ইতিহাস

অবশেষে পরিত্যক্ত মায়ান নগরীর রহস্য উদ্ঘাটন!

প্রাচীন মায়ান শহর Tikal হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম শহর যা প্রায় ১০০০ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে এই ধরণীতে। প্রি কলম্বিয়ান এই স্থাপনাটি আদিমযুগের এক বিস্ময়কর সৌন্দর্য ও গুরুত্বপূর্ণ নগরী হিসেবে সেসময় পরিচিত ছিল। প্রায় নবম শতাব্দীর শেষের দিকে মায়ান এই শহরগুলো ক্রমেই ফাঁকা হয়ে যেতে থাকে এবং মানুষ অন্যত্র চলে যায় রহস্যময় কারণে। এই শহরগুলোর মধ্যে Tikal এবং আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নগরী প্রায় পুরোপুরিই জনশূন্য হয়ে পড়ে! বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এই শহরটির পানি ধারণ করার চৌবাচ্চা পরীক্ষা করে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পেয়েছেন যা হয়ত আলো দেখাতে পারবে কেন এই গণ পরিব্রাজন ঘটেছিল।

University of Cincinnati এর বিজ্ঞানীদের দ্বারা পরিচালিত একটি গবেষণা দল প্রাচীন শহরটির খাবার পানি সংরক্ষণের জায়গা থেকে কিছু তলানি সংগ্রহ করে যা বর্তমান গুয়েতেমালায় অবস্থিত। সেখানে পাওয়া যায় কিছু বিষাক্ত পদার্থের উপস্থিতি এবং ধারণা করা হচ্ছে এর কারণেই হয়ত “টিকাল” শহরের মানুষগুলোর কাছে সে পানি পানের অযোগ্য হয়ে পড়ছিল। খরা কিংবা বর্ষা, নদী কিংবা ছোটো নালা সব দিক থেকেই বিভিন্ন সূত্র ধরে পানি এসে এই সংগ্রাহকে জমা হত। কিন্তু ক্রমেই বিষাক্ততা এর বেড়ে গিয়েছিল যে প্রায় এক লক্ষ মানুষ শেষ পর্যন্ত শহরটি ত্যাগ করত বাধ্য হয়। গবেষকরা জানান Tikal এর কেন্দ্রীয় পানি ধারকের এমন ভয়ংঙ্কর ভাবে রূপ পরিবর্তন শহরটিকে জীবন ফিরিয়ে দেয়ার উৎস থেকে কালেই হয়ে দাঁড়ায় জীবন নাশের কারণ হিসাবে এবং মূলত এই প্রধান কারণেই মায়ান অন্যান্য আরো বেশ কিছু শহরে ঘটে গণ বিপর্যয় ও মানুষের সবকিছু ত্যাগ করে চলে যাওয়া।

কীভাবে “টিকাল” এর পানি দূষিত হয়েছিল এবং কীভাবেই বা তা পরিচ্ছন্ন থাকত সেটা নিয়ে বিস্তর গবেষণার লক্ষ্যে বায়োলজিস্ট ডেভিড লেন্টজ এর নেতৃত্বে একতি গবেষণা দল শহরটির প্রায় দশ টি পানি সংগ্রাহক থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পাওয়া যায় এই নমুনা তে প্রাচীন কালে বিদ্যমান দুধরনের সায়ানোব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি(নীল এবং সবুজ শৈবাল)। এই প্রমাণ গুলো এটাই দেখায় যে মাইক্রো অর্গানিজম Plankothrix ও Microcystis প্রায় এক শত বৎসর যাবত সেইসব পানি সংগ্রাহকে অবস্থান করছিল যখন মায়ানরা বসতি স্থাপন করেছে। কিন্তু খরার মৌসুমে বৃষ্টির অভাবে নীল-সবুজ শৈবালের হঠাত করে বেড়ে যায় নবম শতকের মাঝামাঝি সময়ে, মায়ান দের এই শহর ত্যাগের কিছু বছর আগেই। প্রত্নতাত্বিক ভূবিজ্ঞানীরা জানান এর ফলে পানি কেবলই দূষিত আকার ধারণ করছিল যা খেতে এবং গন্ধে খুবই বাজে ছিল। কেউ অবশ্যই সবুজ- নীল শৈবালে ভরপুর পানি খেতে চাইবেনা! সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে শুধুমাত্র এই শৈবাল বা ব্যাকতেরিয়া দায়ী ছিলনা সংগ্রাহকের পানি দূষণের জন্য।গবেষণায় দেখা যায় নমুনাতে তীব্র পরিমাণ সীসা উপস্থিত ছিল।

কেন এত বেশি পরিমাণ সীসা ছিল সেটা জানতে গবেষনা কর পাওয়া যায় দীর্ঘদিন সংগ্রাহকে চাপা পড়া পাথর এবং আগ্নেয়গিরি থেকে মাটির নিচে দিয়ে আসা ছাই এসব বিভিন্ন কারণে সেসব জায়গা গুলোতে প্রচুর পরিমাণে সীসা জমা হয়েছিল। এসব কারণ ছাড়াও মানবসৃষ্ট কারণ বা মায়াদের প্রচলিত কিছু কাজের জন্যও ব্যাপারটা আরো দ্রুত ঘটেছে। মায়ান সমাজে রঙের গুরুত্ব ছিল অন্যরকম। বিভিন্ন সমাধিস্তম্ভে লাল রঙ করে রাখত। তাঁরা সেসবে লাল রঙ করে সাথে লোহার অক্সাইড মিশি্যে দিত আলাদা শেড পাওয়ার জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত যেসব বস্তু ব্যবহার করা হত এর মধ্যে একটি ছিল লাল রঙের সিন্নাবার। সিন্নাবার মার্কারি সালফাইড বা সীসার সালফাইডের একটি যৌগ এবং মানুষের জন্য ছিল খুব বিষাক্ত। হয়ত আদিম মানুষেরা জানত এর বিষাক্ততা সম্পর্কে এবং সতর্কতার সাথেই এসব দেখভাল করত। কিন্তু তাঁরা এটা বুঝতে পারেনি যে বৃষ্টির পানির সাথে ধুয়ে সেসব বিষাক্ত পদার্থ খুব বিপুল পরিমাণে সংগ্রাহকে থাকা পানিতে গিয়ে মিশতে পারে। এই রঙ শেষ পর্যন্ত খুব বিষাক্ত হয়ে পানিতে মেশে যার ফলস্বরূপ আমরা দেখতে পাই পুরো একটা গোষ্ঠীর লক্ষ লক্ষ মানুষ বাধ্য হয় শহর ত্যাগ করতে। এমনকি এতটা দ্রুত ছড়িয়েছিল যে তা শহরের মূল মন্দির ও প্রাসাদের সংগ্রাহক পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।

A model revealing Tikal’s layout in ancient times. (Nicholas Dunning/UC)

এমনও হয়েছিল যে তাঁরা যা খাবার খেত সেগুলোতেও পাওয়া যায় সীসার অস্তিত্ব যা স্বাস্থ্যেও উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি ফেলে। তাছাড়াও সেসময় মায়ানরা বিভিন্ন ভাবে পরিবেশ দূষণ করে যা বরাবরই ছিল ঝুকিপূর্ণ। কিন্তু পানির মত মৌলিক একটা জিনিসের এমন অবক্ষয় তাঁর উপর খরা পূর্ণ এসব এলাকায় বিষয়টা ছিল মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য হুমকি স্বরূপ। তাছাড়াও অব্যবস্থাপনা, মায়ান সমাজের শাসকদের বিভিন্ন ব্যর্থতা পানিকে পরিশোধিত করতে এবং নানা রূপ বিপর্যয় সেই সময় মানুষকে বাধ্য করিয়েছিল বিখ্যাত এবং ভয়ংকর সুন্দর শহরটি ছেড়ে অন্যত্র প্রস্থান করাতে।

তথ্যসূত্রঃ sciencealert.com

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close