বিবিধমহাকাশ

“একটি এক্সো-প্ল্যানেট এবং তার নক্ষত্রের নামের জন্য বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলো International Astronomical Union”

International Astronomical Union কীভাবে নাম গ্রহণ করেছে?

অসীম মহাবিশ্বে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য রহস্যময় জিনিসের মধ্যে অন্যতম হলো বসবাসের জন্য পৃথিবীর মতো একটি গ্রহ খোঁজা। আর তার জন্য অবশ্যই আমাদেরকে আমাদের সোলার সিস্টেমের বাহিরে যেতে হবে। এই সোলার সিস্টেমের বাহিরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অগণিত গ্রহ যাদেরকে বলা হয় Exoplanet বা বাহ্যগ্রহ। মহাবিশ্বের এই অগণিত গ্রহের মতো কোনোটি হতে পারে আমাদের পৃথিবীর ন্যায় বসবাসযোগ্য। আর তারই সন্ধানে ছুটে চলেছে “Kepler Space Telescope.” ৮ই ডিসেম্বর ২০১৯ সাল পর্যন্ত তথ্যমতে Kepler Space Telescope ৪১০৪ টি বাহ্যগ্রহকে শণাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। তাহলে আপনাদের অনেকের মনে এতক্ষণে প্রশ্ন জেগেছে যে কি এই বাহ্যগ্রহ। তাইনা? তাহলে চলুন জেনে আসা যাক এই বাহ্যগ্রহ সম্পর্কে।

Exoplanet কী?

চিত্রঃ “Pink Planet” নামক একটি বাহ্যগ্রহ

এবার আসা যাক Exoplanet কি এই ব্যাপারে। Exoplanet মানে হলো ভিনগ্রহ। যে সকল গ্রহ আমাদের সোলার সিস্টেমের বাইরের কোনো নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরে তাদেরকে বলাহয় Exoplanet. অর্থাৎ আমাদের সোলার সিস্টেমের বাইরের গ্রহগুলোকেই বলা হয় Exoplnet। ১৯১৭ সালে সর্বপ্রথম এই exoplanet এর সন্ধান পাওয়া যায়। ৮ই ডিসেম্বর, ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই exoplanet এর সংখ্যা হলো ৪১০৪ টি। প্রতিদিন এমন অসংখ্য exoplanet আবিষ্কৃত হচ্ছে যার অধিকাংশই ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে গঠিত এবং রহস্যেঘেরা। এই exoplanet গুলোর এমন অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের দিকে তাকালেই আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য করে যে তাহলে কতটাইনা বৈচিত্র্যময় এবং রহস্যে ঘেরা আমাদের এই মহাবিশ্ব যার অধিকাংশই এখনো আবিষ্কার হওয়া বাকি।

আর এরই ধারাবাহিকতায় “International Astronomical Union (IAU)” এর হাত ধরে অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশও একটি বাহ্যগ্রহ এবং তার হোস্ট নক্ষত্রের নামকরণের মাধ্যমে বাঙ্গালীয়ানার ছোঁয়া লাগাতে সক্ষম হয়েছে। তবে চলুন এর বিষয়ে বিস্তারিত জেনে আসা যাক।

Name ExoWorlds:

“International Astronomical Union (IAU)” এর শততম পূর্তি উপলক্ষ্যে পৃথিবীর প্রতিটি দেশকে একটি করে নক্ষত্র ও গ্রহের নামকরণের সুযোগ দেয়। বাংলাদেশের মতো অন্যান্য সকল দেশ এই ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করে। এই গ্লোবাল ক্যাম্পেইনের নাম রাখা হয় “Name ExoWorlds.” এই ক্যাম্পেইনে সর্বমোট ১১০টি দেশ থেকে ৩৬০০০০টি বাহ্যগ্রহ এবং তার হোস্ট নক্ষত্রের নামের প্রস্তাবনা এসেছে। আর এই গ্লোবাল ক্যাম্পেইনে সর্বমোট ১১০টি থেকে সারাবিশ্ব ব্যাপী মোট ৭৪০০০০ জন মানুষ অংশগ্রহণ করেছে।

International Astronomical Union কীভাবে নাম গ্রহণ করেছে?

প্রতিটি দেশই সারাদেশ ব্যাপী এই গ্লোবাল ক্যাম্পেইনটি পরিচালনা করে এবং সারাদেশ থেকে আসা অসংখ্য নামের মধ্য থেকে তারা বাছাই করে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরী করে। তবে তারা যে নামগুলোকে যাচাই-বাছাই করে নির্ধারিত করেছে সেগুলোকে অবশ্যই IAU এর দেয়া নির্ধারিত নিয়মানুসারে হতে হবে। যেই নামগুলো এই নিয়ম অনুসরণ করেছে এবং তাদের প্রদত্ত শর্ত পূরণ করেছে দেই নামগুলোকে প্রতিটি দেশের জাতীয় কমিটি মিলে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরী করেছে। আর সেখান থেকে বাছাইকৃত কয়েকটি নাম IAU কে প্রেরণ করেছে। ঠিক সেখান থেকে আবার IAU যাচাই-বাছাই করে প্রতিটি দেশের জন্য আলাদা আলাদা করে একটি নাম চূড়ান্ত করে এবং তা গত ১৭ই ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্যারিসে একটি প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে ঘোষণা করে। তারপর সেই নামগুলোকে তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত করে। এখন আপনাদের মনে দুটি প্রশ্ন আসতে পারে যে বাংলাদেশকে কোন নামটি প্রদান করা হলো এবং বাংলাদেশ কীভাবে এই ক্যাম্পেইনটি পরিচালনা করলো, তাইনা? তবে চলে যাওয়া যাক বিস্তারিত শুনতে।

বাংলাদেশ যেভাবে এই গ্লোবাল ক্যাম্পেইনটি পরিচালনা করেছেঃ

প্রতিটি দেশের ন্যায় বাংলাদেশও একই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রতিটি দেশের ন্যায় “International Astronomical Union (IAU)” যে নক্ষত্রটি প্রদান করেছে তাহলো “HD-148427.” এই নক্ষত্রটি “Ophiuchus Constellation বা সর্পধারী নক্ষত্রমন্ডলে” অবস্থিত। এই নক্ষত্রটি হলো একটি কমলা রঙের জায়ান্ট স্টার। বাংলাদেশকে একটি হোস্ট স্টার এবং একটী বাহ্যগ্রহের নামকরণের জন্য দেয়া হলে গত ২৭শে আগস্ট ঢাকার কাঁটাবনে বাহ্যগ্রহ নামকরণের জন্য জাতীয় কমিটী একটি প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম শুরু করে এবং নাম জমা দেয়ার জন্য সবাইকে আহ্বান জানায়। প্রাথমিক পর্যায়ে শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় গুগল ফর্মের মাধ্যমে। দেশের যে কেউ এই গুগল ফর্মের মাধ্যমে তাদের প্রস্তাবিত নক্ষত্র বা গ্রহের নাম জমা দিতে পারবে এমনভাবে তা প্রস্তুত করা হয়।

চিত্রঃ “Name ExoWorld” ক্যাম্পেইনের উদ্বোধনী প্রেস কনফারেন্সে জাতীয় কমিটির সদস্যবৃন্দগণ

প্রায় ১৫০টি স্কুল এবং কলেজে আলাদা করে চিঠি পাঠানো হয়। বিজ্ঞানচিন্তা ম্যাগাজিন এবং প্রায় ৬টি ই – পোর্টালে এই সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এছাড়াও “বাংলাদেশ জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াড” চলাকালে প্রায় ২৫০টি ছাত্র-ছাত্রীর কাছে নামকরণের ফর্ম বিতরণ করা হয়। বাহ্যগ্রহ নামকরণ জাতীয় কমিটি ৫০টিরও বেশি চিঠি এবং ২৬টি গুগল ফর্মের মাধ্যমে নাম পায়। সেখান থেকে ৭৩ জোড়া নামের একটি তালিকা বানানো হয়। পরবর্তী সময়ে ৫ই নভেম্বর “Bangladesh Astronomical Society (BAS)” এর অফিসে বাহ্যগ্রহ নামকরণের জাতীয় কমিটির একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় কমিটির অধ্যাপক রেজাউর রহমান, এফ আর সরকার, অধ্যাপক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, মোঃ সাজ্জাদুর রহমান, হাসিবুল হোসেন রিফাত (আমি), অর্ণব রায় এবং সায়েম সরকার সিফাত। বলে রাখা ভালো যে, অধ্যাপক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী হলেন “International Astronomical Union (IAU)” এর বাংলাদেশের “National Outreach Coordinator (NOC BD)” আর হাসিবুল হোসেন রিফাত ও অর্ণব রায় হলেন IAU এর “National Event Coordinator” ও “Volunteer.” সায়েম সরকার সিফাত ও একই সংস্থার ভলান্টিয়ার।

চিত্রঃ জাতীয় কমিটির বৈঠকের মাধ্যমে “Name ExoWorld” ক্যাম্পেইনের জন্য নাম বাছাই চলছে

দীর্ঘ আলোচনার প্রথম ধাপে ৭৩ জোড়া নাম থেকে কিছু প্রাথমিক নাম বাছাই করে আলাদা করা হয়। পরবর্তীতে সেই নামগুলোর বঙ্গীয় শব্দার্থ বিশ্লেষণ, নামগুলো  IAU এর নীতিমালা মেনে চলে কিনা, নামের সাথে “Ophiuchus বা সর্পধারী তারকামন্ডলী” এর সাদৃশ্য ইত্যাদি বিষয়ে বিবেচনা করে জাতীয় কমিটি ৫জোড়া নাম বাছাই করে। নামগুলো শব্দকোষ ও ভাষাবিদদের সাহায্য নিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বাছাই করা হয়। নামগুলো সভায় উপস্থিত সদস্যদের ভোট নিয়ে ক্রমান্বয়ে সাজানো হয়। নামগুলো দেশের বিভিন্ন স্থানের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এসেছিলো। এর মধ্যে অন্যতম কিছু নাম হলোঃ তিমির, তন্দ্রা, সর্পিলিকা, নীলাভ, জোনাক ইত্যাদি। এরপর এই ৫জোড়া নামগুলোকে IAU এর কাছে প্রেরণ করা হলে তারা আবারো যাচাই-বাছাই করে গত ১৭ই ডিসেম্বর একটি প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে তা ঘোষণা করে এবং তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে তা প্রকাশিত হয়। অন্যান্য দেশের নামের সাথে সাথে বাংলাদেশকে দেয়া নাম দুটি হলোঃ

নক্ষত্রের নামঃ “তিমির”

বাহ্যগ্রহের নামঃ “তন্দ্রা”

এই নামগুলোর ব্যাখ্যার সাথে সাথে অন্যান্য দেশের নামগুলো পড়তে চলে যেতে হবে নীচের দেয়া লিংকটিতেঃ

http://www.nameexoworlds.iau.org/final-results

নামগুলোর প্রস্তাবক হলেন হলিক্রস কলেজের আবৃতি পাল চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়েশা রিদওয়ানা। আবৃতি প্রস্তাব করেছিলেন “তিমির” নামটি এবং আয়েশা করেছিলেন “তন্দ্রা” নামটি। আর এই প্রেস কনফারেন্সের দ্বারা নাম ঘোষণার মাধ্যমেই শেষ হলো IAU কর্তৃক আয়োজিত গ্লোনাল ক্যাম্পেইন “Name ExoWorld.” “International Astronomical Union (IAU)” কে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ এবং নাম প্রস্তাবকদের জানাই অভিনন্দন।

চিত্রঃ নভেম্বর মাসের “বিজ্ঞানচিন্তা” ম্যাগাজিনে প্রকাশিত সংবাদ

মহাবিশ্বকে জয় করার স্বপ্ন দেখছে মানুষ অনেক আগে থেকেই তবে বর্তমানে বিজ্ঞানের উন্নতির ধারার ফলে সেই আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা আরও বেড়ে গিয়েছে। অন্যান্য দেশ নানাভাবে মহাবিশ্বে নিজেদের অস্তিত্ব তুলে ধরেছে যা বাংলাদেশ এখনো তা তেমনভাবে করতে সক্ষম হয় নি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু করেছে কেবল। বাংলাদেশের মূসা ইব্রাহিম যেমন অন্যান্য দেশের মানুষদের মতো সর্বোচ্চ শৃঙ্গের চূড়ায় উঠে দেশের জন্য বয়ে এনেছেন এক অনন্য গৌরব ঠিক তেমনি আমরা আশা করছি একদিন এই দেশের নবজাগরণের হাত ধরেই আসবে মহাকাশ বিজয়ের সংবাদ। বাতাসে বইবে বাংলাদেশের জয় জয়কার। তবে “International Astronomical Union (IAU)” এর “Name ExoWorld” ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ কিন্তু পেরেছে এক অনন্য গৌরব। আজ মহাবিশ্বেও পৌঁছে গিয়েছে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। মাতৃভাষা বাংলায় পেয়েছি একটি বাহ্যগ্রহ এবং তার নক্ষত্রকে যা অকল্পনীয়। ধীরে ধীরে এভাবেই এগিয়ে যাবে এই দেশ, আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের হাত ধরে এভাবেই পৌঁছে যাবে এক অনন্য উচ্চতায় আর ছড়িয়ে যাবে সমগ্র মহাবিশ্ব জুড়ে।

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close