ভিডিও গেমস

গেমিং: কতটুকু বিনোদন আর কতটুকু আসক্তি।

গেমিং, শব্দটা ইদানিংকালে খুব বেশিই পরিচিত লাভ করেছে। একটু ভিন্ন ধারার যুবসমাজে, যারা মদ, গাঁজা, সিগারেট আর হুক্কার ধোঁয়ায় বিভোর না থেকে অন্যভাবে সময় কাটায় তাদের অনেকের সাথে “গেমিং” আর “গেমার” এই শব্দ দুটো বিস্তৃতভাবে জুড়ে রয়েছে। গেমিংয়ের প্রভাব বহু আগে থেকেই ব্যাপক বিস্তৃত থাকলেও পরিপূর্ণ অভিজ্ঞতার গেমিং বা PC ও Console গেমিং গত এক থেকে দেড় দশক ধরে সারাবিশ্বে খুব বেশি পরিচিতি লাভ করেছে। এই গেমিংয়ের উপর ভিত্তী করে আয়োজন করা হচ্ছে নানান প্রতিযোগিতা, বিভিন্ন কোম্পানি বানাচ্ছে বিভিন্ন দাম ও মানের Consumer ক্যাটেগরির গ্রাফিক্স কার্ড, বিভিন্ন ইউটিউবার স্রেফ এই গেমিং এর উপর ভিত্তী করে ইউটিউব চ্যানেল খুলে কামিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা।

আবার সম্প্রতি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা গেমিং আসক্তিকে তাদের International Classification of Diseases (ICD) তে তালিকাভুক্ত করেছে একটি ডিসঅর্ডার হিসেবে।
সেই সাথে এই খবরে চিন্তিত হয়েছেন গেমিংপ্রিয় সন্তানদের নিয়ে হাহাকার এ ডুবে থাকা বাবা, মা, চাচা, খালা ইত্যাদিরা। আবার অনেক গেমার হয়েছেন রাগে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ।

তো সর্বোপরি কথা হল,

আসলে ঠিক কতটুকু প্রভাব বিস্তারকারী এই গেমিং? গেমিং মানেই কি তাহলে আসক্তি? “আলটিমেটলি ওয়ান টেরাবাইট র‍্যাম” (কীহ্!) এর পিসিতে গেম খেলে সত্যিই কি আপনার ছেলেমেয়ে, ভাইবোন, ভাগ্নেভাগ্নি, ভাতিজা ভাতিজী ইত্যাদি ইত্যাদি হয়ে উঠতে পারে বাংলা ভাইয়ের মত দুর্ধর্ষ জঙ্গী!
সেই প্রসঙ্গেই আজ কথা বলবো আমি শাহেদ রাইয়ান আপনাদের সাথে। তো চলুন সাথে একটা জয়স্টিক, থুক্কু কিছু পপকর্ন নিয়ে বসে পড়তে পারেন ছোটখাটো লেখাটি পড়ার জন্যে।

প্রথমেই বলে নিই WHO বা World Health Organization যে গেমিং কে ডিসঅর্ডার হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে তা কেবল আসক্তির বেলাতেই। অর্থাৎ গেমিং কে নয়, তারা গেমিংয়ের প্রতি আসক্তিকে ডিসঅর্ডার হিসেবে অভিযুক্ত ও তালিকাভুক্ত করেছে। এর আগে ২০১৩ সালে American Psychiatric Association কর্তৃক প্রকাশিত তাবৎ দুনিয়ার অস্বাভাবিক মনোবিজ্ঞানের নীতিনির্ধারক DSM বা Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders এর পঞ্চম সংস্করণ DSM V এ অনলাইন গেমিং কে দাপ্তরিকভাবে (Officially) মানসিক রোগের তালিকাভুক্ত করার আগে এর উপর পর্যাপ্ত পরিমাণে গবেষণা, গবেষণার পুনরাবৃত্তি এবং সাধারণীকরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এর দীর্ঘদিন পর, নানা যাচাই বাছাই এর পর WHO শেষমেশ ২০১৮ সালে গেমিং আসক্তিকে ডিসঅর্ডার হিসেবে তালিকাভুক্ত করেই দেয়। অনেক মনোবিজ্ঞানী এটাকে সাধুবাদ জানায় তাদের দীর্ঘদিনের মনোবাসনার বাস্তবায়নরুপে। আবার অনেকে WHO‘র এই সীদ্ধান্তকে ঘোড়া টপকে ঘাস খাওয়ার মতই মনে করেছে এই মর্মে যে এক্ষেত্রে তাদের আরো যাচাই বাছাই ও আরো গবেষণার প্রয়োজন ছিল। কারণ অনেক মানসিক সমস্যাই ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, স্থান, সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতা স্বাপেক্ষ। আর তাই তারা সাবধানতাস্বরুপ এও বলেছেন যে তাদের ভুলভাল নির্ধারণ অনেকের জন্যে বেশ ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে।
তবে WHO ঘোড়া টপকে ঘাস খাক, পানি খাক বা অন্যকিছু খাক, এখানে কিন্তু একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, তাদের উল্লেখিত গেমিং এর প্রতি “আসক্তি” আর গেমিং এক কথা নয়। WHO এর এই সিদ্ধান্তে হয়তোবা এখনো বেশ যাচাই বাছাই প্রয়োজন তবু মনে রাখা দরকার আসক্তি শব্দটা কি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
আসক্তি ভাল লাগা নয়, বা পছন্দ নয়। আসক্তি হল কোনো বিষয়, বস্তু বা কাজের প্রতি এমনভাবে ঝুঁকে পড়া যা আপনার দৈনন্দিন জীবনের অনেক কাজ, অনেক দায়িত্ব, বিশ্রাম, যত্ন, স্বাস্থ্যঝুঁকি, সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক ইত্যাদি থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। আপনি বিষয়বস্তুগুলোর প্রতি এমনভাবেই নির্ভরশীল হয়ে পড়েন যে তা আপনার মূল্যবান সময় ও মনোযোগ যা আপনার অন্যান্য জরুরী কাজে দেয়া প্রয়োজন সেগুলোও সেখানেই ব্যয় হতে শুরু করে। বরাবরই এমন অবস্থা কোনো স্বাভাবিক অবস্থার লক্ষণ নয়। হোক নাহয় সেটা ডিসঅর্ডার না, কিন্তু তা সত্বেও এই ঝুঁকে পড়াটা কিন্তু স্বাভাবিক কিছুও না। দেখা গেল এমন নির্ভরশীলতা আপনাকে নিজের পরিবারের অনেক দায় দায়িত্ব থেকে আপনাকে দূরে সরিয়ে রাখছে। পাশাপাশি এগুলোর কারণে আপনার ঘুম আর বিশ্রাম ঠিকমত হচ্ছেনা। ফলস্বরুপ আপনি আপনার কাজ বা পড়াশোনায়ও পর্যাপ্ত মনোযোগ দিতে পারছেন না। তখন কিন্তু সবদিক দিয়ে আপনি নিজেকে ক্ষতির দিকেই ঠেলে দিচ্ছেন। এই অবস্থাগুলোই হল আসক্তির লক্ষণ। আর আসক্তি কখনো উপকারী হয়না। আর গেমিংয়ের বেলাতেও কিন্তু সেটার ব্যতিক্রম হবার কথা না।
WHO এর সিদ্ধান্ত এপ্রসঙ্গে একই রকম। তারা কিন্তু গেমিং ব্যাপারটাকেই খারাপ এমনকি নিয়মিত গেম খেলার অভ্যাসকেও খারাপ বা আসক্তি আর ডিসঅর্ডার হিসেবে দেখায়নি। এব্যাপারটা তাদের অফিশিয়াল উক্তি থেকেই দেখে নেয়া যাক।

WHO গেমিং ডিসঅর্ডার সম্পর্কে বলেছে,

Gaming disorder is defined in the draft 11th Revision of the International Classification of Diseases (ICD-11) as a pattern of gaming behavior (“digital-gaming” or “video-gaming”) characterized by impaired control over gaming, increasing priority given to gaming over other activities to the extent that gaming takes precedence over other interests and daily activities, and continuation or escalation of gaming despite the occurrence of negative consequences WHO

 

 

এখানে আমরা কিছু জিনিষ লক্ষ্য করতে পারি।

১. তারা বলেছে “Impaired control over gaming“, অর্থাৎ এমন একটা অবস্থা যখন গেম খেলা বা না খেলাত উপর নিজের ইচ্ছের নিয়ন্ত্রণ থাকেনা। যখন মানুষ সেই অভ্যাসটার প্রতি অনিয়ন্ত্রিতভাবে নির্ভর হয়ে পড়ে।

২. “Increasing priority given to gaming over other activities“, অর্থাৎ গেমিংকে প্রাধান্য দিতে দিতে এমন একটা অবস্থায় চলে যাওয়া যে আপনি নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় কাজগুলোকে হেলা করা শুরু করছেন সেদিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে। একটা উদাহরণ দিয়েই নাহয় বলি : আপনি গেম খেলেন ভাল কথা, মাঝেমধ্যে পাঁচ ছয় ঘণ্টা খেলেন তাও ভাল কথা, কিন্তু দেখা গেল আসতে আসতে আপনার গেম খেলাটা এত বেশি ভাল লাগতে লাগলো যে আপনি প্রতিদিনই পাঁচ ছয় ঘণ্টা করে বা তারো বেশি খেলছেন। খেলার সময় বাবা বা মা ডাকতে আসলে নিজের অজান্তেই দাঁত খিটমিটিয়ে দুর্ব্যবহার করে বসছেন। শুধু তা ই না, খেতে ডাকলে ঠিকমত খাচ্ছেন না। এবং আপনার পড়ার সময়গুলোও দিয়ে দিচ্ছেন গেমিংয়ে। সেভাবে না পোষালে রাত জাগছেন, দুইটা, তিনটা এমনি চারটা পাঁচটা বাজেও ঘুমাচ্ছেন। আপনার কম ঘুম ক্রমাগত আপনার স্ট্রোক ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে যাচ্ছে অপরদিকে আপনার এমন দুর্ব্যবহার আপনার পরিবারের মনে ক্রমাগত হতাশা বাড়িয়েই যাচ্ছে। আপনি একে একে প্রতিটা প্রয়োজনীয় কাজ থেকেই সময় কেটে সেগুলো গেমিংয়ের পেছনে দিয়ে দিচ্ছেন। আবার দীর্ঘক্ষণ গেমিং করার পর দেখা গেল আপনার খারাপ লাগছে, কেমন যেন হাহাকারবোধ করছেন।
এইসবই হচ্ছে অস্বাভাবিক ব্যাপার। সেগুলো দীর্ঘদিন কারো বেলায় চললে তার সুস্থস্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও মান খুব ভালভাবেই ব্যহত হবে। আর তাই একে দীর্ঘদিন চললে অস্বাভাবিক মানসিক আচরণ বললে মোটেও ভুল বা বাড়িয়ে বলা হবেনা।

৩. “Continuation or escalation of gaming despite the occurrence of negative consequences.” অর্থাৎ ক্ষতিকর ফলাফল বা পরিণতির সম্মুখীন হওয়া সত্বেও একই আচরণ চালিয়েই যাওয়া।
আর এই অংশটাই কিন্তু একটা আচরণকে ভারসাম্যহীন এর দিকে ইঙ্গিত করার জন্যে যথেষ্ট। হ্যা, সাময়িকভাবে এমন কিছু ঘটলেই যে তা আসক্তি আর মানসিক ভারসাম্যের দিকে নির্দেশ করবে তা না। তবে একই অস্বাভাবিক অবস্থা যখন সুদীর্ঘ সময়ের জন্যে চলতেই থাকে তখন তা খুব স্বাভাবিকভাবেই মানসিক সমস্যা হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। আর চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান ও অস্বাভাবিক মনোবিজ্ঞানের নিয়মানুযায়ী হুটহাট করেই কোনোকিছুকে মানসিক রোগ/মানসিক সমস্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে ফেলা হয় না। নির্দিষ্ট ব্যক্তির অবস্থা, পরিবার, সমাজ, নৈতিক ও অন্যান্য শিক্ষা ইত্যাদির স্বাপেক্ষে খুব ভালভাবে বিবেচনা করে ও আচরণের পুনরাবৃত্তির হিসেব করে তখনই তেমন একটা সিদ্ধান্তে পৌছানো হয়।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন WHO গেমিং কে মোটেও মানসিক রোগ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেনি, করেছে সেটার চুড়ান্ত মাত্রার আসক্তিকে। শুধু তাই নয় সেই আসক্তি তাদের শ্রেণিভুক্ত করা ডিসঅর্ডারে পড়ে কিনা সেজন্যে পূর্ণ যাচাই বাছাই স্বাপেক্ষে আসক্ত ব্যক্তির ১২ মাসের কার্যনামা পর্যবেক্ষণ করে তবেই সুনিশ্চিত হতে বলা হয়েছে।

গেমিং কি তাহলে বিনোদন নয়?

অবশ্যই গেমিং বিনোদন। শুধু বিনোদন নয়। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় বহু অসুস্থ আর অরুচিকর বিনোদনের মধ্যে গেমিং অন্যতম নিরাপদ আর ভাল বিনোদন। উঠতি বয়েসী ছেলেরা বিনোদনের খোড়াক হিসেবে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়, সবসময় সব আড্ডা বা সঙ্গ যে ভাল থাকে না তা বলা বাহুল্য। অনেকসময় অনেক বাজে সঙ্গতে পড়ে কারো সন্তান, কারো ভাই বা বোন নষ্ট হয়ে যেতে পারে এটা বলা বাহুল্য। এক্ষেত্রে সবচাইতে বড় ঝুঁকি হচ্ছে মাদকাসক্তি। একবার কেউ এই নেশায় পড়ে গেলে বের হওয়া খুব কঠিন। অপরদিকে আমাদের দেশে প্রেক্ষাপটে ভাবতে গেলে স্কুল পেরিয়ে পরবর্তী ধাপে আবার ছাত্ররাজনীতি নামের এক আজব বস্তুর দেখা মেলে, যার প্রাদুর্ভাব নিজের এবং নিজের চাইতেও বেশি অন্যদের জন্য কতটা হানিকারক তা বলা বাহুল্য। শিক্ষাজীবনে অনুপ্রবেশ করা এইসব জিনিষ একজন শিক্ষার্থীকে শুধু যে তাদের শিক্ষা থেকে দূরে রাখে তা নয়, তাদের মন মানসিকতাকেও প্রচন্ডরকমে প্রভাবিত করে। এছাড়াও অসুস্থ বিনোদন হিসেবে পার্শ্বদেশীয় অপসংস্কৃতির প্রভাব তো আছেই, যেখান থেকে উঠতি বয়সী শিশুরা নৈতিক বিষয় শেখার আগে প্রেম, রোমান্স আর যৌনতার কাব্যিক (!) চর্চা খুব ভালভাবে শিখতে পারে।

একজন গেমারের কিন্তু এই ঝুঁকিটা নেই বললেই চলে। লক্ষ্য করলে দেখবেন, একজন ফুল-ফর্ম গেমার, (ভাই থামেন, শুধুমাত্র ক্ল্যাশ অফ ক্লান আর এইট বল পুল খেলেই গেমার দাবিকারীদের কথা বলছি না) কিন্তু সচরাচর এসবের দিকে ঝুঁকেই না। তারা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়, মজা করে কিন্তু সচরাচর তাদের রুচি অন্যদিকে মোড় নেয়ার তেমন ঝুঁকি থাকে না। কারণ বেশিরভাগ গেমারদেরই বন্ধুরাও হয় গেমার। পাশাপাশি আরো একটা মজার বিষয় হল, যারা গেম খেলে তারা কিন্তু শুধু গেমিং নিয়েই থাকেনা, তাদের অনেকের মাঝেই দেখবেন প্রযুক্তির প্রতি ঝোঁক আছে, আছে গেমিং ও ভিস্যুয়াল ইফেক্টস ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন কৌশলগত কাজের প্রতি ঝোঁক (থ্রিডি মডেলিং, এনিমেশন, কম্পোজিটিং, পোস্ট প্রসেসিং ইত্যাদি)। এবং এই ঝোঁকটা কিন্তু স্বত:স্ফূর্ত। অন্তত আজব উটের পিঠে চলা আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মত কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস এতে নেই।
হ্যা, গেম খেলে এদের মাঝে যে কেউ খারাপ থাকে না তা না, কিন্তু সে সংখ্যা গড়ের তুলনায় অনেক কম। আর অতি সংখ্যালঘিষ্ঠ কখনো উদাহরণ হতে পারেনা। গেম খেলাটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গেলে অবশ্যই তা খারাপ, কিন্তু নিজের যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাজের প্রতি দায়িত্বশীল থেকে কেউ যদি গেম খেলার জন্যে নিজের আলাদা একটা সময় রাখে তাতে মোটেও খারাপ কিছু নেই। অন্তত ওই ব্যক্তির গেমিং এ প্রভাবিত হয়ে জঙ্গি হবার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়। বরঞ্চ অবাক করার ব্যাপার মনে হলেও সত্যি, পরিমিত গেমিংয়ের কিছু উপকারী দিকও রয়েছে!
আসুন তাহলে এবার সেগুলো দেখে নিই।

২০১৪ সালে প্রকাশিত American Journal of play এর একটি সংখ্যায় তিন গবেষক Adam Eichenbaum, Daphne Bavelier, ও C. Shawn Green এর গবেষণার সারমর্ম প্রকাশ করা হয় যেখানে গেমিংয়ের দীর্ঘস্থায়ী সুফল হিসেবে প্রত্যক্ষণ (Perception), মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষতার বিষয়টি উঠে আসে। এসবই মূলত বেশি দেখা দেয় একশন জনরার গেম খেলার মধ্যে। দেখা গেল গেমগুলো খেলার মাধ্যমে তারা খুব দ্রুত কোথাও Focus করতে পারছে, দৃষ্টিশক্তির সূক্ষ্মতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, খুব সহজেই অনেককিছু মনে রাখতে পারছে এবং একাধিক বিষয়গুলোর মধ্য থেকে খুব সহজেই সঠিক সিদ্ধান্ত বেছে নিতে পারছে।

গবেষণাটি তারা দুই ভাগে করেছে। একটি ছিল পারষ্পরিক সম্পর্কযুক্ত (Correlational) যাতে গেমারদের মধ্যে থাকা দক্ষতাকে নন গেমারদের সাথে তুলনা করে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এতে ফলাফল গেমারদের পক্ষে থাকলেও গবেষকদের মনে প্রশ্ন থেকে যায় যে, এমনও তো হতে পারে যে যারা গেমার তাদের আগে থেকেই তেমন দক্ষতা ছিল বলেই তারা গেমার।
তাই তারা অপর একটি গবেষণা করে যা পরীক্ষণ পদ্ধতিতে (Experimental) পরিচালিত হয় এবং যাতে সমস্ত নন গেমারদেরকেই নির্দিষ্ট সময় জুড়ে গেম খেলিয়ে দেখা হয়, আর অপর দলকে গেম না খেলিয়ে পরীক্ষা নেয়া হয়। সেখানেও ফলাফল একই রকম আসে, অর্থাৎ যারা নির্দিষ্ট সময় জুড়ে গেম খেলেছে তাদের পক্ষে।

এছাড়াও সময় সময়ে নানা গবেষণায় গেমিংয়ের কৌশল ও কর্মদক্ষতামূলক উপকারীতাসমুহ উঠে এসেছে। নীচে কতিপয় গবেষণাসমুহের ফলাফল এর সারসংক্ষেপ দেয়া হল।

১. দেখে অনুধাবন করার ক্ষমতা বাড়ায়।

Li এর করা গবেষণায় (২০০৯) দেখা গেল ১০-১২ সপ্তাহ জুড়ে ৫০ ঘণ্টার গেমিংয়ে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের প্রতি সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

Li ও তার সহকর্মীদের করা ২০১১ সালের আরেক গবেষণায় দেখা গেল পরিমিত গেমিং Lazy Eye Disorder কে সাড়িয়ে তুলতে এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পুরোপুরি সাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করছে।

২. মনোযোগ ও সতর্কতা বৃদ্ধি

২০০৫ সালের একটি গবেষণায় এসেছে একশন গেমিং ইন-গেম ও বাস্তব উভয় ক্ষেত্রেই কোনো গতিশীল বস্তুকে সূক্ষ্মভাবে নজর রাখার ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করে। এবং তা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক, উভয়ের ক্ষেত্রেই হয়।

২০০৯ সালের Dye, Green, ও Bavelier এর করা আরেকটি গবেষণায় এসেছে একশন গেম আবেগীয় প্রক্রিয়ারও উন্নতি সাধন করে থাকে। স্বাপেক্ষ ও অস্বাপেক্ষ উদ্দীপকসমুহের প্রতি প্রতিক্রিয়া নির্ণয়ের মাধ্যমে ব্যাপারটি তাদের সামনে আসে।

Green ও Bavelier এর করা ২০১২ সালের আরেকটি পরীক্ষণে উঠে আসে একশন গেমিং খেলোয়াড়দের খুব দ্রুত লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করা, শনাক্ত করা ও অনেকগুলো উদ্দীপকের মাঝ থেকে আলাদা করারয় খুব সাহায্য করে ও এই ক্ষমতার উন্নতি সাধন করে থাকে।

দিকভ্রান্তি বা Dyslexia’র ব্যাপারে আমরা অনেকেই হয়তো জানি। বিখ্যাত শিল্পী, আচার্য, প্রকৌশলী ও বহুগুণি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিরও এই সমস্যা ছিল। আবার অনেকের দেখা “তারে জামিন পার” ছবির ছোট্ট শিশুটারো এই সমস্যা থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে ২০১৩ সালে করা Franceschini’র এক পরীক্ষণে ধাপে ধাপে ১২ ঘণ্টা ভিডিও গেম খেলিয়ে দেখা গেল তাতে করে দিকভ্রান্তি সমস্যার অনেকখানি উন্নতি সাধিত হয়। এমনকি অবস্থার এই পরিবর্তন ছিল Dyslexia Treatment Program এর চাইতেও বেশি কার্যকরী!

৩. কার্যনির্বাহী দক্ষতা বৃদ্ধি

কার্যনির্বাহী দক্ষতা বলতে দ্রুত ও উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ওর এর সাথে সম্পৃক্ত মনোযোগ, প্রত্যক্ষণ ও স্মৃতিশক্তিকে বুঝায়।
২০১৪ সালে Chiappi ও তার সহকর্মীদের করা এক গবেষণায় দেখা গেছে যে পর্যায়ক্রমে বিভক্ত ৫০ ঘণ্টার গেমিংয়ে খেলোয়াড়দের একই সময়ে একাধিক কাজ সামলানোর দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে। Multi-Attribute Task Battery নামক এই টেস্ট টি ছিল মূলত বিমান চালনার কৌশলাদি নিয়ে। বিমান চালনা অত্যন্ত জটিল একটি কাজ এবং এধাঁচের কাজেতে একই সময়ে একাধিক বিষয়ের উপর লক্ষ্য ও নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয়। গবেষণার ফলাফলে কৌশলগুলোতে তাদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায়।

Anderson এর ২০১০ সালে Green এর ২০১২ ও Colzato এর ২০১৪ সালে করা আরেক গবেষণায় দেখা যায় যে একশন গেম মানুষকে সহজেই এক কাজ থেকে আরেক কাজে (Task) ঢুকে যেতে সহায়তা করা যা একটা আরেকটার সাথে সাংঘর্ষিক বা ভাবগত বা গঠণগত দিক দিয়ে অনেকটাই একটা আরেকটার বিপরীত। এতে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে।

এছাড়াও গেমিং কর্মদক্ষতামূলক স্মৃতি, হস্তসঞ্চালনে দক্ষতা ইত্যাদি (Basek ২০০৮) বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

৪. কর্মক্ষেত্রে

একাধিক পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেল গেমিং হস্তসঞ্চালন ও দক্ষতাভিত্তীক (Cognitive) কাজে পেশাদারী ক্ষেত্রেও অনেক সহায়তা করে থাকে।
যেমন MKinley’র ২০১১ সালে করা পরীক্ষণে দেখা গেল গেমিং এর ফলে (একশন গেমিং) মানুষের ড্রোন কপ্টার নিয়ন্ত্রণ ও পাইলট এর বিভিন্ন কার্যপদ্ধতি সামলানোর দক্ষতা সাধারণ মানুষদের চাইতে অনেক বেশি আর সাবলীল হয়ে থাকে।

২০০৭ এ করা গবেষক Rosser এর পরীক্ষণে আরো অবাক করা বিষয় চলে আসে! দেখা গেল গেমিং এ অভ্যস্ত (আসক্ত না ভাই) একজন তরুণ সার্জন একজন বয়স্ক সার্জনের স্বাপেক্ষে তুলনামুলক ভাল।

এছাড়াও গেমিং নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আরো বিভিন্ন গবেষণা করা হল। আর সবচে বড় কথা হল, আপনি যদি নিজে গেমার হোন, তাহলে বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিক্রিয়ার পার্থক্যটা নিজেই খুব বুঝতে পারবেন।
হ্যা, মাত্রাতিরিক্ত গেম খেলা, প্রয়োজনীয় কাজ ফেলে রেখে গেম খেলা এবং রাতের পর রাত ঘুম হারাম করে গেম খেলা কোনো হিসেবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। এরুপ বিচ্ছিন্ন ঘটনা আলাদা বিষয়। কিন্তু এসবের পুনরাবৃত্তি আসক্ত ব্যক্তির জন্যে সবদিক দিয়েই অকল্যাণকর, ঝুঁকিপূর্ণ এবং ভারসাম্যহীন মানসিক অবস্থার নিদর্শন। পাশাপাশি তখন তা মানুষকে বিষণ্ণতার মাঝেও ফেলে দেয়। তাই গেমিং পরিমিত মাত্রায় এবং বিনোদনের উপায় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখাটাই উত্তম। যদি দেখুন গেমিং এর কারণে আপনি বা আপনার পরিচিতজন পরিবারের সাথে দুর্ব্যবহার করছে, সেক্ষেত্রে ঠাণ্ডা মাথায় বিষয়টা বুঝুন বা বুঝান। গেম, ম্যাচ, অনলাইন টুর্নামেন্ট জীবনে বহু খেলা সম্ভব, কিন্তু পরিবার গেলে পরিবার ফিরে পাওয়া সম্ভব না।
আবার অপরদিকে কেউ যদি ভাবেন আপনার আত্মীয়স্বজন, ভাই – বোন, ভাতিজা – ভাতিজি, ভাগ্নেভাগ্নি, প্রেমিক – প্রেমিকা ইত্যাদি ইত্যাদি গেম খেলে পুরাই অস্থির হয়ে “গতা ভ” (GTA V), দুরের কান্না ৩ (ইয়ে মানে Far Cry 3) এর মত বাইরে বেরিয়ে উড়োধুরো মানুষ মারা শুরু করবে, কোনো চেকপোস্টের ওয়াচটাওয়ারে থাকা গার্ডকে গুলি করে “ঠুশ” করে দিবে তাহলে আপনি নেহায়েতই হাস্যকর ভাবনায় ডুবে আছেন।
মানুষ গেম বিনোদনের জন্যেই খেলে। পার্থক্য কেবল বিনোদনটা ভিন্নধর্মী, আর নানাদিকে উপযোগী। একে কোনো ফোবিয়াগ্রস্থ প্রতিবেদকের ভাষ্য শুনে জঙ্গি তৈরির কারখানা ভেবে বসবেন না।

তো আজ এই পর্যন্তই। পরে আবার কথা হবে হয়তো অন্য কোনো বিষয়ে। ততক্ষণ ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন, পরিমিত মাত্রায় গেম খেলুন, নিজের খেয়াল রাখুন।

হ্যাপি গেমিং…

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close