মহাকাশ

চাঁদের রহস্য! পর্ব-২

সবচেয়ে প্রথম চন্দ্রগ্রহণের যে ঘটনাটি রেকর্ড করা হয় তা ১১৩৬ খৃষ্টপূর্বাব্দে চীনাদের দ্বারা । তা অ্যাকিলিস ও হেক্টরের ট্রয় নগরীর যুদ্ধ ও হােমারের বিখ্যাত মহাকাব্য ইলিয়াড রচনার পূর্বে ৪১৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে পােলােপেনােসিয়ান যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। এথেন্সের কমান্ডার নিসিয়াস সব মানুষকে সে দ্বীপ পরিত্যাগের আদেশ দেন। সে রাতেও পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ হয়েছিল ও এথেন্সের নাগরিকরা বিশ্বাস করে যে ঈশ্বর সতর্কবার্তা হিসেবে এটি ঘটিয়েছেন।

১৫০৪ সালের চন্দ্রগ্রহণের ঘটনা আরাে চমকপ্রদ। সেসময় ক্রিস্টোফার কলম্বাস ছিলেন জ্যামাইকা দ্বীপে। এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন যখন স্থানীয় অধিবাসীরা তাদেরকে খাদ্য সরবরাহ দিতে অস্বীকৃতি জানালাে। কলম্বাস জানতেন যে মার্চ মাসের এক তারিখে চন্দ্রগ্রহণ ঘটবে। তাই চালাকি করে জ্যামাইকানদের বললেন যে তারা যদি তার সাথে এরকম ব্যবহার করতে থাকে তবে তিনি চাঁদের রং পরিবর্তন করে দিবেন ও এর আলাে কমিয়ে দিবেন! নির্ধারিত দিনে চন্দ্রগ্রহণ ঘটলে সবাই মারাত্মক রকম ভীত হয়ে পড়েন। তারপর তারা ও ক্ষমতাবান ভেবে তার ইচ্ছানুযায়ী কাজ করতে দেন! ১৬২০ সালে দুটো চন্দ্রগ্রহণ সংঘটিত হয়েছিল। প্রথমটি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন কেপলার। দু’বারেই চাঁদ পুরােপুরি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। হ্যাভেলিয়াস ১৬৪২ সালে একই ব্যাপার লক্ষ্য করলেন। ১৭৬১ সালে সুইডিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ওয়ারগেন্টিন একই চন্দ্রগ্রহণ দেখলেন যেখানে চাঁদ সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল যা এমনকি টেলিস্কোপ দিয়েও দেখা যায়নি।

যদিও আশেপাশের ক্ষীণ তারাগুলােও ভালােভাবেই দেখা যাচ্ছিল। বিয়ার ম্যাডলার ১৮১৬ সালে খুব অন্ধকার চন্দ্রগ্রহণ দেখেছিলেন। অন্যান্য চন্দ্রগ্রহণগুলাে আবার ব্যতিক্রমীভাবে উজ্জ্বল ছিল। যেমন, ১৮৪৮ সালে চাঁদের ছায়া রক্তলাল বর্ণধারণ করেছিল। ১৯৫০ সালে তা ছিল ঘােলা ধসর রংয়ের। ১৯৫৩ সালেই এ রং হয়ে দাড়াল ধূসরাভ গােলাপী। তবে এ বৈচিত্র্য চাঁদের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু নয়। এগুলাে বায়ুমণ্ডলের প্রভাব। আর তা নির্ভর করে চন্দ্রগ্রহণের সময় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওপর। মনে রাখতে হবে যে চন্দ্রগ্রহণের সময় প্রতিটি আলােকরশািকেই আমাদের বায়ুমণ্ডল দিয়ে পার হতে হয়। চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের পঙ্গে যদি একজন পর্যবেক্ষক থাকেন, তবে চন্দ্রগ্রহণ তার কাছে বড়ই মনােরম লাগবে । পৃথিবীর পেছনে সূর্যকে অদৃশ্য মনে হবে। আমাদের পৃথিবীকে এক উজ্জ্বল বস্তুর চারপাশে আবর্তিত। এক অন্ধকার চাকতির মতাে লাগবে। চাঁদের ওপর এর প্রভাব তখন আরাে আকর্ষণীয় মনে হবে। বিজ্ঞানী পেটিট ওনিকোলসন ১৯৩৯ সালের চন্দ্রগ্রহণের সময় তাপমাত্রা পরিমাপ করেছিলেন। তাদের গণনা থেকে বেরিয়ে এল যে একসময় চাঁদের তাপমাত্রা ১১৬০ ডিগ্রি। ফারেনহাইট থেকে একেবারে -১১০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে নেমে যায়!

চাঁদের বায়ুমণ্ডল চাঁদের পৃষ্ঠ সম্বন্ধে বিস্ময়ের শেষ থাকে না যখন জানা গেছে যে চাঁদের পৃষ্ঠ আমরা যেমনটা ভেবেছিলাম পৃথিবীর তুলনায় তার চেয়েও বিসদৃশ। তবে পার্থক্যের যে ব্যাপারটি লক্ষণীয় তা হল এতে বাতাসের অনুপস্থিতি। বাতাসের অনুপস্থিতির কারণেই চাঁদ ভূতুড়ে রকম। নীরব, শুষ্ক, এর আকাশ কালাে ও তাপমাত্রার চরম অবস্থা। এ কারণে আমরা চাঁদে অরক্ষিত। অবস্থায় হাঁটতে পারব না। এ কারণে চাঁদে কেউ উপনিবেশ স্থাপন করতে চাইলে তাকে বড় এয়ারটাইট বা বায়ু নিরােধক ডােম নির্মাণ করতে হবে ।

তবে চাঁদে কিছুটা বাতাস কিন্তু রয়েছে। এর বায়ুমণ্ডল একেবারে পাতলা। পৃথিবীর কোনাে জীবের সেখানে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে টিকে থাকার কথা নয়। কীভাবে চাঁদ প্রায় বায়ুশুন্য হয়ে গেল? এর উত্তর হচ্ছে চাঁদ পৃথিবীর তুলনায় কম ভারী। তাই এর মহাকর্ষীয় টানও কম। প্রতিটি বস্তু তা সে ছােট হােক আর হােক না বড়, এর নির্দিষ্ট মহাকর্ষীয় আকর্ষণ রয়েছে। বস্তু যত ভারী হবে এর আকর্ষণও তত বেশী। সূর্য পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ৩ লক্ষ গুণ বেশি ভারী। এর মহাকর্ষীয় টান এত বেশী যে এটি পুরাে সৌরজগতেই রাজত্ব করে ও গ্রহগুলােও স্বীয় কক্ষপথে বিচরণ করে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র বস্তু যেমন ছােট গ্রহাণু বা মঙ্গলের দুই উপগ্রহের আকর্ষণ খুবই কম। একজন মানুষ যদি মঙ্গলের উপগ্রহ ডিমােস থেকে লাফ দেয় তবে সে আর নিচে পড়বে না! কারণ ডিমােসের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ এতটাই কম যে সে ডিমােসের আকাশে তথা আন্তঃগ্রহ স্থানে পৌঁছে যাবে! যদি আপনার হাতে একটি বল রাখেন ও ছেড়ে দেন তাহলে এটি নিচে মাটিতে পড়ে যাবে। কারণ পৃথিবীর মহাকর্ষীয় আকর্ষণ একে নিচের দিকে টানবে। তবে এটিও সত্য যে বলটি সেখানেই থাকতে চায়, কিন্তু পৃথিবীর ভর সে তুলনায় অনেক বেশী বলে তা মাটিতে পড়তে বাধ্য হয়। তারপর আপনি যদি বলটিকে আকাশের দিকে ছুঁড়ে মারেন তবে বলটি কিছু দূরত্ব অতিক্রম করবে। তারপর গতি থেমে গিয়ে আবার নিচের দিকে পড়তে থাকবে। যত জোরে ছুঁড়বেন এটি আরও ওপরে উঠবে ও কিছুটা বেশি সময় নিয়ে নিচে এসে আপনার হাতে পড়বে। কল্পনা করে নিন আপনি প্রচন্ড শক্তিশালী। আপনার এত শক্তি আছে যে আপনি বলটিকে সেকেন্ডে ৭ মাইল বেগে ছুঁড়তে পারেন। বলটিকে উপরে ছুড়ে মারলেন। এবার একটি অবাক করা ঘটনা ঘটবে। এটি আর নিচের দিকে পড়বে না। চলে যাবে মহাকাশে! কারণ পৃথিবীর বিশাল ভরের মহাকর্ষীয় টানও আর বলকে আটকে রাখতে সক্ষম নয়। প্রতি সেকেন্ডে ৭ মাইলের এ গতিবেগকে বলে পথিবীর মুক্তিবেগ। তবে ডিমােসের মুক্তিবেগ মােটেও এতটা বেশী নয়। তাই সেখানে সেকেন্ডে ৭ মাইল বেগে বল ছােড়ার কোনােই প্রয়ােজন নেই। এমনকি চাঁদেও মক্তিবেগ সেকেন্ডে মাত্র দেড় মাইল। আর এ কারণেই চাদের নিম্ন মুক্তি বেগের জন্য বাতাসের পরিমাণও কম।

বাতাস অণু দ্বারা গঠিত। অণু আবার পরমাণু দ্বারা গঠিত। একটি অণু অবিশ্বাস্য রকমের ক্ষুদ্র। কেমন ক্ষুদ্র জানতে চান? একটি ছােট বক্স নিন যার আয়তন এক ঘন ইঞ্চি ও এতে সাধারণ বাতাস থাকবে। যদি আমরা প্রতি সেকেন্ডে এক কোটি অণু এই বক্স থেকে বাইরে ছাড়ি তবে এই বক্স সম্পূর্ণ খালি হতে কত সময় লাগবে বলে মনে হয়? এক সেকেন্ড-এক মিনিট-এক মাস? না। ৫ কোটি বছর!

আমাদের মস্তিষ্ক এত ক্ষুদ্র কিছুর অস্তিত্ব বুঝতে সক্ষম নয়। তাই শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়েও একটি একক অণু দেখা যায় না। কোনাে কিছু যত ছােটই হােক তা মহাকর্ষীয় আকর্ষণে আটকা পড়ে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অণুও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। এরা উচ্চ গতিতে চলাচল করে। অণু যত হালকা হয় এর গতিও তত উচ্চ হয়। হাইড্রোজেন অণু গ্যাসের মধ্যে সবচেয়ে হালকা ও সবচেয়ে দ্রুতগতির একটি অণু যদি পৃথিবীর মুক্তিবেগের চেয়ে বেশী গতিতে ছুটে তবে এটি মহাকর্ষীয় টানকে উপেক্ষা করে মহাকাশে চলে যেতে পারবে। হাইড্রোজেনের ভর কম বলে ঠিক সে ব্যাপারটিই ঘটেছে। অক্সিজেন ও নাইট্রোজেনের পরিমাণ আমাদের বায়ুমণ্ডলে সবচেয়ে বেশী। এরা হাইড্রোজেন। অণু থেকে অনেক ভারী ও এদের গতিও কম। তাই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এরা আটকা পড়ে গেছে। আবার কার্বন ডাই-অক্সাইড বা সােডা পানিতে পাওয়া কার্বনিক এসিড গ্যাসও যথেষ্ট ভারী।

চাঁদের মুক্তিবেগ অনেক কম বিধায় এটি অণুগুলাে ধরে রাখতে পারেনি। কেবল হাইডােজেন নয়, প্রায় বেশিরভাগ অণুই এর বায়ুমণ্ডল ছেড়ে চলে গেছে। পরে রয়েছে অপেক্ষাকৃত ভারী ও কম গতির অণুগুলাে। অক্সিজেন সেখানে অনুপস্থিত। তাই চাঁদের বায়ুমণ্ডল আরও হাজার গুণ ঘন হলেও সেখানে আমরা নিঃশ্বাস নিতে পারব না।

তথ্য সুত্রঃ In depth NASA Science, Epic Moon: A History of Lunar Exploration in the Age of the Telescope William Sheehan

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close