পদার্থবিজ্ঞানমহাকাশ

এলিয়েন রাজ্য হতে কেমন দেখাবে আমাদের পৃথিবী?

এক্সোপ্ল্যানেট বা সৌরজগতের বাইরের গ্রহ নিয়ে মানুষের কৌতূহল বহুকাল ধরেই। এক্সোপ্ল্যানেট নিয়ে গবেষণা গত ১০ বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। ইতিমধ্যেই ৪০০০ এর অধিক এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব এক্সোপ্ল্যানেটের আবহাওয়া, অবস্থান সব কিছু নিয়েই চলছে বিস্তর গবেষণা। আর এর অবশ্যই একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। অতিরিক্ত জনসনংখ্যা আর পরিবেশ দূষণের মাধ্যমে আমরা আমাদের সুন্দর পৃথিবীকে করেছি বিষাক্ত। তাই আমরা আছি নতুন বাসস্থানের খোঁজে যেখানে আমরা গড়ে তুলব মানব বসতি। আর এই বিশাল মহাজগতে অন্য কোন এক গ্রহে কোন এক জীবের বাস থাকাটাই স্বাভাবিক। যদি তাদের সাথেও কোনভাবে যোগাযোগটা করা যায়।

কিন্তু বিষয়টা অন্যরকমও হতে পারে। হতে পারে দূরবর্তী কোন গ্রহে মানুষের চেয়েও অধিক বুদ্ধিমান প্রানি বিদ্যমান। যাদের গ্রহ পৃথিবীর চেয়েও বেশি বাসযোগ্য। আর তাদের কাছে আমরা এলিয়েন আর আমাদের পৃথিবী একটি এক্সোপ্ল্যানেট। পাশাপাশি দেখা গেলো যে ভিনগ্রহ বাসীরা আমাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত। আর তারা নিয়মিতভাবে আমাদের আর আমাদের গ্রহের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। অর্থ্যাৎ আমরা নিজেদের অজান্তেই কারো কাছে নজরবন্দী অবস্থায় রয়েছি।

যদি এটা সত্যি হয় তবে এই অবস্থায় তারা আমাদের পৃথিবীকে ঠিক কি অবস্থায় বা কিভাবে দেখছে? এর উপর ভিত্তি করে ক্যালটেকের গবেষকেরা পৃথিবীর একটি নকশা বানিয়েছেন।

যদি এলিয়েনরা আমাদের উপর নজর রেখে থাকে তবে তারা পৃথিবীকে ঠিক নিচের ছবিটির মতো দেখবে

দূরবর্তী পর্যবেক্ষকের নিকট আমাদের পৃথিবী

গবেষকদল এই গবেষণার নাম দেন Earth as an Exoplanet: A Two-dimensional Alien Map এস্ট্রোফিজিকাল জার্নাল লেটারে সম্প্রতি এই গবেষণা পত্রটি প্রকাশিত হয়। এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন স্টিগেং ফ্যান। আর তার সহযোগী গবেষকেরা ছিলেন California Institute of Technology এর  Division of Geological and Planetary Sciences (GPS) এবং NASA Jet Propulsion Laboratory এর সদস্যবৃন্দ।

এখন প্রশ্ন আমাদের পৃথিবী দেখতে এরকম কেনো হবে?

আমরা অন্য গ্রহের সারফেস সহ অন্যান্য বিষয় যেভাবে দেখতে পাই তার উপর ভিত্তি করে বানানো এই মডেল। এক কথায় ইনভার্স ক্যালকুলেশন। অর্থ্যাৎ, আমরা এবার অন্য গ্রহ থেকে নিজেদের পৃথিবীকে দেখছি। তার মানে, এই মডেল বানানোর সময় এটা ধরে নেওয়া হয়েছিলো যে এলিয়েন এবং আমাদের প্রযুক্তি জ্ঞান সমান।

পৃথিবীর এই মডেল দেখে আসলে বিশদভাবে কিছু বোঝা যায় না। মডেলটি বেশ অস্পষ্ট। এটা অবশ্যই আমাদের প্রযুক্তিগত ব্যর্থতাকে নির্দেশ করে। আর আমাদের এক্সোপ্ল্যানেট নিয়ে গবেষণার মূল লক্ষ্য হ্যাবিটেবল জোন বা বাসযোগ্য গ্রহ খুঁজে বের করা। এক কথায় পৃথিবীর মতো আরেকটি গ্রহ খুঁজে বের করা।     

মহাকাশ বিষয়ক আন্তজার্তিক পর্যায়ের খ্যাতনামা ওয়েবসাইট ইউনিভার্স টুডে কে প্রধান গবেষক ফ্যান জানান-

প্রথমত, এক্সোপ্ল্যানেট গবেষণায় আমরা এখনো হ্যাবিটেবিলিটি বা বাসযোগ্যতার নূ্ন্যতম প্রয়োজনীয় উপাদান সমূহ নির্ণয় করতে পারি নি। কিছু ক্রাইটেরিয়া বা নির্ণায়ক প্রপোজ করা হয়েছে কেবল। তবে সেগুলোর প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে আমরা সুনিশ্চিত না। দ্বিতীয়ত, ক্রাইটেরিয়াগুলো পরিক্ষার জন্য আমাদের বর্তমানের প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়। তাই বাসযোগ্য দ্বিতীয় পৃথিবী খুঁজে পেতে আমাদের বেশিই বেগ পেতে হচ্ছে।

আমাদের জানামতে পৃথিবী একমাত্র গ্রহ যেকিনা জীবের অস্তিত্ব ধারণ করে আছে। কিন্তু দূরবর্তী কোন গ্রহে যদি প্রানের অস্তিত্ব থেকে থাকে আর তারা যদি আমাদের ব্যাপারে জানে তবে আমাদের তাদের কাছে আমাদের পৃথিবী প্রান সংরক্ষণকারী দ্বিতীয় গ্রহ। ফ্যানের ভাষ্যমতে-

অন্য গ্রহ থেকে আমাদের পৃথিবী অবজার্ভ করলে সেটা দেখতে কেমন হবে এটা আমাদের জানা দরকার। জানতে পারলে বসবাসযোগ্য গ্রহের বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা নির্ণয় করতে পারবো। আর তারপর প্রানের অস্তিত্ব খোঁজ করার জন্য এক্সোপ্ল্যানেটের কোন বিষয়গুলো খেয়াল করতে হবে তাও আমাদের জানা হয়ে গেলো। ফলে এক্সোপ্ল্যানেট নিয়ে গবেষণা আরো সুনির্দিষ্ট হবে।

আমাদের পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হল ওয়াটার সাইকেল বা পানি চক্র। ধরা হয় এই সাইকেলের কারণেই পৃথিবী একটি  বাসযোগ্য গ্রহে পরিণত হয়েছে। ওয়াটার সাইকেলে পানির নির্দিষ্ট তিনটি ফেজ বা অবস্থা থাকতে হয়। জলবায়ুতে জলীয়বাষ্প, মেঘের মধ্যে জমাট বাঁধা পানি ও বরফ টুকরো এবং ভূমিতে তরল পানির বিশাল ক্ষেত্র থাকা যেকোন গ্রহে প্রান সঞ্চারের জন্য আবশ্যক।

পৃথিবীর ওয়াটার সাইকেল

তাহলে বলা যায় যে, উপরের বিষয়গুলোর উপস্থিতি একটি গ্রহকে হ্যাবিটেবল হিসেবে নির্দেষ করবে। আর দূরবর্তী কোন গ্রহ পর্যবেক্ষণের জন্য এই বিষয়গুলো সবার আগে দেখা প্রয়োজন। আরেক গবেষক এরগো এই ব্যাপারে বলেন-

সামনে এক্সোপ্ল্যানেট গবেষণায় কোন গ্রহকে প্রাথমিকভাবে হ্যাবিটেবল বলা যায় কি না তার জন্য শুধুমাত্র সেই গ্রহের সারফেস বা ভূমি পর্যবেক্ষণ এবং মেঘ পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট হবে।

দূরবর্তী পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে পৃথিবী কেমন হবে তা জানার জন্য  NASA এর Deep Space Climate Observatory (DSCOVR) satellite দিয়ে পৃথিবীর ৯৭৪০টি ছবি তোলা হয়। প্রতি ৬৮-১১০ মিনিট পরপর ছবিগুলো তোলা হয়েছিলো। ছবি তোলার সময়কাল ছিলো ২০১৬-২০১৭ সাল। বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর প্রতি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের রিফ্লেকশনও ছবির মাঝে ধরা পড়েছিলো।

ফ্যান ও তার গবেষকদল এই ৯৭৪০টি ছবিকে একীভূত করে পৃথিবীর সমগ্র এলাকার জন্য ইন্টিগ্রেট করে। আর এভাবে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে তারা পৃথিবীর মডেলটি তৈরি করেন।

লাইট কার্ভ ও ল্যান্ড ফ্র্যাকশন

পৃথিবীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তার লাইট কার্ভ। পৃথিবীতে এক গোলার্ধে আলো থাকলে অন্য গোলার্ধে থাকে অন্ধকার। ফলে স্থানভেদে আলোর তীব্রতা ও ঘনত্বের পার্থক্য সৃষ্টি হয়। একটি গ্রাফে স্থানের সাথে আলোর সম্পর্ক উপস্তথাপন করলে একটি কার্ভ বা বক্ররেখা পাওয়া যায়। একেই লাইট কার্ভ বলে। লাইট কার্ভ আলোকিত গোলার্ধের ল্যান্ড ফ্র্যাকশনের সাথে জড়িত। ল্যান্ড ফ্র্যাকশন একটি নির্দিষ্ট এলাকার ভূমিতে মোট জলভাগ ও স্থলভাগের অনুপাত।

এই লাইট কার্ভে ও ল্যান্ড ফ্র্যাকশনের কারণে দেখা যায় একই এলাকার ছবি একেক সময়ে একেক রকম লাগছে। যা ম্যাপ তৈরির ক্ষেত্রে একটি বড় বাঁধা।

গবেষকদের গাণিতিক ফলাফলের সাথে নাসার স্যাটেলাইটের ছবি মিলিয়ে গবেষকেরা স্থানভেদে প্রতিটি লাইট কার্ভের জন্য একটি প্যারামিটার বা আদর্শ মান নির্ধারণ করেন। তারপর প্রাপ্ত ফলাফল দূরবর্তী পর্যবেক্ষকের চোখে পৃথিবীর আনুমানিক মডেলে উপস্থাপন করেন।

লাইট কার্ভ আসলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দূর হতে আপনি যখন কোন গ্রহ দেখবেন অবশ্যই আমাদের টেলিস্কোপগুলো এতো শক্তিশালী নয় যে আপনি গ্রহটির ভূমি ও তার উপাদানও দেখতে পাবেন। এজন্য লাইট কার্ভ ভূমি বা অভ্যন্তরীন উপাদান এনালাইসিসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মডেলে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের অবস্থান

পৃতথিবীর এই মডেলটিতে কালো রেখাগুলো স্থলভাগের শুরু হওয়ার আদর্শ স্থানকে নির্দেশ করে। সবুজ রঙ দ্বারা চিহ্নিত এলাকাটি স্থলভাগ। মাঝে আফ্রিকা, সর্ব ডানে এশিয়া, বামে নর্থ ও সাউথ আমেরিকা এবং নিচে এন্টার্কটিকা। নীল ও লাল অংশ জুড়ে আমাদের জলভাগ। অগভীর জলভাগ লাল এবং গভীর জলভাগ নীল রং দ্বারা চিহ্নিত।

পাঠকের সুবিধার্থে তুলনামূলক ছবি

বিভিন্ন রঙের ব্যবহার হয়েছে লাইট কার্ভের কারণে। পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য গ্রহ খুঁজে পাওয়ার অভিযানে আমরা যদি কোন গ্রহের লাইট কার্ভ মডেলের সাথে আমাদের মডেলের সাদৃশ্য পাই তবে আমরা বলতেই পারি যে সেই গ্রহটি জীবের জন্য বাসযোগ্য।

এ সম্পর্কে ফ্যান বলেন-

একটি গ্রহের লাইট কার্ভ মডেল হতে সেই গ্রহের আবহাওয়া, জলবায়ুর পরিবর্তন ইত্যাদি সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। আর পৃথিবীর লাইট কার্ভের উপর এখানকার মেঘ, জলভাগ, স্থলভাগের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। যদি দ্বিতীয় কোন পৃথিবী থেকে থাকে তবে অবশ্যই সেখানকার লাইট কার্ভ মডেলও অবশ্যই আমাদের পৃথিবীর মতোই হবে।

আশা করছি অদূর ভবিষ্যতে আরো উন্নত প্রযুক্তিতে তৈরি হওয়া টেলিস্কোপ এক্সোপ্ল্যানেট এনালাইসিসকে আরো সমৃদ্ধ করবে। খুব দ্রুত আমরা খুঁজে পাবো বসবাসের জন্য দ্বিতীয় পৃথিবীকে। আর এলিয়েন থেকে থাকলে তারও দেখা পাবো এক সময়ে।    

তথ্যসূত্রঃ curiosity.com, universe today          

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close