জীববিজ্ঞান

ডিএনএ এর খোঁজে: পর্ব-৩ ( ডিএনএ এর অনুলিপন)

২য় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।   

বাচ্চাটার চোখ দুটো কত সুন্দর, বা কোন কোন সময় কোন লম্বা মানুষকে দেখলে আমরা বলি ও তো বংশগতভাবে লম্বা। মানুষের আচরণের জন্যও আমরা এমন কথা বলে থাকি। এবং জানি যে এসব কিছুই হয় আমাদের ডিএনএর জন্য। যা যুগ যুগ ধরে আমাদের মাঝে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে প্রবাহিত হয়ে আসছে।

ডিএনএ বংশগতির ধারক ও বাহক একথাটা আমরা সবাই জানি এবং ডিএনএ এর কথা আসলে আমরা সবাই বলে থাকি।

গত দু’পর্ব থেকে আমরা জানি যে কেন ডিএনএ কে বংশগতির ধারক ও বাহক বলা হয় এবং কিভাবে তা আমরা পেয়েছি, কিন্তু আমরা জানিনা কিভাবে তা ক্রমোজমের বিভক্তির সময় এক কোষ থেকে অন্য কোষে যাচ্ছে। এক ডিএনএ থেকে অন্য ডিএনএ তে সে বৈশিষ্ট্য প্রবাহিত হচ্ছে। অর্থ্যাৎ কিভাবে ডিএনএ তার অনুলিপন তৈরি করছে।

আর তা জানতে হলে আমাদের আবার ফিরে যেতে হবে ওয়াটসন ও ক্রিকের ডিএনএ এর মডেলের কাছে।

সেমিকনজারভেটিভ রেপ্লিকেশনঃ

ওয়াটসন এবং ক্রিক এর মডেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল যে এটা ডিএনএ এর রেপ্লিকেশন এবং মিউটেশনের ইঙ্গিত দিয়েছিল।

কিন্তু কিভাবে তা হয়েছিল?

ওয়াটসন এবং ক্রিক তাদের মডেলটির ক্ষেত্রে বলেছিলেন যে, এডিনিন (A) সবসময় থায়ামিনের (T) সাথে এবং সমপরিমানে থাকবে এবং গুয়ানিন (G) সবসময় সমপরিমানে সাইটোসিনের (C) সাথে থাকবে। তারা এটাও বলেছিলেন যে ডিএনএ হল ডাবল হেলিক্যাল আকৃতির।

এখন ডিএনএ এর ডাবল হেলিক্সকে যদি আমরা খুলি অর্থাৎ ডাবল হেলিক্সকে যদি আমরা আলাদা করি তাহলে আমরা দুটি সমান্তরাল  আলাদা স্ট্র্যান্ড পাব। যা অনেকটা এমনঃ

AGTCTAGCATCGGTTAACG

TCAGACGTAGCCAATTGC

যদি এখন এ দুটি স্ট্র্যান্ডকে আমরা আলাদা করি আমরা যেকোন একটি স্ট্র্যান্ড দেখে অন্য স্ট্র্যান্ডটি কেমন হবে তা বলতে পারব।

কেননা ওয়াটসন ও ক্রিকের মডেল অনুযায়ি এডেনিন (A) যদি সবসময় থায়ামিনের (T) সাথে থাকে এবং গুয়ানিন (G) সবসময় সাইটোসিনের (C) সাথে থাকে। তাহলে এক স্ট্র্যান্ডে যদি এডেনিন (A) হয় তাহলে বিপরীত স্ট্যান্ডে অবশ্যই থায়ামিন (T) হবে তা আমরা বলতে পারব।

এখান থেকে আমরা বলতে পারি যে, যদি দুটি স্ট্যান্ডকে আলাদা করা হয় তবে তা দুটি আলাদা কিন্তু সম্পূর্ন স্ট্যান্ডে পরিণত হয় যার থেকে পরবর্তীতে তাদের বিপরীত দুটি স্ট্যান্ড তৈরি হয়ে দুটি সম্পূর্ন আলাদা ডাবল হেলিক্স ডিএনএ তৈরি হবে।

এভাবে ডিএনএ এর অনুলিপন তৈরিকে সেমিকনজারভেটিভ রেপ্লিকেশন বা অর্ধ সংরক্ষনশীল অনুলিপন বলে। এটাও বলা হয় যে ডিএনএ সেমিকনজারভেটিভ বা অর্ধ সংরক্ষনশীল অনুলিপনের মাধ্যমে বংশগতির বৈশিষ্ঠ্য পরিবহন করে।

কিন্তু কেন একে সেমিকঞ্জারভেটিভ বা অর্ধ সংরক্ষনশীল অনুলিপন বলে?

ডিএনএ এর দুটি স্ট্যান্ড আলাদা হওয়ার পর এদের বিপরীত সংকেত বা নাইট্রজেনাস বেসের  আরও দুটি নতুন স্ট্যান্ড তৈরি হয় এবং দুটো আলাদা সম্পূর্ণ ডাবল হেলিক্স তৈরি করে। এই নতুন তৈরি দুটো স্ট্যান্ডকে ডটার ডিএনএ স্ট্যান্ড বলে এবং  নতুন তৈরি দুটো ডিএনএকে ডটার ডিএনএ বলা হয়। পূর্বেরটিকে প্যারেন্ট ডিএনএ বলা হয়।

তাহলে ডটার ডিএনএতে অথবা নতুন তৈরি ডিএনএতে পূর্বের ডিএনএ এর একটি স্ট্যান্ড এবং নতুন তৈরি একটি স্ট্যান্ড থাকছে।

যার ফলে এটি পূর্বের বৈশিষ্ট্যের অর্ধেক তার নতুন ডিএনএ এর মধ্যে সংরক্ষন করে রাখছে।

মেসেলসন ও স্ট্যাল(Stahl) পরীক্ষাঃ

ডিএনএ এর অর্ধ সংরক্ষণশীলতা এই ধারণাতা সবাই বুঝতে পারছিল যে ঠিক আছে কিন্তু বিজ্ঞানে সব সময় প্রমাণের ভিত্তিতে সব মেনে নেয়া হয় কিন্তু এর পক্ষে কোন প্রমান ছিল না।

আর এর প্রমান দিতেই ১৯৫৮ দুজন তরুন বিজ্ঞানী  নাম মেতহিউ মেসেলসন এবং ফ্রাঙ্ক স্ট্যাল যারা কিনা তখন সবে তাদের পোস্টডক্টরালে ছিলেন।

তারা চিন্তা করলেন যে তাঁরা ওয়াটসন ও ক্রিকের এই সেমিকনজাররভেটিভ মডেল বা ডিএনএ এর অর্ধসংরক্ষনশীলতা প্রমান করবেন।

এখন তারা যদি এটা প্রমান করতে চান তাহলে তাদের প্রথমে দুটি স্ট্যান্ডকে অর্থাৎ পেরেন্ট ডিএনএ এবং ডটার ডিএনএ এর স্ট্যান্ডকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হবে।

তারা ভাবলেন তারা যদি এই ডিএনএ কে রেডিও এক্টিভ রে দ্বরা পর্যালোচনা করতে পারে তাহলে তারা দুটো স্ট্যান্ডকে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করতে পারবেন।

এজন্য তারা হেভি নাইট্রোজেন ১৫(N15) নিলেন এবং তার মধ্যে E.coli ব্যাক্টেরিয়ার কয়েক প্রজন্ম ধরে কালচার করলেন। এরপর তারা এই ব্যাক্টেরিয়াগুলোকে নিয়ে হালকা নাইট্রোজেন ১৪(N14) এর মধ্যে তা প্রতিস্থাপিত করলেন।

এর কারন হল এখন যদি তারা এটিকে পরিমাপ করেন তবে তারা বুঝতে পারবেন যে আসলেও ডিএনএ সেমিকঞ্জারভেটিভ মডেল মেনে চলে কিনা। কারন এখানেও কিছুটা Hershey এবং  Chase পরীক্ষার মত দুধরনের রেডিও এক্টিভ স্ট্যান্ড আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে পারবে এবং এগুলোকে পরিমাপ করলে তারা বুঝতে পারবেন যে ডিএনএ আসলেও সেমিকনজারভেটিভ মডেল মেনে চলে কিনা।

কারন এই মতবাদ ঠিক থাকলে তার এই ব্যাক্টেরিয়াগুলো থেকে প্রথম জেনারেশনের হেভি নাইট্রোজেন ১৫, তাদের থেকে যে ডটার ডিএনএ উৎপন্ন হয়েছে তার জন্য লাইট নাইট্রোজেন ১৪ পাবেন।

সমস্যা হল তারা কিভাবে এর পরিমাপ করবেন?

এজন্য তারা CsCl এর ডেনসিটি গ্রাডিয়েন্ট সেন্ট্রিফিগেশন এর মাধ্যম নিলেন।

এখানে তারা যখন ব্যাক্টেরিয়ার প্রথম জেনারেশন বা প্রজন্মকে সেন্ট্রিফিগেশন করলেন তখন তারা শুধু হেভি নাইট্রোজেনের স্তর পেলেন। এরপর তারা যখন আবার করলেন তখন হেভি এবং লাইটের মাঝামাঝি একটা স্তর পেলেন। এরপর যখন তারা করতে থাকলেন তখন তারা হেভি এবং লাইট সস্তরই পেলেন।

এর থেকে তারা প্রমান করনে যে ডিএনএ আসলেও সেমিকঞ্জারভেটিভ মডেল অনুসরন করে।

আর তাই কোন পরিবারের এক প্রজন্মের সাথে অন্য প্রজন্মের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকলেও সম্পূর্ণটা থাকেনা। আর তাই এক মানুষ অন্য মানুষ থেকে ভিন্ন হয় এবং কোন জেনেটিক কোডের স্থানচ্যুতি হলে তার থেকে মিউটেশনের উদ্ভব হয় এবং উদ্ভব হয় নতুন বৈশিষ্ট্যের।

তথ্য সুত্রঃ

১। Text book of lehninger

২। Molecular Biotechnology by Bernard R. Glick

৩। Principle of Genetics by Gardner, Simmons, snustad

ডিএনএ এর খোঁজে: পর্ব-১ (ডিএনএ বংশগতির ধারক ও বাহক)

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close