জীব রসায়নজীববিজ্ঞান

প্রাণিকোষে অক্সিজেনের রহস্যোন্মোচনে নোবেলজয়ী তিনজন বিজ্ঞানী

এক নজরে …

এবছর চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শারীরবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন তিনজন বিজ্ঞানী। তাঁরা হলেন উইলিয়াম কেইলিন (William Kaelin, Jr), স্যার পিটার র‍্যাটক্লিফ (Sir Peter Ratcliffe) এবং গ্রেগ সেমেনযা (Gregg Semenza)। জীবনের টিকে থাকার জন্য অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা আধুনিক জীববিজ্ঞানের শুরু থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গৃহীত হয়েছিল। তবে এর পেছনের আণবিক কার্যপদ্ধতি তখনও অজানা ছিল। নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানীদের গবেষণা এবার আমাদের সেই সম্পর্কেই গবেষণা করেছেন। তাঁরা দেখিয়েছেন যে কোষে অক্সিজেনের সরবরাহতার তারতম্যের সাথে এর অভিযোজনিক পদ্ধতিতেও বৈচিত্র্য দেখা যায়।

জীবজগতে প্রাণিকোষই শুধুমাত্র অক্সিজেনের ওপর নির্ভরশীল। তাদের বেঁচে থাকার জন্য অক্সিজেন মৌলিক একটি উপাদান। প্রাণিকোষ অক্সিজেন ব্যবহার করে দহন প্রক্রিয়ায় খাদ্যকে কোষের শারীরবৃত্তীয় কাজের প্রয়োজনীয় ও ব্যবহার্য শক্তিতে রূপান্তরিত করে। অক্সিজেনের এই মৌলিক তাৎপর্য শতাব্দী ধরে জানা থাকলেও এর পেছনের আণবিক ক্রিয়াকলাপের ব্যাপারটি মানুষের অজানাই ছিল। এমনকি কোষে অক্সিজেন প্রাপ্যতার তারতম্যের ফলে কোষ কীভাবে তার সাথে অভিযোজিত হয়, তা-ও ছিল অজানা। বিজ্ঞানীরা, ত্রয়ী কোষে অক্সিজেনের এই তারতম্যের প্রতি সাড়াদানকারী জিন এবং এই জিঙ্কে নিয়ন্ত্রণকারী আণবিক কার্যপদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এই মৌলিক আবিষ্কার জীবনের প্রাথমিক অভিযোজন পদ্ধতিগুলোর একটি। মূলতঃ অক্সিজেনের উপস্থিতি এবং এর মাত্রার তারতম্য কীভাবে আমাদের কোষীয় বিপাক এবং শারীরবৃত্তীয় কার্যাদিকে প্রভাবিত করে – সেই মৌলিক ভিত্তিটিই এবারের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন।

nobel prize 2019 medicine এর ছবির ফলাফল

অক্সিজেনের উপস্থিতির মাত্রার তারতম্যের ভিত্তিতে প্রাণিকোষে জিনের অভিব্যক্তিতেও (gene expression) গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। এ পরিবর্তনের ফলে কোষের নানা প্রাথমিক ও মৌলিক কাজে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিচ্যুতি দেখা দেয়। এসব পরিবর্তনের মধ্যে একটি হচ্ছে কোষের বিপাকক্রিয়ার বিচ্যুতি। এছাড়াও টিস্যু পুনর্গঠন, নানা কোষীয় অঙ্গাণুর কাজে, এমনকি নানা অঙ্গের শারীরবৃত্তিক কার্যক্রম যেমন – হৃদকম্পনের হার (), গ্যাসীয় আদান-প্রদান নানা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন লক্ষণীয়। ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে গ্রেগ HIF নামের একটি প্রোটিন সনাক্ত করেন।HIF এর পূর্ণরূপ হচ্ছে – hypoxia inducible factor। এটি প্রোটিন যা ডিএনএ তে একটি নির্দিষ্ট স্থানে যুক্ত হয়ে ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। ১৯৯৫ সালের দিকে এই প্রোটিনটির পরিশুদ্ধ ও ক্লোন করার কাজটিও সম্পন্ন হয়।এই HIF প্রোটিন অক্সিজেন নির্ভর কোষের সংবেদন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি আরও দেখান যে, এই প্রোটিনটি দুইটি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। এ দু’টি উপাদান যথাক্রমে:

১। প্রধান এবং অক্সিজেন সংবেদী উপাদান – HIF-1a,

২। পূর্বে আবিষ্কৃত এবং কোষে প্রাথমিকভাবে ব্যক্ত (constitutively expressed) আরেকটি প্রোটিন ARNT (Aryl hydrocarbon receptor nuclear translocator), তবে এটি আবার অক্সিজেন নিয়ন্ত্রিত কার্যপদ্ধতির সাথে সম্পৃক্ত নয়।

১৯৯৫ সালে উইলিয়াম কেইলিন ভন হিপ্পেল-লিণ্ডাউ টিউমার দমনকারী জিন (von Hippel-Lindau tumor suppressor gene – VHL) নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত ছিলেন। এরপর উক্ত জিনটি সম্পূর্ণভাবে সংগ্রহ করে (isolate) তার পূর্ণদৈর্ঘ্য ক্লোন করেন। ক্লোন করার পর আরও গবেষণায় দেখা যায় এই জিনটি মিউটেশনবাহী VHL এর কোষ লাইনে টিউমারের বৃদ্ধি রহিত করতে সক্ষম। র‍্যাটক্লিফ ১৯৯৯ সালে ব্যাখ্যা করেন যে, VHL এবং  HIF-1a এর মধ্যে এক প্রকার সম্পর্ক বা মিথস্ক্রিয়া রয়েছে। VHL প্রোটিন HIF-1a ট্রান্সলেশন পরবর্তী ভাঙন এবং অক্সিজেন সংবেদী ভাঙন পরিচালনা করে থাকে, এ ব্যাপারটিও তিনি তার গবেষণায় ব্যাখ্যা করেন।

সবশেষে কেইলিন এবং র‍্যাটক্লিফ, উভয়ের দল দেখান যে  HIF-1a এর এই VHL দ্বারা পরিচালিত হওয়ার ব্যাপারটি HIF-1a তে এক প্রকার সমযোজী পরিবর্তনের উপর নির্ভর করে। এ সমযোজী পরিবর্তন হাইড্রোক্সিলেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়ে থাকে। হাইড্রক্সিলেশন হচ্ছে কোনো অণুর সাথে হাইড্রক্সিল কার্যকরী মূলকের সংযোজন। অপরদিকে, হাইড্রক্সিলেশন প্রক্রিয়াটি নিজেই অক্সিজেনের উপর নির্ভরশীল।

তিনজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর কাজের সমন্বয় করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, অক্সিজেনের মাত্রার তারতম্যের প্রতি জিন অভিব্যক্তির মাধ্যমে সাড়া প্রদানের ব্যাপারটি আসলে প্রাণিকোষে অক্সিজেনের প্রাপ্যতার তারতম্যের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। এর ফলে HIF ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টরের সাহায্যে অক্সিজেনের সংযুক্তির প্রতি তাৎক্ষণিক সাড়া প্রদানের বিষয়টি প্রতিভাত হয়। তাঁদের এই আবিষ্কার অ্যানিমিয়া, ক্যান্সার –এর মত নানা জটিল রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আরও কৌশলগত ও সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

মধ্যমণি অক্সিজেন

অক্সিজেন, যার সংকেত হচ্ছে O2 । পৃথিবীর জন্য এই রাসায়নিক উপাদানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যা জীবনের বিকাশে খুব তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অক্সিজেন দিয়ে গঠিত। জীবনের জন্য অপরিহার্য এ উপাদানটি কোষের বিপাকক্রিয়ায় অত্যন্ত গুররুত্বের সাথে অংশগ্রহণ করে। কোষের শক্তিঘর খ্যাত মাইটোকন্ড্রিয়া সংগৃহীত খাদ্যেক অক্সিজেনের সহায়তায় ভেঙে তা থেকে শক্তি উৎপন্ন করে। ১৯৩১ সালে শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এককভাবে নোবেলজয়ী অটো ওয়াবার্গ (Otto Heinrich Warburg) আবিষ্কার করেন যে, কোষে খাদ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের পদ্ধতিটি একটি এনজাইমেটিক প্রক্রিয়া।

বিবর্তনের ধারায় একটি ব্যাপার খুব সুন্দরভাবে গড়ে উঠেছে, সেটি হল প্রতিটি কোষে এবং টিস্যুতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পরিবহনের ব্যবস্থা। আমাদের ঘাড়ের দু’পাশে অবস্থিত বৃহৎ ক্যারোটিড মহাধমনী এমন কিছু বিশেষায়িত কোষ ধারণ করে যারা রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা অনুধাবন করতে সক্ষম। ১৯৩৮ সালে শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে আরেকজন এককভাবে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী কর্নেইলি হেইম্যান্স (Corneille Heymans) আবিষ্কার করেন কীভাবে ক্যারোটিড নালীর মাধ্যমে রক্তে অক্সিজেনের উপস্থিতি বা মাত্রার পরিমাণ অনুধাবন আমাদের শ্বসন হার নিয়ন্ত্রণ করে। শ্বসনের কেন্দ্র মূলত মস্তিষ্কে অবস্থিত। এক্ষেত্রে ক্যারোটিড নালী মস্তিষ্কের সাথে এক যোগাযোগের সম্পর্ক স্থাপন করে ব্যাপারটি নিয়ন্ত্রণ করে।

কাহিনীতে HIF –এর আবির্ভাব

সাধারণত কোষে দু’ধরণের অবস্থা দেখা যায়, একটি হল যখন অক্সিজেনের মাত্রা পর্যাপ্ত থাকে এবং অন্যটি বিপরতভাবে যখন কোষে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম থাকে। প্রথম অবস্থাটিকে বলা হয় নরমক্সিয়া (normoxia) এবং দ্বিতীয়টি হাইপোক্সিয়া (hypoxia) নামে পরিচিত।

হাইপক্সিয়ায় ক্যারোটিড তন্ত্র নিয়ন্ত্রিত দ্রুত কোষীয় অভিযোজন ব্যবস্থার পাশাপাশি আরও কিছু মৌলক শারীরবৃত্তীয় অভিযোজনিক ব্যবস্থা রয়েছে। হাইপক্সিয়ার প্রতি গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় সাড়া হচ্ছে ইরাইথ্রোপোয়েটিন (erythropoietin – EPO) হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি। এর ফলে দেহে লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদন ত্বরাণ্বিত হয়। জেনে রাখা ভাল, ইরাইথ্রোপোয়েটিন হরমোন শুধুমাত্র কিডনিতেই উৎপন্ন হয়। এই হরমোনটি দেহে লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদনে উদ্দীপনা প্রদান করে। লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে তাই এরাইথ্রোপোয়েসিস (erythropoiesis) বলা হয়।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইরাইথ্রোপোয়েসিস প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণে হরমোনের ভূমিকার কথা জানা থাকলেও এতে অক্সিজেনের নিয়ন্ত্রক হিসেবে ভূমিকার কথা অজানাই ছিল। গ্রেগ সেমেনযা এই EPO জিন এবং অক্সিজেনের মাত্রার তারতম্যে এটি কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় তা নিয়ে গবেষণা করেন। জিনগত পরিবর্তিত ইঁদুরের সাহায্যে দেখানো হয় যে, EPO জিনের সংলগ্ন ডিএনএ অংশই হাইপক্সিয়ায় সাড়া দানের জন্য ব্যবহৃত হয়। র‍্যাটক্লিফ-ও EPO জিনের অক্সিজেন নির্ভর পরিচালনার ব্যাপারটি নিয়ে গবেষণা করেন। উভয় দলই দেখতে পান যে, এই অক্সিজেন নির্ভর কার্যকলাপ শুধু কিডনি নয় যেখানে ইরাইথ্রোপোয়েটিন হরমোন সাধারণত উৎপন্ন হয়ে থাকে, বরং সত্যিকার অর্থে সকল টিস্যুতেই বিদ্যমান।

উপরে প্রাপ্ত ফলাফলগুলোর মাধ্যমে এটি পরিষ্কার হয় যে উক্ত কার্যপদ্ধতি বিভিন্ন ধরনের কোষে একটি সাধারণ এবং কার্যকরী হিসেবে বিদ্যমান।  সেমেনযা এই সাড়ার পেছনে দায়ী কোষীয় উপাদানটি সনাক্ত করতে চাইলেন। যকৃৎ কোষের কালচারে তিনি একটি প্রোটিন কমপ্লেক্স আবিষ্কার করলেন যেটি EPO জিন সংলগ্ন সেই সুনির্দিষ্ট ডিএনএ অংশে গিয়ে যুক্ত হয়, যা ঘটে একটি অক্সিজেন নির্ভর প্দ্ধতিতে। তিনি এর নাম দেন হাইপক্সিয়া-প্রাভাবিত ফ্যাক্টর বা hypoxia-inducible factor বা সংক্ষেপে HIF।

কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে HIF কমপ্লেক্স –এর পরিশোধন (purification) শুরু হয়।পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালের দিকে সেমেনযা  HIF সংশ্লেষণকারী জিন সনাক্তকরণসহ আরও নানা গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল প্রকাশ করতে সক্ষম হন।

HIF দু’টি ভিন্ন ভিন্ন ডিএনএ বন্ধনকারী প্রোটিন তথা ট্রান্সক্রিপশন ফ্যাক্টরেরে সমন্বয়ে গঠিত, যথা-

১। HIF-1a

২। ARNT (Aryl hydrocarbon receptor nuclear translocator)

এখন বিজ্ঞানীরা ধাঁধার সমাধানে আর কোন কোন উপাদান এতে জড়িত এবং কীভাবে এরা কাজ করে তা নিয়ে সামনে এগোতে পারবেন।

VHL: এক অনাকাঙ্ক্ষিত সঙ্গী

নরমক্সিয়া বা স্বাভাবিক অক্সিজেনের মাত্রা যখন কোষে বিরাজ করে, তখন কোষে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের উপস্থিতি থাকে। যখন অক্সিজেনের মাত্রা বেড়ে যায়, তখন কোষে খুব নগ্ণ্য পরিমাণ HIF-1a বিদ্যমান থাকে। কিন্তু যখন কোষে হাইপক্সিয়া অবস্থার সৃষ্টি হয় অর্থাৎ কোষে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়, তখন HIF-1a এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এতে করে এটি ডিএনএ পর্যাপ্তভাবে যুক্ত হতে পারে তথা এরা EPO জিনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সাথে সাথে HIF সংলগ্ন ডিএনএ অংশের অন্যান্য জিনকেও।

HIF প্রোটিন পর্যাপ্ত অক্সিজেনের উপস্থিতিতে খুব দ্রুত ভেঙে যায়। কয়েকটি গবেষকদল দেখান যে HIF-1a কোষের হাইপক্সিয়া অবস্থায় এরকম ভাঙনের সম্মুখীন হয় না। স্বাভাবিক অক্সিজেন মাত্রায় কোষে প্রোটিয়েজোম (proteasome) নামক এক ধরনের ব্যবস্থা HIF-1a এর ভাঙনে সাহায্য করে। ২০০৪ সালে রসায়নে নোবেলজয়ী তিন বিজ্ঞানী আরোন কিয়েশানোভার (Aaron Ciechanover), আভ্রাম হার্শকো (Avram Hershko) এবং ইরওয়িন রোজ (Irwin Rose) এই প্রোটিয়েজোম নামক কোষীয় অঙ্গাণ্য আবিষ্কার করেন। এমতাবস্থায়, ইউবিকুইটিন (ubiquitin) নামক একটি ছোট প্রোটিন HIF-1a –এর সাথে গিয়ে সংযুক্ত হয়। এক্ষেত্রে ইউবিকুইটিন HIF-1a –তে একটি ট্যাগ হিসেবে কাজ করে যা এর প্রোটিয়েজোম দ্বারা ভাঙনকে সুনিশ্চিত করে।

ইউবিকুইটিন কীভাবে অক্সিজেন নির্ভর একটি পদ্ধতিতে  HIF-1a –এর সাথে গিয়ে সংযুক্ত হয় তা তখনও একটি প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গিয়েছিল। উত্তরটি এসেছে সম্পূর্ণ অন্য একদিক থেকে।

যে সময় সেমেনযা এবং র‍্যাটক্লিফ EPO জিনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অন্বেষণ করছিলেন, ঠিক একই সময়ে ক্যান্সার গবেষক কেইলিন von Hipple-Lindau (VHL) নামক একটি বংশগত রোগ নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত ছিলেন। যেসব পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বংশগতভাবে VHL জিনের মিউটেশনের অস্তিত্ব রয়েছে, তাদের মধ্যে মারাত্মকভাবে নানা ক্যান্সার সংঘটনের ঝুঁকি রয়েছে। কেইলিন দেখান যে, VHL জিন এমন একটি প্রোটিন সংশ্লেষণ করে যা ক্যান্সারেরে সূত্রপাত রোধ করে। তিনি আরও দেখান যে, ক্যান্সার কোষে  VHL জিনের অভিব্যক্তি বা প্রকাশ বন্ধ থাকে এবং তা অস্বাভাবিকভাবে হাইপক্সিয়া- নিয়ন্ত্রিত জিনের প্রকাশ ঘটিয়ে থাকে। কিন্তু যখনই VHL জিনকে ক্যান্সার কোষে পুনস্থাপিত করা হয়, তখনই কোষগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। ফলে হাইপক্সিয়ায় VHL জিন কোনো না কোনোভাবে জড়িত , এ ব্যাপারটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করছিল।

আরও কয়েকটি গবেষণা থেকে আরও কয়েকটি সূত্র এসেছিল, যারা দেখিয়েছেন যে – VHL জিন থেকে সংশ্লেষিত VHL প্রোটিন একটি কমপ্লেক্সের অংশ যা HIF-1a প্রোটিনকে ইউবিকুইটিন দিয়ে ট্যাগ করে। যার ফলে HIF-1a –এর প্রোটিয়েজোম ভাঙন সম্পন্ন হতে পারে।

র‍্যাটক্লিফ এবং তার দল পরে আরেকটি মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেন। তারা দেখান যে, VHL প্রোটিন বাস্তবিকই HIF-1a –এর সাথে এক মিথস্ক্রিয়ায় জড়িত হয়, যা স্বাভাবিক অক্সিজেনের মাত্রায় HIF-1a -এর ভাঙনের জিন্য জরুরি। তাঁদের এই আবিষ্কার মোটাদাগে VHL কে HIF-1a -এর সাথে সম্পর্কযুক্ত করে।

ভারসাম্য নড়িয়ে দিল অক্সিজেন

টুকরোগুলো একে একে একত্রিত হল।কিন্তু অক্সিজেনের মাত্রা কীভাবে VHL এবং HIF-1a  -এর মধ্যকার অন্তঃক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই জ্ঞান তখনও অজানাই ছিল।

HIF-1a –এর একটি নির্দিষ্ট অংশের জন্য বিজ্ঞানীরা খোঁজ শুরু করলেন, যেটা কিনা পূর্বোল্লেখিত VHL নির্ভর ভাঙনের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কেইলিন এবং র‍্যাটক্লিফ উভয়েই ধারণা করেন যে অক্সিজেন-সংবেদী এই অংশটি HIF-1a  প্রোটিন ডোমেইনেরই কোনো না কোনো একটি সুনির্দিষ্ট স্থানে রয়েছে। ২০০১ সালে তাঁরা উভয়েই একই সময়ে দু’টি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, যেখানে তাঁরা দেখান HIF-1a প্রোটিনের একটি সুনির্দিষ্ট স্থানে হাইড্রোক্সিল (-OH) গ্রুপেরা যুক্ত হয়। প্রোটিনের এ ধরনের পরিবর্তনকে বলা হয় প্রোলাইল হাইড্রোক্সিলেশন ()। এই পরিবর্তন  VHL প্রোটিনকে  HIF-1a দ্রুত শনাক্ত করতে এবং এর সাথে যুক্ত হতে সাহায্য করে।

এভাবেই ধাপে ধাপে উত্তর বেরিয়ে আসতে থাকে যে কীভাবে স্বাভাবিক অক্সিজেন মাত্রা অক্সিজেন-সংবেদী এনজাইম (প্রোলাইল হাইড্রোক্সিলেজ) সমূহের সাহায্যে HIF-1a –এর দ্রুত ভাঙনকে পরিচালিত করে। পরবর্তীতে র‍্যাটক্লিফ ও অন্যান্যদের আরও গবেষণার মাধ্যমে প্রোলাইল হাইড্রোক্সিলেজ এনজাইমগুলো সনাক্ত করা হয়। পাশাপাশি এও ফুটে ওঠে যে, HIF-1a –এর জিন সক্রিয়কারী ভূমিকা মূলতঃ অক্সিজেন-নির্ভর হাইড্রোক্সিলেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পরিচালিত হয়।

শারীরবৃত্তীয় ও রোগতত্ত্বের গোড়ায় অক্সিজেন

নোবেল বিজয়ীদের এমন এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য তাঁদের ধন্যবাদ।এখন আমরা সকলেই জানি কীভাবে অক্সিজেনের মাত্রায় তারতম্য আমাদের মৌলিক শারীরবৃত্তীয় কাজকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে। অক্সিজেন-সংবেদন কোষে স্বল্প অক্সিজেন মাত্রায়ও তার বিপাকক্রিয়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য কোষের অভিযোজন ক্ষমতা সত্যিই চমকপ্রদ। এর ফলে কঠোর পরিশ্রমের পরেও যখন পেশি টিস্যুতে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়, তখনও কোষের কার্যাবলি সচল থাকে। আরেকটি উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এই সংবেদী প্রক্রিয়ার সাহায্যে নতুন রক্তনালীকা ও নতুন লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদনও খুব সুচারুরূপে পরিচালিত হয়। আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং আরও অনেক শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলীও এই অক্সিজেন-সংবেদী প্রক্রিয়ার দ্বারা সুনিয়ন্ত্রিত। এমনকি মাতৃগর্ভে ফিটাসের বা অনাগত শিশুর বৃদ্ধি ও উন্নতির সময় প্লাসেন্টার ক্রমোন্নতি এবং স্বাভাবিক সংবহনতন্ত্র গঠনের জন্য এর পদ্ধতি আবশ্যিক বলে গণ্য হয়েছে।

অক্সিজেন-সংবেদন প্রক্রিয়ায় বিচ্যুতি ঘটলে তা নানা রোগ ও শারীরবৃত্তীয় অবনতির পূর্বাভাস হিসেবে দেখা দেয়। উদাহরণস্বরূপ, দীর্ঘমেয়াদী কিডনি জটিলতার রোগীরা প্রায়ই প্রকট বা তীব্র অ্যানিমিয়ার শিকার হন। এর কারণ তাদের EPO জিনের অভিব্যক্তি ব্যহত হয়। EPO জিন থেকে EPO হরমোন শুধুমাত্র কিডনিতেই উৎপন্ন হয়, যা লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এই পুরো ব্যাপারটি উপরে আলোচনা করা হয়েছে।

উপরন্তু, ক্যান্সারে এই অক্সিজেন-নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি খুব ভালো ভূমিকা পালন করে। টিউমার কোষে এই কোষীয় যন্ত্র রক্তনালীকা তৈরিতে উদ্দীপিত করে এবং একইসাথে বিপাকক্রিয়ায়ো পরিবর্তন আনে। এতে করে ক্যান্সার কোষের দ্রুত ও কার্যকর বিভাজন সম্পন্ন হয়।

বর্তমানে, একযোগে নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গবেষণাগারে এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় এমন ওষুধের উন্নয়নের কাজ চলছে যা এই অক্সিজেন-স্নগবেদী প্রক্রিয়ার কার্যকলাপকে প্রয়োজন অনুযায়ী সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করার মাধ্যমে নানা জটিল শারীরবৃত্তীয় সমস্যা ও রোগের উপশম করবে।

তথ্যসূত্র: https://www.nobelprize.org/prizes/medicine/2019/summary/

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close