মনে করেন যে মানুষ আগুন দিয়ে বিভিন্ন অস্ত্র এবং সরঞ্জাম বানাতে পারদর্শি হয়ে উঠে। এতে করে তারা উত্তরের দিকে অগ্রসর হয় এবং আগুন ব্যবহার করে ইউরোপে বসবাস করা শুরু করে। সব কিছু ঘটেছিল প্রায় আজ থেকে ৫০ বা ৬০ হাজার বছর পূর্বে। (তথ্যসূত্রঃ Human survived the ice age: Science-tech)

‘নিয়ান্ডারথালস’ ‘রা (বিজ্ঞানীদের মতে বর্তমান মানুষের পূর্ব প্রজাতি) ইউরোপ অঞ্চলে আজ থেকে প্রায় ৪০,০০০ বছর আগ পর্যন্ত বসবাস করতো। তাদের সময়কার কিছু প্রাণী যেমন ম্যামথস, গাড় পশমের গন্ডার, লম্বা দাঁতযুক্ত বিড়াল, এমনকি ভাল্লুক একটি গ্লেসিয়াল যুগে হারিয়ে যায়।

বিজ্ঞানীদের মতে আজ থেকে প্রায় ২৬,৫০০ বছর পূর্বে তাপমাত্রা সর্বোনিম্নে পৌছে যায়। দুর্ভাগ্যবসত ঐ ছোট বরফযুগে কোনো প্রাণী বাঁচতে পারেনি (ইউরোপে)। এদের মধ্যে কোনো কোনো প্রাণীর ওজন ছিল ২০০০ পাউন্ডেরও বেশি। তাদের অনেকের দেহাবশেষ বরফের নিচে থাকায় সেগুলো পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা খুজে পান এবং তাদের গবেষণা চলমান রয়েছে। (তথ্যসূত্রঃ Humans survival on ice age: National Geographic)

বরফযুগের সমাপ্তি কিভাবে ঘটলো?

বরফযুগের সমাপ্তি ঘটে থাকে কয়েকটি কারণে। সেগুলো হচ্ছে,

  • তাপমাত্রার বৃদ্ধি
  • পৃথিবীর আবর্তন পথ পরিবর্তন
  • পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি
  • ২৩.৫ ডিগ্রীতে বাকা হয়ে থাকা
  • সমুদ্রের পানি প্রবাহ

উপরের কারঙুলোর মধ্যে সবচেয়ে যৌক্তিক কারণ হচ্ছে পৃথিবীর ২৩.৫ ডিগ্রী কোণে বাকা হয়ে থাকা। আমরা সকলেই জানি যে সূর্য সারা বছরে পৃথিবীর সকল জায়গায় সমানভাবে তাপমাত্রা পৌছায় না। সূর্য উত্তর দিকে হেলে থাকলে দক্ষিণে তাপমাত্রা কমে যায়। একই ঘটনা দক্ষিণেও ঘটে থাকে। শুধুমাত্র মেরুতে সূর্যের আলো সবচেয়ে কম পৌছায় বলে সেখানে তাপমাত্রা হিমাংকের নিচে থাকে। এই জন্য মেরুতে টানা ৬ মাস দিনে এবং ৬ মাস রাত থাকে। (তথ্যসূত্রঃ The history of the Ice age: History.com)

পৃথিবীর ঘূর্ণন গতির জন্য সমুদ্রের পানির প্রবাহ বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং উষ্ণ বায়ু পৃথিবীর বিভিন্ন কন্টিনেন্টের বরফ গলাতে সাহায্য করেছিলো।

বরফযুগের ভবিষ্যৎ

সত্যি বলতে বরফযুগের ইতি আপাতত হচ্ছে না। আজ থেকে প্রায় ১০,০০০ বছর পূর্বে একটি বরফ ক্ষুদ্র বরফযুগ শেষ হয়েছিলো। আবার এখন থেকে প্রায় ১০,০০০ কিংবা ১৫,০০০ বছর পর আরেকটি গ্লেসিয়ার এসে বরফযুগের সূচনা করতে পারে যেখানে পৃথিবীর তাপমাত্রা হিমাংকের অনেক নিচে অবস্থান করবে।

বর্তমানেও দেখা যাচ্ছে গত কয়েক বছরের মধ্যে শীত অনেক বেশি পড়ছে। তাছাড়া ২০১৬ সালের শেষের দিকে সাহারা মরুভূমির উত্তর-পশ্চিমে তূষারপাত হয়েছিলো। যা কেউ হয়ত ভাবতেও পারেনি। কারণ বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়েই চলেছে। যা পৃথিবীর তাপমাত্রা পূর্বের চেয়ে গড়ে প্রায় ১.৫-২ ডিগ্রী সেলসিয়াস বেশি। বিষয়টির প্রাকৃতিক এবং মানুষের ভুল দুটিই রয়েছে। যদিও এই সময়টাতে তাপমাত্রা একটি বেশি থাকার কথা। সাথে শীতের সময় তাপমাত্রা অধীক হারে কমে যাওয়ার কথা। এটি সম্পূর্ণই হিসেবের মধ্যে যে সময়ের কথা উল্লেখ রয়েছে তার সাথে মিলে যায়।

চিত্রঃ উত্তর মেরুর কাছাকাছি অবস্থিত গ্লেসিয়ার

বরাবরের মতোই এখনো পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। তার সাথে এই বছর পৃথিবীর ফুসফুস নামে খ্যাত আমাজন বনভূমির প্রায় ২০ ভাগ পুড়ে যায়। তাছাড়া গাছপালা কেটে ফেলা, সমুদ্রে ময়লা-আবর্জনা ফেলা, অনবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়গুলি আমাদের পরিবেশের উপর প্রভাব ফেলছে। পরবর্তী বরফযুগ আমাদের দেখা হবে না, কিন্তু পৃথিবী তার সর্বোচ্চ তাপমাত্রার সাক্ষী হিসেবে আমাদের উপর তার প্রভাব রেখে যেতে পারে।

আল্লাহ হাফেজ  

বরফযুগে পৃথিবী- (পর্ব ০১)

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close