মহাকাশ

Proxima b: সবচেয়ে নিকটবর্তী এবং পৃথিবীর মতো বৈশিষ্টের এক্সোপ্লানেট

সৌরজগতের বাহিরে পৃথিবীর মতো অনেক গ্রহই আছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০০০ এর মতো এরকম ছোটো- বড় সম্ভাবনাময় গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে। এ নিয়ে যেমন মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই তেমনি রহস্য বা রোমাঞ্চও কম নয়। বেশিরভাগ Exoplanets বা আমাদের সৌরজগতের বাহিরে থাকা গ্রহ গুলো বিরাট দূরত্বে অবস্থান করে আছে। সেজন্য সেগুলো থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা অনেক কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। তবে প্রথমবারের মতো আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে নিকটবর্তী নক্ষত্র Proxima Centaury (দূরত্ব ৪.২ আলোকবর্ষ) কে প্রদক্ষিণরত একটি গ্রহ আবিষ্কারের সত্যতা তুলে ধরেন বিজ্ঞানীরা যা প্রায় পৃথিবীর মতো এবং সম্ভাবনায় ভরপুর। চলুন আজ জেনে নিই গ্রহটি সম্পর্কে কিছু তথ্য।

২০১৬ সালে আগস্টের দিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি Exoplanet বা সৌরজগতের বাহিরে অবস্থানকৃত গ্রহ আবিষ্কার করেন। Red Dot project নামে চলমান একটি গবেষণামূলক অনুসন্ধান থেকে বিজ্ঞানীরা দাবি করেন যে আমাদের সূর্যের সবচেয়ে নিকটবর্তী নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টাউরির পাশে প্রদক্ষিণরত একটি গ্রহের উপস্থিতি রয়েছে যার নামকরণ করা হয় প্রক্সিমা বি(Proxima b)। প্রথমবারের মতো এত কাছে একটি গ্রহ আবিষ্কার মোটেও কম কথা নয় আবার যদি এতে থেকে থাকে বসবাস করার মতো পরিবেশ! স্বাভাবিকভাবেই বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান আর কৌতূহোলেড় কোণ অংশই বাকি রাখছেন না। প্রথম প্রশ্নই যেটা আসে, গ্রহটির কি আসলেই অস্তিত্ব রয়েছে?

প্রশ্নটা অস্বাভাবিক শোনালেও ঠিক একইরকম ভাবে ২০১২ সালে Alpha Centauri-র কাছাকাছি এরকম এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কারের গুঞ্জন ওঠে, যার নাম দেয়া হয় Alpha Centauri Bb। কিন্তু পরবর্তীভাবে বিষদ পর্যবেক্ষনে জানা যায় এরকম কোনো গ্রহের অস্তিত্ব নেই, জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের নক্ষত্রের “wobble” পরিমাপে গৃহীত উপাত্তের গড়মিল দেখা দিয়েছিল(বিস্তারিত দেখতে পারেন এখান থেকে)। সেজন্য প্রক্সিমা বি এর ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছেনা। তবে খুবই সংবেদনশীল ডপলার স্পেক্ট্রোস্কোপি ব্যবহার করে প্রক্সিমা সেন্টাউরির “কম্পন” পরিমাপ করে সেটির কক্ষপথে গ্রহটির অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাছাড়াও আরো বেশ কিছু নিশ্চিত পরীক্ষার মাধ্যমে ৯৯ ভাগ নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এইরকম গ্রহ অস্তিত্বমান।যেহেতু অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা একরকম নিশ্চিত হয়ে গেলাম এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে, সেটা হলো গ্রহটি কি প্রাণির জন্য বসবাসযোগ্য?

Doppler Effect

এটা এখনো কেউ নিশ্চিত নন। এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য নিশ্চিত করা গিয়েছে তা হলো গ্রহটির ভর পৃথিবীর ভরের দেড় থেকে ৩ গুণ। এর স্থলভাগ হয়ত পাথুরে এবং কেন্দ্রে থাকা নক্ষত্রকে যে দূরত্বে প্রদক্ষিন করছে তা আমাদের থেকে সূর্যের দূরত্বের ৫ শতাংশ। পৃথিবীর হিসাব যদি আসত তবে এমন দূরত্বে থাকা গ্রহে কখনো জীবন আশা করা যেত না। তবে প্রক্সিমা বি এর প্যারেন্ট স্টার বা প্রদক্ষিণের কেন্দ্রে থাকা নক্ষত্রটি আকারে ওনেক ছোটো , লাল বামন। এর মানে হলো এটি আমাদের সূর্য থেকে কম আলো বিকিরণ করে। বলা যায় যে স্থানে গ্রহটি আছে সেটি জীবের জন্য বসবাসযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এর ভূমিতে পানির অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব কিছু না।

গ্রহটিতে কি কোনো “এলিয়েন লাইফ” থাকার সম্ভাবনা রয়েছে?

এটা নির্ভর করে কিছু বিষয়ের উপর। প্রথমত প্রশ্ন আসে বায়ুমণ্ডল নিয়ে। গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের প্রকৃতি বলে দিবে সম্ভাব্য প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে। প্রক্সিমা বি তাঁর কেন্দ্রে থাকা নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় ১১ দিনের মতো, পৃথিবীর হিসাবে। তাছাড়াও গ্রহটির শুধুমাত্র একপার্শ্ব কেন্দ্রে থাকা নক্ষত্রের দিকে মুখ করে থাকে। সহজ বাংলায় বললে গ্রহটি অবস্থানের কারণেীমনভাবে তাঁর সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে যে একটা পাশ স্থিরভাবে সেই সূর্যের দিকে স্থির করা থাকে এবং অপর পাশ কখনোই দিনের আলো দেখেনা এবং ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকে। এটাকে বলা হয় Tidal Locking। একদিকে অনবরত আসা তীব্র তাপ অন্যদিকে আলোর অনুপস্থিতি ও প্রবল ঠান্ডা। এখন যদি কোনো পুরুস্তর বিশিষ্ট বায়ুমণ্ডল না থাকে তাহলে কখনোই তাপের সমপ্রবাহ ঘটবেনা গ্রহটিতে। গ্রহটির প্রকৃত আকৃতি সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি, যেটা অনেক ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। আগেই বলা হয়েছে এর মাতৃ নক্ষত্র একটি লাল বামন যা অনেক কম তাপ শক্তি ও আলো বিকিরণ করে আমাদের সূর্যের চেয়ে। গ্রহটি অত্যাধিক বড় হলে প্রয়োজনের তুলনায় তখন সঠিক শক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। সুতরাং এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে গ্রহটিতে যদি কোনো প্রাণি থেকে থাকেও তা হবে আণুবীক্ষণিক।

Tidal Locking

গ্রহটি সম্পর্কে আরো বিস্তারিত আমরা কীভাবে জানতে পারব?

সেটার জন্য আমাদের প্রয়োজন হবে আরো উন্নত এবং বিশালাকারের টেলিস্কোপ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় আসন্ন European Extremely Large Telescope, James Webb Space Telescope ইত্যাদির ব্যবহার আমাদেরকে প্রক্সিমা বি সহ আরো যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে বিষদ তথ্য প্রদান করবে। এখনও আমরা এর বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে ভালোভাবে জানিনা, উন্নত টেলিস্কোপ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রহটির বায়ুমণ্ডল, তাপের উপর এর প্রভাব এবং গ্রহটিতে কী কী গ্যাস রয়েছে সেগুলো সম্পর্কে জানা যাবে।

আমরা কি গ্রহটিতে যেতে পারব?

শুরুতেই বলেছি প্রক্সিমা সেন্টাউরি যা আমাদের নিকটবর্তী নক্ষত্র এবং এর দূরত্ব প্রায় ৪.২ আলোকবর্ষ। কিলোমিটারের হিসাবে যা প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার! আমাদের সবচেয়ে দূরবর্তী মহাকাশযান ভয়েজার ১ পাড়ি দিয়েছিল প্রায় ২০ বিলিওন কিলোমিটার ৪০ বছরে। মূল অর্থ দাঁড়ায় মোটামুটি ভাবে ১০ হাজার বছরের মতো লেগে যেতে পারে যদি কেউ যাত্রা করে! তবে রাশিয়ান বিলিওনার Yuri Milner একটা প্রজেক্টের ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তিনি নিকটবর্তী নক্ষত্রগুলোতে ছোটো আকারের মহাকাশ যান পাঠাবেন যেগুলো বহন করবে হাজার হাজার ছোটো স্পেস প্রব যার গতি থাকবে আলোর বেগের ২০ শতাংশ এবং লক্ষ্যে পৌছুতে সময় নেবে ২০ বছর! তবে সম্প্রতি গবেষণায় জানা যায় যে এই স্পেস প্রব গুলো যাত্রাতে টিকে না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু যদি সার্ভাইব করে তবে আমরা হয়ত এ দশকেই আলফা বা প্রক্সিমা সেন্টাউরির মতো নক্ষত্র এবং এক্সোপ্লানেট গুলোকে খুব কাছ থেকে জানতে পারব!

Voyager 1

তথ্যসূত্রঃ space.com, iflscience

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close