ঔষধজীববিজ্ঞানদৈনন্দিন বিজ্ঞান

প্যারানোয়া: সন্দেহের যত রোগবালাই

প্যারানয়েড ব্যক্তিরা কেবল নিজেদের জন্যেই হুমকি নয়, এরা অন্যদেরো বিপদে ফেলে বসতে পারে ভুলভাল ধারণা ধরে বসে

মফিজ সাহেবের (কাল্পনিক) সবকিছুতেই সন্দেহ হয়। অফিস করতে গেলে পথে মনে হয় লোকজন তার দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। অফিসের গাড়িতে থাকলে মনে হয় সহকর্মীরা বুঝি মনে মনে তাকে নিয়ে কি যেন চিন্তা করছে। কাজে থাকা সময়েও মনে হয় তাকে নিয়ে বুঝি ফিসফাস, হাশি তামাশা চলে। চলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা!
বাসায় আসলে স্ত্রীর বেলায়ও মাঝেমাঝে মনে হয় বুঝি তাকে নীচ চোখে দেখে! বন্ধুবান্ধবদের সাথে এখন খুব একটা মেশেন না কারণ মনে হয় তারা বুঝি তাকে নিয়ে তামাশা করে।
অথচ আদতে ঘটনা কিন্তু এমন কিছুই না! যে যার মত নিজের জীবন নিয়েই আছে। প্রসঙ্গক্রমে উনার কথা আসলে হয়তো দুচার কথা বলে মানুষ। ঠাট্টার প্রসঙ্গ থাকলে স্বাভাবিকভাবেই হয়তো দুচার ঠাট্টা করে হাল্কা গোছের। কিন্তু মফিজ সাহেবের কাছে মনে হয় সবাই যে ষড়যন্ত্রের সুতোয় বাধা!

এই যে সন্দেহের এই উদ্ভট বাতিক, এর নামই প্যারানোয়া, নামটা ইদানিং ইন্টারনেটের কল্যাণে বেশ ছড়িয়েছে। তাই অনেকে জেনে থাকলে থাকতেও পারেন। আজকাল মানসিক রোগের নামে ব্যান্ডদলের নাম হয়, গ্রুপ আর পেজের নাম হয় তো কেউ আবার প্রোফাইলে নামের আগে সাইকো লাগিয়ে গর্বে আকাশ সমান উচুতে উঠে যায়! যার ফলে বেশকিছু মানসিক রোগবালাইয়ের নামধাম অনেকের চেনাজানা হয়েছে।
কিন্তু নাম চেনা আর রোগ জানা এক কথা না। কতটুকু জানি আমরা এইসব মানসিক রোগকে?
সেই জানা নিয়ে আজকের আমাদের আয়োজন প্যারানোয়া নামক মানসিক সমস্যা আর রোগ নিয়ে।

প্যারানোয়া শব্দটি গ্রীক παράνοια (Paranoia) এরই ব্যবহৃত নাম যার অর্থ হল পাগলামি। সচরাচর এ সমস্যায় মানুষের মাঝে সন্দেহ দেখা দেয়, অন্যেরা তাদের নিয়ে কোনো না কোনো বিষয়ে চক্রান্ত করছে এমন মনে হয়। অনেক ভ্রান্ত বিশ্বাস বা Delusion এর আবির্ভাব ঘটে। আবার নানারকমের ভয় আর নানারকমের Anxiety ও কাজ করে। তবে প্যারানোয়া আর OCD এবং ফোবিয়ার (Phobia) মাঝে তফাৎ রয়েছে। OCDতে আক্রান্ত ব্যক্তির সবকিছুর ব্যাপারে খুতখুতে ভাব থাকে, তবে অন্যদের ব্যাপারে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার দুশ্চিন্তা আসেনা। অপরদিকে ফোবিয়া বা আতঙ্ক থেকে এর পার্থক্য হল ফোবিয়াতে ভয় কাজ করলেও কারো উপর অপবাদ দেয়ার বা ঘোর সন্দেহ করার প্রবণতা থাকেনা, যে এক্ষেত্রে মূল বৈশিষ্ট্য। অপরদিকে এই একই কারণে এটি শুধুমাত্র দুশ্চিন্তা বা Anxiety থেকে আলাদা।
এই প্যারানোয়ার লক্ষণ যখন উপর্যুপরি আর নিবিড়ভাবে দেখা দেয় তখন অনেকগুলো Symptom এর বিবেচনা স্বাপেক্ষে তাকে Paranoid Personality Disorder বলে।
অবস্থাভেদে এটি একটি গুরুতর সমস্যা যার জন্যে উপযুক্ত আর দীর্ঘসময়ের চিকিৎসা আবশ্যক।

কেননা প্যারানয়েড ব্যক্তিরা কেবল নিজেদের জন্যেই হুমকি নয়, এরা অন্যদেরো বিপদে ফেলে বসতে পারে ভুলভাল ধারণা ধরে বসে।
পাশাপাশি মানুষের সাথে এদের সুসম্পর্কও নষ্ট হয়ে যেতে পারে একারণে।
উল্লেখ্য, স্রেফ প্যারানোয়া আর প্যারানোয়েড পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (PPD) এক জিনীস নয়। একটা (Paranoia) মানসিক সমস্যা বা আচরণগত সমস্যা (Behavioural Problem), আর আরেকটা (PPD) মানসিক ব্যাধি বা রোগ, যেখানে আচরণগত সমস্যার একাধিক লক্ষণসমহূহ প্রকট এবং প্রবল।

লক্ষণসমূহ

১. যাকে তাকে সন্দেহ করা Paranoia এবং

Paranoid Personality Disorder এর প্রধাণ লক্ষণ হচ্ছে সন্দেহ। এর নামেই এর নাম সন্দেহবাতিক রোগ। Paranoid ব্যক্তি অন্যদের যেকোনো আচরণে সন্দেহ করতে পারে। এবং এই সন্দেহের ভিত্তী হচ্ছে Attribution Bias বা যোগসাজশ খোঁজা। এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি বরাবরই অন্যের কাজের সাথে নিজের যোগসাজশ খোঁজে। মনে করে তাকে নিয়েই কিছু করা হচ্ছে বা কিছু করার প্ল্যান করা হচ্ছে।
দেখা গেল অফিসের দুই, তিনজন কলিগ খোশগল্প করছে, দুর থেকে প্যারানোয়া আক্রান্ত ব্যক্তিটি তাদের হাসতে দেখলো। চোখে চোখ পড়ে যাওয়ায় মনে করছে তাকে নিয়েই বুঝি কোনো তামাশা করা হচ্ছে।
অথচ বাস্তবে তেমন কিছুই নয়। এবং তাদের এই চিন্তাটা একাধিক ক্ষেত্রে ঘুরপাক খেতেই থাকে।

পথ দিয়ে আসার সময় মনে হয় মানুষজন বুঝি তার দিকেই “কেমন যেন” দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে!

২. ভ্রান্ত চিন্তা /ভ্রান্ত বিশ্বাস (Delusive thoughts)

প্যারানোয়েড ব্যক্তির মাথায় এমন বহু ভ্রান্ত চিন্তা আসতে পারে যা আদতে মোটেও সত্যি নয়। সবচে বাজে ব্যাপার হল এক্ষেত্রে প্যারানোয়েড ব্যক্তিরা কাউকে অপবাদও দিয়ে বসতে পারে।
ধরুণ প্যারানোয়েড কোনো মহিলার পাশের ফ্ল্যাটেই এক ফ্যামিলি থাকে। যাদের এক ছেলে আর এক মেয়ে। ছেলেটা খুব রোগাপাতলা। মাঝে গ্রীষ্মের ছুটিতে মাসখানেকের জন্যে ফুপুর বাসায় গেল বেড়াতে। অপরদিকে মেয়েটা অনার্স পড়ছে। পাশাপাশি টিউশনও করে।
এখন কথা হল ছেলেটাকে না দেখে আর মেয়েটাকে বাসার বাইরে থাকতে দেখে ঐ মহিলা ধরেই নিলো ছেলেটার যে রোগাপটকা স্বাস্থ্য, বুঝি বেশ মাদকাসক্ত, তাই বুঝি তাকে কোনো রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে পাঠিয়ে দেয়া হল চিকিৎসার জন্যে।
আর মেয়েটা তো সারাদিন পার করে বাসায় ফিরে,পড়ে ভার্সিটিতে , আবার নিজের খরচ নিজেই চালায়, না জানি কি আকাম কুকাম করে টাকা আনে!
শুধুযে মহিলা তা ভাবে তা না, সেটাকেই দিব্যি সত্য ভেবে অন্যদের বলেও বেড়ায়!

এধরণের চিন্তা পিলে চমকে যাবার মত মনে হলেও তাদের কাছে খুব স্বাভাবিক!

৩. ভয় আর দুশ্চিন্তা কাজ করা

ভয় আর দুশ্চিন্তা প্যারানোয়া আর PPDর আরেক লক্ষণ।
এরা প্রায়সময়েই কোনো না কোনো দুশ্চিন্তা আর ভয় নিয়ে থাকে। আর এই দুশ্চিন্তা থাকে অন্যদের দ্বারা হওয়া ক্ষতি নিয়ে।
যেমন এইযে আমি তার সাথে যাবো, হাজার হোক আমার বন্ধু, কিন্তু যদি ঝামেলায় ফেলে দেয়!”
“আচ্ছা, ঐ লোকটা কি আমার ক্ষতি করবে?”
“পাশের বাড়ির মহিলা না আমার ঘরে কোনো ক্ষয়ক্ষতি করে বসে! হায় হায়!” এমন সব অদ্ভুত অদ্ভুত দুশ্চিন্তা আর ভয় এদের মাঝে প্রতিনিয়তই ঘুরপাক খেয়ে বেড়ায়। দেখা গেল যাকে বলতে যাবে তাকে নিয়েও এরা সন্দেহ করছে!
সবমিলিয়ে অবস্থা দাঁড়াতে পারে খুবই বিব্রতকর। যা একটা মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বেশ ভালভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

প্যারানোয়ার কারণ

প্যারানোয়ার একেবারে পুরোদস্তুর পাকাপোক্ত কারণ এখনো জানা সম্ভব হয়নি। তবে ধারণা করা হয় পারিবারিক, বংশগত কারণ, পারিপার্শ্বিক কারণ এবং ছোটবেলায় পাওয়া প্রচন্ডরকমের মানসিক আঘাত, চাপ এগুলোর প্যারানোয়ার কারণ হতে পারে।

পারিবারিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে শিশুর বেড়ে ওঠাতে বাবা মায়ের আচরণ কেমন ছিল। স্বভাবতই মানুষ পরিবার থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে৷ এক্ষেত্রে শিশুকে ছোটবেলা থেকে যদি নেতিবাচক আর সন্দেহজনক চিন্তার মধ্যে রাখা হয়। শিশু যদি সন্দেহপ্রবণ পরিবারের মধ্যে বড় হয় তবে তাদের আচরণ বেড়ে ওঠার সাথে সাথে শিশুর উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

প্যারানোয়ার বেলায় বংশগত কারণ যত না দেখা দেয় তারচে বেশি দেখা দেয় PPD’র বেলায়।
Norwegian twin study নামের করা একটি মনোবৈজ্ঞানিক সমীক্ষণে দেখা গেল যে বংশে কারো স্কিজোফ্রেনিয়া থাকলে সেই ঝুঁকিটা জীনগত মাধ্যম দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মে ভাগ করে দেয়। আর যেহেতু জীন তথ্যের বাহক, সেহেতু একইধরণের ঝুঁকিপূর্ণ জিন ভাগের মাধ্যমে তা পরবর্তী প্রজন্মের কারো কাছে গিয়ে PPD’র ঝুঁকি আনতে পারে।

প্যারানোয়ার ক্ষেত্রে আরেকটা প্রচন্ডরকম প্রভাবশালী কারণ হচ্ছে শৈশবের পরিবেশ বা পারিপার্শ্বিকতা। শিশুরা স্বভাবজাতভাবে যে পরিবেশে বড় হয় সে পরিবেশের দ্বারা প্রভাবিত হয়। বা হবার সমূহ ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। প্যারানোয়ার বেলাতেই শিশুর বিকাশের সবচে গুরুত্বপূর্ণ সময় শৈশব আর কৈশরে পরিবেশের নেতিবাচক প্রভাব গূঢ়ভাবে দায়ী। শৈশব – কৈশরের পারিপার্শ্বিকতায় সন্দেহজনক সমালোচনা, অন্যদের ব্যাপারে বাছবিচার ছাড়া নেতিবাচক ধারণা, কারো চরিত্র বিশ্লেষণের ব্যাপারে ভুল ধারণা দেয়া, পুনঃপুন প্রতারিত হওয়া, বিশ্বস্ত মানুষদের কাছ থেকে ছলনা, প্রতারণার শিকার হওয়া, এসব পারিপার্শ্বিক প্রভাব পরবর্তীতে কারো আচরণে প্যারানোয়া জাগিয়ে তুলতে পারে। যার প্রভাব হতে পারে অনেক গভীর ও সুদুরপ্রসারী।

আরেকটা কারণ হল ছোটবেলায় বা কৈশরকালে পাওয়া প্রচন্ডরকমের মানসিক আঘাত বা সাইকিয়াট্রিক ট্রমা। এই ট্রমা বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকতে পারে। প্রতিনিয়িত বাজে আর প্রতারণামূলক ব্যবহার, কার কাছ থেকে খুব বাজেভাবে প্রতারিত হওয়া বা কারো দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া, এইরুপে যে তা প্রাণঘাতী হতে পারে বা প্রচন্ডরকমের ক্ষতি বয়ে আনতে পারে জীবনে বা এনেছে, বিশ্বস্ত কারো দ্বারা একাধিকবার ঝামেলায় পড়া বা প্রচন্ডরকম মানসিক আঘাত পাবার ফলে তা পরবর্তীতে আচরণে গভীর প্রভাব ফেলে। আর দরুণ প্যারানোয়েড আচরণ জন্ম নিতে পারে।

চিকিৎসা

প্যারানোয়া আর প্যারানোয়েড পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার মানসিক আর শারিরীক দুই উৎসেই প্রভাবিত সমস্যা ও রোগ। ফলে এর চিকিৎসার জন্যেও ঔষধ আর আচরণগত চিকিৎসা দুটোই প্রয়োজন পড়ে। বিশেষত প্যারানোয়ার বেলায় ঔষধ দিলেও আচরণগত চিকিৎসা বা বিহেভিয়ার থেরাপি খুবই প্রয়োজনীয়। কেননা তাদের বিশ্বাস করার মাত্রা এম্নিতেই খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। এমতাবস্থায় কাউন্সেলরকে খুবই সাবধানে সময় নিয়ে যত্নসহকারে আগে প্যারানোয়েড ব্যক্তির বিশ্বাস অর্জন করতে হয়। এ জায়গাটা পাকাপোক্ত হলে পরে খুব সাবধানে বাকি কাজ করতে হয়। যেহেতু এর বীজ খুব গভীরে থাকে তাই থেরাপিও সময় নিয়ে যত্নসহকারে করতে হয়।
অপরদিকে PPD যেহেতু একটি রোগ এবং এতে জেনেটিক ব্যাপারও রয়েছে, তাই এক্ষেত্রে বিহেভিয়ার থেরাপির পাশাপাশি অত্যন্ত সাবধানতার সাথে, অবস্থা বুঝে, ভালভাবে কেস স্টাডি অনুধাবন করে ঔষধ দিতে হয়। ঔষধগুলো সচরাচর Antidepressant, Antipsychotic, Anti-Anxiety জাতীয় হয়ে থাকে।
তবে মূলত আচরণগত সমস্যার হবার জন্যে দুইক্ষেত্রেই বিহেভিয়ার থেরাপি বা সাইকোথেরাপি অত্যাবশ্যক ব্যাপার।

তবে এতে আক্রান্তদের চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে বসে থাকাটা উচিত নয়। কারণ এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের ও অন্যদের, উভয়ের জন্যেই ক্ষতিকর কিছু ডেকে আনতে পারে।

তো, এই ছিল আমাদের আজকের আয়োজন প্যারানোয়া নিয়ে। এরপর আবারো আসবো হয়তো নতুন কোনো বিষয় নিয়ে। ততক্ষণ ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিজের খেয়াল রাখুন আর বিজ্ঞানবর্তিকার সাথেই থাকুন।

তথ্যসূত্রঃ
mentalhealthamerica healthline webmd

 

আপনার মতামত লিখুন :

Back to top button
Close