জীব রসায়নজীববিজ্ঞান

রহস্যময় Post-COVID Syndrome এবং শিশুদের দুঃস্বপ্ন!

বিগত ছয় কিংবা সাত মাস ধরে করোনাভাইরাস সম্পর্কিত নানা ধরনের তথ্য আর জ্ঞান আহরণ করতে করতে আমরা সবাই-ই খুব ক্লান্ত,ভীত এবং বিরক্ত। নিত্য নতুন বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ পন্থা সাথে সংক্রমণের পরবর্তী বিভিন্ন লক্ষণ ও প্রতিকার ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে প্রাপ্ত জ্ঞান যেন হয়ে উঠেছে এক নিত্য দিনের অভ্যাস। কিন্তু কিছু করার নেই, আমাদের সবসময় সর্বোচ্চটার জন্যই নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে। আজকের লিখাটি সেরকমই এক বিষয় নিয়ে যারা করোনাভাইরাস কে তুচ্ছ মনে করেন এবং অবাধে “আরে করোনা বইলা কিছু নাই, যার যা কফালে আছে” বলে ঘুরে বেড়ান তাদের জন্য।

করোনাভাইরাস ইনফেকশন থেকে সেরে ওঠার পরবর্তী সময় দেহের দরকার হয় বিশ্রামের যাতে পুনরায় সবকিছু স্বাভাবিক ও শক্তিশালী অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। কিন্তু কিছু শিশুদের ক্ষেত্রে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এরকম কিছু ঘটেনা। একটা নতুন রোগ যাকে বলা হয় Multisystem inflammatory syndrome in children(MIS-C, and also known as paediatric multisystem inflammatory syndrom PIMS) যা প্রায় শতাধিকেরও বেশি শিশুকে আক্রান্ত করেছে প্রথম আবিষ্কারের পর। এই অবস্থা কোনো না কোনো ভাবে কোভিড ১৯ এর সাথে সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এমনকি তাঁরা এটাও দেখেছেন যে খুবই সুপ্ত বা লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াও যে করোনাভাইরাস ইনফ্যাকশন হয় সেগুলোর ক্ষেত্রেও অবস্থাটি ধ্রুবক ভাবে থাকে। MIS-C কে কোনোভাবেই স্বল্প গুরুত্বে নেয়ার অবকাশ নেই কারণ এটি থেকে অনেক গুরুতর রোগের সৃষ্টি হতে পারে।

ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসের হেলথ সাইন্স সেন্টারের নিওন্যানোটোলজিস্ট এল্ভারো মোরিরা জানান শিশুদের ক্ষেত্রে MIS-C ডেভেলপ বা তৈরি হওয়ার জন্য গুরুতর কোভিড এর আক্রমণ প্রয়োজন নেই যেটা সচরাচর দেখা যায়। ছোটোদের ক্ষেত্রে এমনও হতে পারে যে কোনো উপসর্গ নেই এবং কেউ জানেওনা তাদের করোনাভাইরাস ইনফেকশন হয়েছে এবং এর কিছু সপ্তাহ পরে ওই রোগের লক্ষণ বা প্রদাহ দেহে দেখা যেতে পারে। এল্ভারো আরো জানান MIS-C এর উপর করা নতুন মেডিকেল রিসার্চ এবং ৪০ টি অনুসন্ধানমূলক পরীক্ষা ৬৬২ জন শিশুর উপর চালানো হয় যারা ইতোমধ্যেই আক্রান্ত হয়ে আছে। এতে দেখা যায় MIS-C দেহের বিভিন্ন অঙ্গ কিডনী, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, ত্বক, চোখ এবং আরো অন্যান্য জায়গায় মারাত্মক প্রবাহের সৃষ্টি করে। এই উপসর্গ গুলো আরো দুটি অবস্থা কাওয়াসাকি ডিজিজ এবং টক্সিক শক সিন্ড্রোম রেফার করলেও MIS-C এর প্রদাহ সব থেকে ভয়ংকর। এই রোগের ডেভেলপমেন্ট প্রসেস এতটাই জটিল যে মস্তিষ্ককে আক্রান্ত করলে এক অবস্থা আবার ফুসফুসে গেলে অন্যরকম উপসর্গ। অপরদিকে হৃদপিণ্ডকে চেপে ধরলে ভিন্নতর উপসর্গ। ক্লিনিশিয়ান দের জন্য যা অনুধাবন করা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল।

যেহেতু বেশ কিছুদিন পার হলো, এই রোগ সম্পর্কে অনেক কিছু জানলেও এখনও প্রায় সবকিছুই অজানা বিশেষজ্ঞদের কাছে। অন্তত এটা বুঝা গিয়েছে যে MIS-C কীরকম দেখতে অর্থাৎ কীভাবে মেকানিজম টা চালায় ইত্যাদি। কিন্তু এর প্রতিকার নিয়ে কিছুই বলা যাচ্ছেনা বর্তমানে। যে ৬৬২ জন শিশুর উপর পরীক্ষা চালানো হয়েছে তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭১ শতাংশই আইসিইউ তে ভর্তির মতো অবস্থায় ছিল এবং গরে ৮ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। প্রতিটি কেইসেই রোগীর মধ্যে দেখা গিয়েছে জ্বর, তলপেটে ব্যথা এবং ডায়ারিয়ার মত উপসর্গ সমূহ। তাছাড়াও অনেকের মধ্যে র‍্যাশে বা বমির সমস্যাও দেখা যায়। দুঃখজনক ভাবে ১১ জন শিশুই মারা যায়। অর্থাৎ মৃত্যুহারও যে খুব কম তা না, প্রায় দেড় শতাংশেরও বেশি। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো এই রোগে মৃত্যুর হার কোভিড ১৯ এ আক্রান্ত শিশু মৃত্যুর হার থেকেও ১ শতাংশ বেশি!

আবার যেসব ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে কিছু শিশু সুস্থ হয়ে উঠেছে তাদের হৃদপিন্ড পরীক্ষায় অদ্ভুত ফলাফল দেখা গিয়েছে। সবারই প্রায় ইকোকার্ডিওগ্রাম টেস্ট করানো হয় হৃদপিণ্ডের এবং দেখা যায় ৫৪ শতাংশ শিশু অর্থাৎ অর্ধেকের বেশিই অস্বাভাবিক হৃদপিণ্ডের অবস্থার লক্ষণ দেখাচ্ছে। এই অস্বাভাবিক অবস্থা গুলো হলো রক্তনালীর সংকোচন ঘটা, ইজেকশন ফ্র্যাকশন বা হৃদপিণ্ডের দেহে বিশুদ্ধ অক্সিজেন সরবরাহের ক্ষমতা কমে যাওয়া। এমনকি ১০ শতাংশের বেশি শিশুদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে মারাত্মক হৃদ সমস্যা জনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। এইসব শিশু রোগীদের আলাদা করে রেখে বিভিন্ন পরীক্ষা অ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে যাতে কোনোভাবে হলেও রোগটি উপশম করা যায় এবং তাদের ভবিষ্যত বিপর্যস্ত না হয়। ব্যাপারটি আসলেই খুব দুঃখজনক সেসব মা বাবার জন্য যাদের সন্তানরা সুস্থ ছিল কিন্তু মুহূর্তের মধ্য দিয়ে MIS-C এর মতো রোগ দেহে বাসা বেঁধে ফেলে। সব থেকে বড় ব্যপারটি হচ্ছে এখনও MIS-C এর ধরন প্রকৃতি ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য অনেকটাই অজানা সবার কাছে যা নিয়ে বিস্তর গবেষণা চালাচ্ছেন ডাক্তার ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

রোগটা নতুন বলে অবহেলা করার কোনো সুযোগই থাকছেনা। কোভিডকেও হাল্কাভাবে নিয়েছিল সবাই কিন্তু আজ ৬ মাস পরেও থামছে তাণ্ডব। এখন থেকেই MIS-C এর জন্য প্রস্তুত না হলে ভবিষ্যতে তা মারাত্মক আকার নিতে পারে কারণ ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে এটি কোভিড-১৯ থেকেও শক্তিশালী। তাই যত দ্রুত সম্ভব লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্রই শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। সাধারণত করোনাভাইরাস ইনফেকশন সেরে ওঠার তিন থেকে চার সপ্তাহ পরে MIS-C এর লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া শুরু হয় এবং খুবই দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে। কোনোভাবেই অবহেলা করার সুযোগ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে দেখি আমরা এক ভিন্ন চিত্র যেখানে মা তাঁর কোলের শিশুয়িকে নিয়েও এই অবস্থায় শপিং করতে যান কোনো রকম মাস্ক বা স্যানিটাইজেশন ছাড়াই। তাই সময় থাকতেই সতর্ক হই আমরা। যদি একটি শিশুর সাথেও এরকম ঘটে তবে তাঁর ভবিষ্যত হুমকির মুখে পড়ে যাবে।

Source news: Sciencealert.com

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close