জীবনীপদার্থবিজ্ঞান

আইনস্টাইন বনাম নিউটন

আইনস্টাইন’ আর ‘প্রতিভাবান’ শব্দ দুটি ইদানীং প্রায়ই সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন- এই, আইনস্টাইন, এদিকে আসো! (এই, প্রতিভাবান, এদিকে আসো!’) অথবা, “সে আর যাই হোক, আইনস্টাইন নয়।’ (সে প্রতিভাবান নয় )। প্রতিভাবান হিসেবে আইনস্টাইনের জুড়ি নেই। আবার নিউটনও প্রতিভাবান ছিলেন। বিশ্ব-ইতিহাসের পাতায় কালের বিবর্তনে আরও অসংখ্য প্রতিভাবানের জন্ম হয়েছে। ইংরেজি সাহিত্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ব্যক্তিটির নাম কি? হ্যাঁ, অবশ্যই শেক্সপিয়ার! শেক্সপিয়ারের বাইরে পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি পাওয়া যাবে না, যার নাটক আর কবিতার শব্দভাণ্ডার এত সমৃদ্ধ ছিল। তার সাহিত্যকর্মে ৩১,৫৩৪ টি শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়! এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তিনি ৬৬,০০০-এরও বেশি শব্দ জানতেন। শেক্সপিয়ার হয়ত ইংরেজি পরীক্ষায় নিউটনকে টপকে যেতে পারতেন। কিন্তু নিউটন যে শেক্সপিয়ারকে গণিত পরীক্ষায় ভালভাবেই আটকে দিতেন, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

টাইম ম্যাগাজিন আইনস্টাইনকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে নির্বাচিত করে। এই ম্যাগাজিন গুটেনবার্গ, প্রথম রাণী এলিজাবেথ, জেফারসন, এডিসন প্রমুখকে স্ব-স্ব শতাব্দীতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে। মজার ব্যাপার হল, শেক্সপিয়ার এই তালিকায় ছিলেন না, কারণ টাইম – ম্যাগাজিন স্যার আইজ্যাক নিউটনকে সপ্তদশ শতকের সেরা ব্যক্তি হিসেবে নির্বাচিত করে!

বিজ্ঞানের জগতে নিউটন প্রায়শঃ আইনস্টাইনের থেকে একটু বেশি খাতির-যত্ন পেয়ে থাকেন। এর কারণ, মহাকর্ষ ও আলােকবিদ্যায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের পাশাপাশি গণিত ডিফারেন্সিয়াল এবং ইন্টিগ্র্যাল ক্যালকুলাস আবিষ্কারেও তার অবদান ছিল অসামান্য। নিউটন ভাগ্যবান ছিলেনও বটে। তার জন্ম হয়েছিল এমন সময়ে, এমন এক পরিবেশে যা তাকে এসব বিষয় আবিষ্কারে প্রেরণা যুগিয়েছিল। সে সময় সবার আলােচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই সমস্যাগুলাে। তৎকালীন সময় নিউটনের মেন্টর-আইজ্যাক ব্যারাে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যারেলের আয়তন পরিমাপের জন্য কাজ করছিলেন, যেখানে ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাসের প্রয়ােজন ছিল। স্পষ্টতই, ডিফারেন্সিয়াল ও ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস আবিষ্কারের জন্য এর থেকে আর উপযুক্ত সময় ছিল না। দার্শনিক ও গণিতবিদ গটফ্রিড উইলহেলম লিবনিজও প্রায় একই সময়ে ইউরােপে ডিফারেন্সিয়াল ও ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাস স্বাধীনভাবে আবিষ্কার। করেছিলেন। বিশ্ব-মানচিত্রের তাকালে দেখা যাবে, তারা মাত্র কয়েকশ মাইল দূরে বসবাস করতেন। এটাকে কেবল একটা কাকতালীয় ব্যাপার বললে ভুল হবে। তখন সারা ইউরােপ জুড়েই এসকল ধারণা নিয়ে ব্যাপক মাতামাতি চলতাে। সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে বেশ কিছু বড় বড় আবিষ্কার পরিলক্ষিত হয়। টাইকো ব্রাহের গ্রহের অবস্থান সম্পর্কিত ৬০০ পৃষ্টাব্যাপী পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ ও গাণিতিক বিশ্লেষণ করে কেপলার গ্রহের গতি সম্পর্কিত ৩ টি সরল সূত্র প্রদান করেন। কেপলারের তৃতীয় সূত্র ব্যবহার করে পরবর্তীতে নিউটন মহাকর্ষ বলের – ধর্ম প্রতিপাদন করেন। একইভাবে, বিংশ শতাব্দীতে হাইড্রোজেনের বামার সিরিজের রেখাগুলাের তরঙ্গদৈর্ঘ্য সম্পর্কিত পরীক্ষালব্ধ উপাত্তগুলাে হাইড্রোজেন পরমাণুর শক্তিস্তর বিষয়ক একটি সূত্রের আভাস দেয়। এটিই নিলস বাের আর এরভিইন শ্রোডিংগারকে পরমাণুর কোয়ান্টাম ধারণা পেতে সাহায্য করে।

আইনস্টাইন এবং নিউটনের তুলনামূলক আলােচনাটি আরেকটু দীর্ঘ করা যাক। বিখ্যাত জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী টাইসনের মতে, নিউটনই হলেন সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানী। আমি তার সাথে লাগতে যাচ্ছি না। নিউটনকে তার প্রাপ্য স্বীকৃতি দিতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আইনস্টাইন এমন একজন বিজ্ঞানী, যার এই উপাধি লাভের সব রকম যােগ্যতা আছে- আর এ কথাটা প্রমাণ করার জন্য কিছু যুক্তি তুলে না ধরলেই নয়। নিউটনের সর্বাধিক বিখ্যাত সমীকরণ কোনটি? F = ma আইনস্টাইনের সর্বাধিক বিখ্যাত সমীকরণ কোনটি? E = mc2 এই দুয়ের মধ্যে কোনটি বেশি বিখ্যাত? নিউটনের সমীকরণ বলে, হালকা বস্তুর চেয়ে ভারী বস্তুকে ত্বরণ দেওয়া তুলনামূলক কঠিন। দেখতে অত্যন্ত সরল হলে কী হবে! এটিই গতিবিদ্যার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র! এ কারণেই একটা মাউথ-অর্গান এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেয়ার চাইতে একটি পিয়ানােকে সরানাে তুলনামূলক কঠিন। এদিকে, আইনস্টাইনের মকরণ বলে, সামান্য ভরের একটা বস্তু থেকে বিপুল পরিমাণ শক্তি পাওয়া সম্ভব। পারমাণবিক বােমার পেছনের গােপন রহস্য এটাই। সূর্য কীভাবে কিরণ দেয়, এই সমীকরণ এ মরে তা বলে দেয়। কোন সমীকরণটি আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে?

নিউটনের আরেকটা বিখ্যাত সমীকরণ আছে। দূরত্বে অবস্থিত m ও M ভরের দুটি কণার মধ্যকার বল, F = GMm/(R^2) । খুব গুরুত্বপুর্ণ সমীকরণ। আইনস্টাইনেরও আরেকটা সমীকরণ, E = hv; যেখানে তিনি দেখতে পান, আলাে প্রকৃতপক্ষে ফোটন নামক শক্তিকণা রূপে আবির্ভূত হয়, যার শক্তির পরিমাপ (E) এর কম্পাঙ্ক (v) আর প্লাঙ্কের ধ্রুবক (h) এর গুণফলেরর সমান। নিউটনের ধারণা ছিল, আলাে কণার সমন্বয়ে তৈরি। সন্দেহ নেই, আইনস্টাইনই এই ধারণার সত্যতা প্রমাণ করেন। আলাের কণা ও তরঙ্গ উভয় ধর্মই বিদ্যমান যা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মৌলিক ধারণাগুলাের একটি।

দুজনই অনেক কিছু আবিষ্কার করেছেন। প্রতিফলক টেলিস্কোপের আবিষ্কর্তা হলেন নিউটন । বর্তমান যুগের সকল টেলিস্কোপ এ ধরনের। উদাহরণ হিসেবে হাবল টেলিস্কোপ, কেক টেলিস্কোপ ইত্যাদির কথা বলা যেতে পারে। আইনস্টাইন লেজারের মূলনীতি আবিষ্কার। করেন। তুমি কোনাে CD বা DVD চালাতে যাও, এর অর্থ, তুমি আইনস্টাইনের আবিষ্কারকে ব্যবহার করছাে! এদের দু’জনই সরকারি চাকুরে ছিলেন। নিউটন রয়্যাল মিন্টের ‘মাস্টার ছিলেন। মুদ্রার চারদিকে যে খাঁজ কাটা দাগগুলাে দেখা যায় তার রূপকার তিনি, যা আমরা এখনও ব্যবহার করি। একে মিলিং বলে। এর ফলে চোর রৌপ্যমুদ্রার ধারের রূপার অংশটুকু তুলে ফেলতে পারে না। যদি কেউ এই মিলিং তুলে ফেলে, তবে সহজেই তা শনাক্ত করা যায়। যখনই তুমি একটা রৌপ্য মুদ্রা হাতে নেবে, তখনই তুমি নিউটনের কীর্তির মুখােমুখি হবে! বিশ্ব রাজনীতিতে আইনস্টাইনের পদক্ষেপের কথা কমবেশি সবারই জানা। তিনি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের কাছে একটি ঐতিহাসিক চিঠি লেখেন। ম্যানহাটন প্রজেক্ট এবং পারমাণবিক বােমার সূত্রপাত এখান থেকেই। এই পারমাণবিক বােমা দিয়েই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। সে সময় আইনস্টাইন যা করেছিলেন, তা এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, তার প্রভাব আমরা এখনও দেখতে পাই।

আইনস্টাইন খুব মজার চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। সাধারণ মানুষ তাকে নিয়ে নানা গালগল্প বলে বেড়াত। তেমনই একটা গল্পঃ আইনস্টাইন প্রিন্সটনে এক লােকের সাথে কথা বলছিলেন। হঠাৎ লােকটি তার নিজের পকেটে হাত দিয়ে একটা ছােট নােটবুক বের করে তাতে কিছু হিজিবিজি লিখে ফেলল। আইনস্টাইন জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কী?” লােকটি বলল, “ও, এটা আমার নােটবই। আমি এটা সব সময় আমার সাথে রাখি, যেন আমার মাথায় কোনাে চমৎকার আইডিয়া আসা মাত্রই আমি তা লিখে রাখতে পারি। কখনও যেন ভুলে না যাই।” আইনস্টাইন বললেন, “আমার কখনই এরকম কোনাে নােটবইয়ের দরকার হয় না। কারণ, আমার মাথায় কেবল তিনটা চমৎকার আইডিয়াই ঘুরপাক খায়?” কী ছিল। সেই ‘চমৎকার’ তিনটি আইডিয়া? আর কীভাবেই বা তিনি এগুলাে পেলেন?

প্রথমটি ছিল বিশেষ আপেক্ষিকতা, যা থেকে E = mc2 পাওয়া যায়। দ্বিতীয়টি হল, আলােকতড়িৎক্রিয়া, E = (Work Function)+hu সমীকরণ, যার জন্য আইনস্টাইন ১৯২১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে । নােবেল পুরষ্কার লাভ করেন। আর তৃতীয়টি ছিল, সাধারণ আপেক্ষিকতা, যেখানে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যার জন্য তিনি স্থান-কালের বক্রতা শীর্ষক ধারণার অবতারণা করেন। সমীকরণগুলাে ঘাটাঘাটি করে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, সূর্যের নিকটে স্থান-কালের বক্রতার মধ্য দিয়ে গমনের সময় আলাে বেঁকে যাবে। শুধু তাই নয়, তিনি এই বক্রতার পরিমাণও বলে দিলেন। তার ভাষ্যমতে, পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় যখন আকাশ অন্ধকার হয়ে যায় আর তারাগুলাে আকাশে ফুটে ওঠে, তখন সূর্যের আশেপাশের তারাগুলাে সূর্যের অনুপস্থিতে যেখানে থাকার কথা ছিল সেখান থেকে কিছুটা দূরে দেখা যায়। আইনস্টাইন এই বিচ্যুতির পরিমাপের যে পূর্বাভাস দেন (সূর্যের কিনারার কাছে যে তারাগুলাে আছে সেগুলাের ১.৭৫ সেকেন্ড কোণে। বিচ্যুত হবে) তা ছিল আলাের গতিতে চলমান কণার জন্য নিউটনের তত্ত্ব থেকে থেকে প্রাপ্ত পূর্বাভাসের দ্বিগুণ। স্যার আর্থার এডিংটন এই বিচ্যুতি পরিমাপের জন্য বটেন পাড়ি জমান। আইনস্টাইনের পূর্বাভাস নিখুঁত বলে প্রমাণিত হয়। বলা বাহুল্য, নিউটনের পূর্বাভাস ভুল প্রমাণিত হয়। বর্তমানে আমরা আইনস্টাইনের তত্ত্বকেই বিশ্বাস করি, নিউটনের তত্ত্ব নয়।

বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, একটা টিভি অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় খেলাগুলাের সেরা মুহূর্তগুলাে। দেখার সুযােগ হয়। দেখা গেলাে, ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে জেসি ওয়িন্স ১০০ মিটার জিতে নিলেন, মােহাম্মাদ আলী জায়ারেতে জর্জ ফোরম্যানকে পরাজিত করে হেভিওয়েট বক্সিং চ্যাম্পিয়ন ট্রফি জিতে নিলেন- আরও কত কী! এরূপ, বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের সব থেকে সেরা মুহূর্তটা কী হতে পারে? | নিউটন আর আইনস্টাইন একটা বাস্কেটবল কোর্টে কল্পনা করা যাক। নিউটনের হাতে বল । তিনি ড্রিবলিং করে করে বল হাতে এগিয়ে যাচ্ছেন। এটা যেমন তেমন বল নয়, এটা তার মহাকর্ষ তত্ত্ব যা তার সব থেকে গর্বের আবিষ্কার! আইনস্টাইন আসলেন, বলটা বাগিয়ে নিলেন নিজের কাছে, শুট করলেন উপরে, সুয়ি…শ! বল বাস্কেটের ভিতরে! এটাই বিংশ। শতাব্দীতে বিজ্ঞান নামক খেলার সেরা মুহূর্ত।

সুত্রঃ J. Richard Gott এর একটি নিবন্ধ অবলম্বনে

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close