প্রযুক্তিমহাকাশ

এবার অক্সিজেন তৈরি হবে চাঁদের মাটি থেকে!

আয় আয় চাঁদ মামা। পৃথিবীর একমাত্র আদরের উপগ্রহ নিয়ে আমাদের রূপকথার যেমন শেষ নেই, তেমনি বিজ্ঞানীরা প্রতি মুহূর্তেই চালিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন ধরনের অনুসন্ধান যাতে করে কোনোভাবে হলেও প্রাণের অস্তিত্ব সহায়ক কোনো বস্তু পাওয়া যায়। সেরকমই এক সম্ভাবনাময় অনুসন্ধান চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে চাঁদের মাটি থেকে অক্সিজেন উৎপন্ন করা। কী অবাক লাগছে শুনতে?

আমরা জানি চাঁদের নিজস্ব বায়ুমন্ডল নেই। কিন্তু রয়েছে অক্সিজেনের আধার যা মিশে থাকে ধূলি বা মাটির সাথে, অক্সাইড রূপে। The Lunar Rigolith বা চাঁদের মাটির প্রথম স্তর যেখানে রয়েছে এই অক্সিজেন। অভূতপূর্ব ব্যাপারটি হচ্ছে এই প্রক্রিয়ায় কোনো বর্জ্য উৎপন্ন হয়না এবং অক্সিজেনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধাতুও পাওয়া যায় যা মিশে থাকে ভূমির সাথে। চাঁদের মাটির প্রথম স্তর বা rigolith যখন পৃথিবীতে আনা হয় বিভিন্ন মিশন থেকে, দেখা যায় সেটির ভরের প্রায় ৪০-৪৫% ই রয়েছে অক্সিজেন সমৃদ্ধ। University of Glasgow এর ক্যামিস্ট Beth Lomax বলেন, “অক্সিজেন খুবই মূল্যবান সম্পদ কিন্তু তা রয়েছে খনিজ আকারে, অক্সাইড রূপে। এখন যদি তাৎক্ষণিক দরকার হয়, সেখান থেকে সহজ উপায়ে ব্যবহার করা যাবেনা।”

চাঁদের মাটি বা Lunar Rigolith


আবার যে স্যাম্পল গুলো রয়েছে সেগুলো নিয়েও এক্সপেরিমেন্ট করা খুবই স্পর্শকাতর, কারণ চাঁদের মাটি প্রতিদিন আপনি আনতে পারবেন না৷ তবে বিশেষ উপায়ে একধরনের ‘fake lunar dust’ তৈরি করা যাবে যা অনুরূপ চাঁদের মাটির মতোই হবে দেখতে এবং গুণসম্পন্ন। এটাকে বলে Lunar rigolith Simulant যা Lomax এবং তাঁর গবেষণাদল ব্যবহার করেন।
অনেক আগেও এই Lunar Regolith বা চাঁদের মাটি থেকে অক্সিজেন উৎপন্ন করার প্রক্রিয়া বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেছেন। যথা লোহার অক্সাইডের বিজারনের মাধ্যমে হাইড্রোজেন গ্যাস পরিচালনা করে পানি উৎপন্ন করা এবং সেই পানি থেকে তড়িৎবিশ্লেষন প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন পাওয়া। কিন্তু সময় বাড়ার সাথে দেখা যায় পরীক্ষা গুলোতে রয়েছে বিভিন্ন জটিলতা। এর মধ্যে সব থেকে বড় বাঁধা হচ্ছে তাপমাত্রা। Rigolith এত উচ্চ তাপমাত্রায় গলে যে সেটা পরীক্ষাগারে তৈরি করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু Lomax এবং তাঁর গবেষকদল এই বিজারন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সরাসরি চলে যান তড়িৎবিশ্লেষণ পদ্ধতিতে। গুড়ো/ পাউডার হওয়া Rigolith কে সরাসরি তড়িৎবিশ্লেষন করেন তাঁরা। যে মেথডের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয় তাঁর নাম Molten salt Electrolysis। প্রথমবারের মতো এই পদ্ধতির মাধ্যমে Rigolith থেকে পাউডার- পাউডার বিশ্লেষণের মাধ্যমে অক্সিজেন স্থানান্তর করা হয়। আবার যদি বিজারন প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হতো সেজন্য দরকার হতো প্রবল তাপমাত্রা( ১৬০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড)। প্রথমে Rigolith কে রাখা হয় একটা বিশেষ ধরনের বাক্সে। তারপর যোগ করা হয় তড়িৎ বিশ্লেষ্য পদার্থ বা সোডিয়াম ক্লোরাইড। সেটাকে ৯৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত উত্তপ্ত করা হয়। এই তাপমাত্রায় পাউডার হওয়া rigolith গলে না।

অক্সিজে৷ স্থানান্তরের আগে এবং পরে Lunar Rigolith


তারপর বিশেষ উপায়ে তড়িৎ প্রবাহিত করে অক্সিজেন আলাদা করা হয়। যে লবণ অবশিষ্ট থাকে সেগুলো এনোডে জমা হবে। মোট প্রায় ৫০ ঘন্টা লাগে এই পরীক্ষাটি সম্পন্ন করতে যেখানে ৯৬% অক্সিজেনই স্থানান্তর করা সম্ভব হয়। তবে ১৫ ঘন্টার মাঝেই ৭৫% অক্সিজেন সংগ্রহ হয়ে যায়। আবার যে ধাতু গুলো পাওয়া যায় বিশ্লেষণের পর সেগুলোও খুব দামী এবং নানাবিধ কাজে লাগানো যায়।


গবেষকরা তাঁদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে এটিই প্রথম পাউডার টু পাউডার Extraction যেখানে সফলভাবে অক্সিজেনের পাশাপাশি ধাতব বস্তুও আলাদা করতে সক্ষম হওয়া গেছে। ধাতব উপজাতে এখন পর্যন্ত তিনটি উপাদান পাওয়া গিয়েছে। লৌহ- এলুমিনিয়াম, লৌহ- সিলিকন আর ক্যালসিয়াম- সিলিকন- এলুমিনিয়াম যৌগ। said ESA lunar এর strategy officer James Carpenter বলেন, ” এই আবিষ্কার মানবজাতির ইতিহাসে খুবই মুখ্য ভূমিকা রাখবে যদি ভবিষ্যতে কখনো চাঁদে মানব কলোনি স্থাপন করা হয়। এমন কি প্রক্রিয়াটি সেই কলোনাইজেশন এর ধাপ অনেক দূরে এগিয়ে নিয়ে গেছে।”
আবার Mechanisms and Materials Division at the ESA এর প্রধান Tommaso Gidhini বলেন, ” ESA এবং NASA বর্তমানে লক্ষ্য স্থির করে রেখেছে এখন চাঁদে যাওয়া শুধু ভ্রমণ নয়, হবে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে নেয়ার। এই আবিষ্কার গুলো তাঁরই প্রমাণ। আমরা অনতিবিলম্বে নতুন নতুন ফ্যাসিলিটি প্ল্যান্ট বসানোর কাজ করছি।”

তথ্যসূত্র ঃ sciencealert

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close