দৈনন্দিন বিজ্ঞান

আত্মহত্যায় নারীদের চেয়ে প্রায় ৩গুণ এগিয়ে পুরুষরা!

দিন যত সামনের দিকে যাচ্ছে পৃথিবীতে আত্মহত্যার পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রতি বছর প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যার কারণে প্রাণ হারায়। আর আত্মহত্যার চেষ্টা হয় মোট ১৪ লক্ষ বার। মারা যাওয়ার জন্য দায়ী কারণগুলোর মধ্যে আত্মহত্যার অবস্থান ১০ম। কিন্তু সমস্যার ভিতরে সমস্যা হচ্ছে প্রতিবছর পুরুষের আত্মহত্যার হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আত্মহত্যার কারণ

মূল বিষয়ে আসার আগে আত্মহত্যার কারণটা জেনে নিই। আত্মহত্যার মূল ও প্রধান কারণ ডিপ্রেশন। এই ডিপ্রেশনকে আবার অনেকে মিথ বা মনের ভ্রান্ত ধারণা বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন।  

ডিপ্রেশন হচ্ছে মানুষের একটি আবেগপ্রবণ অবস্থা যেখানে সে নিজেকে খুবই নিচু বা মূল্যহীন হিসেবে গণ্য করে। যেটা পূর্বের কোন অনুশোচনা বোধ অথবা বর্তমানের কোন বিশেষ ঘটনা ও পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে জন্মায়। ডিপ্রেশনের পরিমাণ যখন সহ্য সীমার বাইরে চলে যায় তখন মানুষ জীবন কেঁড়ে নেওয়ার মত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধাবোধ করে না।

এটা আসলে একটা স্টেট অব মাইন্ড বা মনের এক বিশেষ মুহূর্ত। আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় একটানা বেশি সময় ধরে থাকে না। এই চিন্তাটা তীব্রতর ভাবে কারো মস্তিষ্কে সর্বোচ্চ ৫-৬ মিনিট থাকে। এই সময়টায় নিজেকে ধরে রাখতে পারলে বেঁচে গেলেন নতুবা………

আত্মহত্যার কিছু পরিসংখ্যান

 প্রতিবছর প্রায় যে ১০ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে যার চারভাগের তিন ভাগ পুরুষ। ২০১৮ সালে কানাডায় ৩৮১১ জন আত্মহত্যার কারণে মারা যায়। এর মধ্যে ২৮৮০ জনই ছিলেন পুরুষ। আমেরিকায় প্রতিদিন গড়ে ১৩২ আত্মহত্যায় মারা যায় যেখানে নারীদের চেয়ে পুরুষের মৃতের সংখ্যা ৩.৫৬ গুণ বেশি। মোট আত্মহত্যার ৭৯ ভাগ ঘটে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারে।

২০১৮ তে WHO এর গবেষণায় দেখা যায় প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন আত্মহত্যা করে, যেটা ২০২০ এ ২০ সেকেন্ডে নেমে আসবে বলে অনুমান করা হয়েছিল। সময়ের অনুমানটি সঠিক কিনা সেটা তো বছর শেষে যানা যাবে তবে আত্মহত্যার হার যে বৃদ্ধি পেয়েছে সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

পুরুষদের আত্মহত্যায় এগিয়ে থাকার কারণ  

পরিসংখ্যান অনুযায়ী পুরুষের চেয়ে নারীরা প্রায় ৩-৪ গুণ বেশি আত্মহত্যা প্রবণ কিন্তু মৃতের সংখ্যার দিকে তাকালে পুরো পরিসংখ্যানটাই ঘুরে যায়। তার কারণ কি?

আত্মহত্যার পদ্ধতি

পুরুষদের আত্মহত্যায় এগিয়ে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ আত্মহত্যার পদ্ধতি। পুরুষরা সাধারণত বেশি আক্রমণাত্মক বা আগ্রাসী পদ্ধতি অবলম্বন করে। যেমনঃ বন্দুক দিয়ে নিজেকে গুলি করা, ফাঁসিতে ঝোলা ইত্যাদি। কিন্তু অপরদিকে নারীরা সাধারণত হাত কাঁটা, পিল বা ট্যাবলেট খাওয়া এধরণের পদ্ধতি অবলম্বন করে যেখানে মৃত্যুঝুঁকি তুলনামূলক কম। আমেরিকায় যেসব পুরুষ আত্মহত্যা করে তার অর্ধেকের বেশি নিজের মাথায় গুলি করে থাকে। তবে পুরুষ সাহসী বলে যে বেশি আক্রমণাত্মক পদ্ধতি অবলম্বন করে বিষয়টা তেমন না। এর পেছনে কিছু মানসিক কারণ আছে। সামনের কথা গুলো পড়লেই বুঝতে পারবেন।

রাজ্যভেদে আমেরিকায় নারী-পুরুষ আত্মহত্যার হার

পুরুষের পুরুষত্ব

যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে পুরুষ আত্মহত্যা কেন করে? তবে এক কথায় তার কারণ হবে তার পুরুষত্ব। আত্মহত্যার পেছনে ডিপ্রেশনকে কারণ হিসেবে সবাই জানে তবে পুরুষের ক্ষেত্রে এই ডিপ্রেশনের ইন্টেনসিটি বা গভীরতা অনেক বেশি। আর জন্য দায়ী তার পুরুষত্ব।

মেয়েরা হরমোনাল কারণে ছেলেদের থেকে বেশি কেস-সেন্সিটিভ, ইমোশনাল বা সংবেদনশীল হয়ে থাকে। ফলে খুব সামান্য একটি বিষয়ে কেঁদে ফেলা বা ভেঙে পরার একটি প্রবণতা তাদের মধ্যে দেখা যায়। এবং ভুল সিদ্ধান্তের দিকেও পা বাড়ায়। ফলে মেয়েদের ডিপ্রেশন হার ও আত্মহত্যার চেষ্টা করার হারও বেশি। কিন্তু এর পাশাপাশি মেয়েদের রিকভার করার ক্ষমতাও ছেলেদের চেয়ে বেশি। যত দ্রুত ডিপ্রেশনে পড়ে তার চেয়েও দ্রুত রিকভার করে। আর এর কারণ হল মেয়েরা এক্সপ্রেসিভ হয় বেশি। অর্থ্যাৎ মনের ভেতরের কথা বলার জন্য কাউকে না কাউকে সে সহজেই পেয়ে যায়। ফলে রিকভারিটা দ্রুত হয়।

কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে পুরো বিষয়টাই উল্টো। আমাদের সমাজে ছেলেদের বড়ই করা হয় এভাবে যে ছেলেরা কাঁদতে পারবে না, ভেঙে পড়তে পারবে না। কাঁদতে গেলে সবাই তাকে মেয়ে বলে ক্ষ্যাপাবে। এটা ধরেই নেওয়া হয় যে ছেলেরা জন্মগত ভাবে হবে রাফ এন্ড টাফ। আর এই সাইকোলজিটা একদম ছোট বেলা থেকেই একটি ছেলের মাঝে তৈরি করা হয়।

তাই এই স্বভাবগত কারণ ও হরমোনাল প্রভাবে ছেলেরা মানসিক ভাবে শক্তিশালী হয় এবং অল্পতে ভেঙে পড়ার প্রবণতা কম। তাই ডিপ্রেশন রেট কম। কিন্তু সব কিছু যখন সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যায় তখন ভেঙে না পরে আর উপায় কি। তাই ডেপ্রেশন রেট কম হলেও ইন্টেনসিটি বেশি। আর লেস-এক্সপ্রেসিভ হওয়ায় মনের কথা বলার লোক পেতে বেশ বেগ পেতে হয়। এই বিষয়ে ছেলেরা অনেক বেশি ইনসিকিউরিটিতে ভোগে কিন্তু সেটাও প্রকাশ করতে পারে না। 

আর এটাই স্বাভাবিক। ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন, একজন মেয়ের কথা শুনতে মানুষ বেশি আগ্রহী নাকি একটি ছেলের কথা শুনতে। এই বিষয়টা কিন্তু প্রাথমিকভাবে খুব সিলি বা হালকা মনে হতে পারে। কিন্তু এই সিলি জিনিসটাই অনেক বড় কিছুর জ্বালানী হতে পারে।

স্বাস্থ্যের প্রতি অমনোযোগী

ছেলেরা স্বাস্থ্যের প্রতি খুব একটা মনোযোগী হয় না। মনোবিজ্ঞানী এড ম্যান্টেলারের মতে আত্মহত্যাকারী ভিকটিমদের ৯০ শতাংশ জীবনের কোন না কোন সময়ে মানসিক অসুস্থতার স্বীকার। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ নারী আত্মহত্যার পূর্বে তাদের মানসিক অসুস্থতা নিয়ে অবগত থাকে আর তার বিপরীতে মাত্র ৩৫ শতাংশ পুরুষ নিজের অসুস্থতা সম্পর্কে অবগত।

অন রেকর্ডে সবচেয়ে বেশি ডিপ্রেশন রোগী ও মানসিক ভাবে অসুস্থতায় নারীর সংখ্যা বেশি। কিন্তু বাস্তবতার চিত্র অন্যরকম। বেশিরভাগ পুরুষ জানেই না যে সে মানসিক ভাবে অসুস্থ বা ডিপ্রেশনের স্বীকার। আর জানতে জানতে দেরী হয়ে যায়।

ফুড হ্যাবিট বা খাদ্য তালিকাও একটি কারণ। পুরুষরা ধূমপান ও মদ্যপানে নারীদের চেয়ে অনেক অনেক গুণ এগিয়ে। আর অতিরিক্ত এলকোহল কনসাম্পশন বা মদ্যপান আত্মহত্যার প্ররোচনা জাগায়।

পুরুষের অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস

এই জিনিসগুলোই ছেলেদের আত্মহত্যায় এগিয়ে থাকার কারণ কি। তবে এর সমাধান কি?

আত্মহত্যা প্রতিরোধে করণীয়

দেখুন আত্মহত্যা একটি সামাজিক সমস্যা তাই একটি সমাজই পারে একে রোধ করতে। ছেলে বা মেয়ে যেই হোক না কেন, কারো প্রতি জাজমেন্টাল হওয়া যাবে না। কাউকে জাজ করার মতো যোগ্যতা আপনার-আমার নেই, আর এটাকে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে। প্রত্যেকের সমস্যা তার নিজ নিজ জায়গা থেকে তার কাছে অনেক বড়। অন্যের সমস্যাকে নিজের জীবনের সাথে তুলনা করে কখনো অন্যের সমস্যাকে ছোট করবেন না।

মানসিক স্বাস্থ্য, শারীরিক স্বাস্থ্যের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ তাই মানসিক স্বাস্থ্যে গুরুত্ব দিন। কোন ডিপ্রেশন বা চাপের মুখে থাকলে লোকে কি ভাববে সেটা না ভেবে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। নিজের পরিবার ও প্রিয়জনের সাথে কথা বলুন। 

যতটা পারেন নিজের কাছের মানুষদের সাথে যোগাযোগ রাখুন। আজকের যান্ত্রিক পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজই হয়তো এটা। মনে রাখবেন ফেসবুকে “you can always talk to me” লিখে পোস্ট দিলে কেউ আপনার সাথে কথা বলতে আসবে না।

আত্মহত্যার সমস্যাটা নিজেকেই নিজের দেখতে হয় কিন্তু সমস্যার কারণ যেহেতু সমাজ তাই দায়বদ্ধতা কিছুটা থেকেই যায়। আর আজকের দুনিয়ায় মানুষের মাঝে ধর্মীয় অনুরাগ কম। ধর্ম একটি বিশ্বাস, আর বিশ্বাসের জোড় অনেক। আপনি যেই ধর্মেরই হোন না কেন, নিজের ধর্মকে জানুন ও তার প্রতি অনুরাগী হোন। নিজেকে পুনরায় বাঁচিয়ে তোলার একটা না একটা রাস্তা পেয়েই যাবেন। আর নিজের কাছের মানুষের খোঁজ রাখুন, কথা বলুন। তবে সমস্যা কিছুটা হলেও কমবে।

তথ্যসূত্রঃ psycom.net, scientificamerican.com, healthydebate.ca, bbc.com, verywellmind.com, afsp.org,

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close