প্রযুক্তি

ভবিষ্যত কম্পিউটার ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিং

সাধারণ কম্পিউটারের তুলনায় মিলিয়ন গুণ দ্রুতগতির এক কম্পিউটারকে আমরা হাতের মুঠোয় পেয়ে যাবো

আপনার ব্যক্তিগত কম্পিউটার কিংবা আপনার পকেটে থাকা স্মার্ট-ফোন প্রথম দিকের তৈরি বিশালাকার কম্পিউটারগুলোর তুলনায় অনেক অনেক গুণ বেশি দক্ষ এবং আকারে অনেক ছোট। আমাদের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে যখন প্রতিনিয়ত কম্পিউটারের দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ছে তখনই চিন্তা করতে হচ্ছে এর আকার নিয়ে। আমাদের ব্যবহৃত কম্পিউটারগুলো সাধারণত  সকল ধরণের কাজ সম্পাদন করে থাকে প্রসেসরের মাধ্যমে। এই প্রসেসর মূলত কোটি কোটি ট্রানজিস্টারের সমন্বয়ে তৈরি একটি সেমিকন্ডাক্টর চিপ। এই প্রসেসরকে আরও বেশি কর্মদক্ষ করে তোলার লক্ষ্যে এতে যখনই ট্রানজিস্টারের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ছে তখনই ট্রানজিস্টারগুলোর আকার ক্রমশ কমিয়ে আনতে হচ্ছে।১৯৬৫ সালে ইন্টেলের সহপ্রতিষ্ঠাতা গর্ডন মুর ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে সেমিকন্ডাক্টর চিপে ট্রানজিস্টারের ঘনত্ব প্রতি ২৪ মাসে দ্বিগুণ হতে থাকবে যা মুরের নীতি নামে পরিচিত। অভাবনীয়-ভাবে এই ভবিষ্যদ্বাণী এখনও সঠিকভাবে মিলে যাচ্ছে এবং ১৯৭১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রসেসরে ব্যবহৃত ট্রানজিস্টারের সংখ্যা ২৩০০ থেকে এসে দাঁড়ায় ২০০  কোটিতে। এভাবে একসময় ট্রানজিস্টারগুলো ছোট হতে হতে এক একটি পরমাণুর আকার ধারণ করবে। তখন এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমাদের প্রয়োজন হবে সম্পূর্ণ নতুন কোন পদ্ধতির। নতুন এই প্রযুক্তি, যা কম্পিউটারের কর্মদক্ষতাকে আমার আপনার  কল্পনার বাহিরে নিয়ে যাবে তার নাম কোয়ান্টাম কম্পিউটিং।

 

বর্তমানে ব্যবহৃত কম্পিউটারগুলো কিভাবে কাজ করে?

    আমরা হয়তোবা এতটুকুই ভাবি যে আমাদের কম্পিউটারগুলো একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস যাতে আমরা ফেসবুকিং,ইন্টারনেট ব্রাউজিং,গেমস খেলা ইত্যাদি কাজ করে থাকি। কিন্তু বাস্তবে এই কম্পিউটার এমন অনেক কিছু করতে পারে যা সাধারণভাবে আমাদের জন্য করা অসম্ভব বা কষ্টসাধ্য। আবার অন্যদিক থেকে ভাবতে গেলে এই কম্পিউটার আপনার চিন্তা ভাবনার তুলনায় অনেক কম কিছু। আসলে বর্তমানে ব্যবহৃত কম্পিউটারগুলো শুধুমাত্র গাণিতিক সমস্যা সমাধানে ব্যবহৃত ক্যালকুলেটরের চেয়ে একটু উন্নত যন্ত্র মাত্র।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ট্রানজিস্টার ব্যাবহার করে কম্পিউটার যাবতীয় কার্যাবলী সম্পাদন করে। এই ট্রানজিস্টারকে আপনি চিন্তা করতে পারেন একটি সুইচ হিসেবে যার কাজ দুটি জিনিসে সীমাবদ্ধ আর তা হলো অন করা এবং অফ করা। যেকোনো কম্পিউটার প্রসেসর মূলত দুটি কাজ করতে পারে। একটি হলো কোন সংখ্যাকে মেমোরিতে ধারণ করা এবং এই সংখ্যাগুলো প্রসেসিং করা যেমন: যোগ বিয়োগ করা। শুধু তাই নয় এটি সংখ্যা বা তথ্য ব্যাবহার করে গাণিতিক সমস্যা তৈরি করে তার সমাধান করতে পারে এবং এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় এলগরিদম। সংখ্যা জমা রাখা ও প্রসেসিং করা-এ দুটি প্রধান কাজ নিয়ন্ত্রণ করে ট্রানজিস্টার। প্রসেসরে বা মেমোরিতে অবস্থিত ট্রানজিস্টারকে অন বা অফ করার মাধ্যমে এতে কোন সংখ্যা সংরক্ষণ করা হয়।ট্রানজিস্টারের মধ্য দিয়ে ইলেক্ট্রিসিটি  প্রবাহিত করে একে অন করা হলে সংরক্ষিত হয় (1) এবং অফ রাখা হলে সংরক্ষিত হয় (0)। প্রতিটি জিরো বা ওয়ান কে বলা হয় বাইনারি ডিজিট বা একটি বিট। এই বাইনারি ডিজিটের লম্বা সিকোয়েন্স ব্যাবহার করে যেকোনো সিম্বল,নাম্বার,লেটার ইত্যাদি সংরক্ষণ করা হয়। অনেকগুলো ট্রানজিস্টার একত্রে মিলিত হয়ে এই কাজ সম্পন্ন করে যে সার্কিটের মাধ্যমে তাকে বলা হয় লজিক গেট।

আমাদের বর্তমান সময়ে ব্যবহৃত কম্পিউটারগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটিমাত্র কাজই সম্পন্ন করতে পারে।ট্রানজিস্টার নির্ভর এই কম্পিউটারকে আপনি যত জটিল কাজ দেবেন তা ধাপে ধাপে সম্পন্ন করতে সে তত বেশি সময় ব্যয় করবে।আগের দিনের কম্পিউটারগুলোর তুলনায় যা হয়তো অনেক কম। কিন্তু জটিল থেকে জটিলতর কাজ আরও দ্রুত সমাধান করার ইচ্ছা মানেই আরও বেশি বাইনারি ডিজিট সংরক্ষণ করা অর্থাৎ আরও বেশি ট্রানজিস্টার যুক্ত করা। হাতের তালুতে আঁটানো যায় এমন প্রসেসরে আরও ট্রানজিস্টার যুক্ত করাটা সমস্যা নয় সমস্যা সেখানেই যখন অসংখ্য ট্রানজিস্টার আকারে আরও ছোট হতে হতে এক একটি পরমাণুর আকার ধারণ করবে।সবশেষে এদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে আমাদের প্রয়োজন পড়বে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং।

 

 কোয়ান্টাম কম্পিউটিং

কোয়ান্টাম মেকানিক্স হচ্ছে বর্তমান সময়ে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে আলোচিত এবং সম্ভাবনাময় একটি শাখা। এর বৈজ্ঞানিক থিওরিগুলো এতটাই দুর্বোধ্য যে কাউকে পাগল বানাতে চাইলে আপনি তাকে নিঃসন্দেহে  কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জগতে ছেড়ে দিতে পারেন। এই বিষয়ে কাজ করে দু বারের নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী থমাস ফাইনম্যান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন-“ কি কাজের জন্য আমি নোবেল পেয়েছি তা যদি এত সহজভাবে বলা যেত তাহলে এই পুরষ্কার আমি পেতাম না। আমি বাজি ধরে বলতে পারি কোয়ান্টাম মেকানিক্স আসলে কেউ বোঝেনা।“

একসময়কার মাথা গোলানো অদ্ভুতুড়ে থিওরিগুলোই সভ্যতাকে শত বছর এগিয়ে দিয়েছে।এ বিষয় নিয়ে একটু পড়াশোনা করলেই আপনি বুঝতে পারবেন হয়তো  পদার্থবিদ্যার এই সুন্দরতম অধ্যায় – কোয়ান্টাম মেকানিক্স ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার যে দ্বার উন্মোচন করবে তা আমাদের চিন্তার বাইরে।এসব আলোচনা এজন্যই করা হলো যে একটু পর কোয়ান্টাম তত্ত্বের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করলে আপনি যেনো আমাকে পাগল না ভাবেন।

কোয়ান্টাম মেকানিক্স মূলত আলোচনা করে পরমাণু এবং এর মধ্যস্থিত কণাগুলোর আচরণ নিয়ে। আলোকবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করে থাকলে আপনি জেনে থাকবেন যে আলো একই সাথে কণা এবং তরঙ্গ আকারে আচরণ করে থাকে। একে ওয়েভ পার্টিকেল ডুয়ালিটি বলা হয়। বাস্তব জগতে আমাদের পক্ষে এটা উপলব্ধি করা খুব কঠিন যে কোন বস্তু একই সঙ্গে কণা এবং তরঙ্গ দুটি রূপে অবস্থান করতে পারে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মাথা পাগল করা থিওরির একটি হচ্ছে Schrodingers cat theory যেখানে বলা হয় এমন একটি জগতকে চিন্তা করুন যেখানে একটি বিড়াল একই সাথে জীবিত এবং মৃত।এতক্ষণে হয়তো আপনি আমাকে পাগল ভাবছেন কারণ কম্পিউটারের সাথে এই থিওরির সম্পর্ক কোথায়?সম্পর্ক এখানেই যে ট্রানজিস্টারের বদলে প্রসেসরগুলো যখন এটম দিয়ে পরিচালিত হবে তখন আপনি এদেরকে ইলেক্ট্রিসিটি দিয়ে বর্তমানে প্রচলিত ট্রানজিস্টারের মত অন অফ করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।এক্ষেত্রে এটমিক ট্রানজিস্টারগুলো এমন আচরণ করবে যে এরা একই সময়ে অন এবং অফ উভয় অবস্থায় রয়েছে।এমনটা কি কখনো সম্ভব হবে?যদি হয় তবে এখনকার কম্পিউটিং সিস্টেম এমন একটা পর্যায়ে উন্নীত হবে যা এখনও আমাদের কাছে রূপকথার মত।ডাটা প্রসেসিং স্পিড হবে আলোর গতির কাছাকাছি এবং তা বর্তমান সময়ের কম্পিউটারগুলোর তুলনায় মিলিয়ন গুণ দ্রুতগতির হবে

 

কিভাবে কাজ করবে কোয়ান্টাম কম্পিউটার?

     সাধারণ কম্পিউটারের মত এলগরিদম,লজিক গেট এসবের পাশাপাশি শুধুমাত্র বিটের বদলে কোয়ান্টাম কম্পিউটারে ব্যবহৃত হবে কিউবিট। এই বিশেষ ধরণের কিউবিটের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সাধারণ বিট যেখানে একটি মাত্র বাইনারি ডিজিট ধারণ করতে পারে সেখানে একটি কিউবিট ধারণ করে একই সাথে একটি (0) এবং (1) অথবা এদের মধ্যবর্তী যেকোনো অসীম সংখ্যা। কিউবিট কিভাবে একইসাথে একাধিক সংখ্যা ধারণ করে রাখতে পারে তা বুঝতে চাইলে চলে যেতে হবে পদার্থবিদ্যার একটি নীতির কাছে যার নাম সুপার-পজিশন প্রিন্সিপাল।এই ধারণা অনুসারে দুটি উদ্দীপনা যেমন তরঙ্গ একত্রিত হয়ে নতুন একটি তরঙ্গের সৃষ্টি করলে তা পূর্বের দুটি তরঙ্গকে ধারণ করে রাখে।একইভাবে কিউবিট একইসাথে একাধিক সংখ্যা ধারণ করে রাখতে পারবে। সবচেয়ে বড় যে সুবিধাটি আমরা পাবো তা হচ্ছে একাধিক ভ্যালু একই সাথে সংরক্ষণের পাশাপাশি এই কম্পিউটারগুলো একাধিক সমস্যা বা কাজ বর্তমান কম্পিউটারের মত ধাপে ধাপে না করে একই সময়ে একই সাথে প্যারালালি সম্পন্ন করতে পারবে। যার ফলে সাধারণ কম্পিউটারের তুলনায় মিলিয়ন গুণ দ্রুতগতির এক কম্পিউটারকে আমরা হাতের মুঠোয় পেয়ে যাবো।

কোয়ান্টাম কম্পিউটারের অগ্রগতি

মাইক্রোসফট,আইবিএম এবং গুগলের মত প্রসিদ্ধ কোম্পানি গুলোর মধ্যে বেশ আগে থেকেই চলছে প্রথম কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির প্রতিযোগিতা। প্রথম কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির খ্যাতি লাভের প্রয়াসে ইতিমধ্যে কিছু কোম্পানি বেশকিছু এডভান্স সিস্টেম ডেভেলপ করেছে যেগুলো কিউবিট কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।এধরণের প্রোটোটাইপগুলো এখনও কেবলমাত্র প্রতিটি চিপে ১২ থেকে ২৪ টি কিউবিট ধারণ করতে পারে যেখানে একটি সত্যিকারের কার্যকর কোয়ান্টাম কম্পিউটার পরিচালনার জন্য দরকার কমপক্ষে ৫০ কিউবিট।

গুগল এবং আইবিএম এমন একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটার ডেভেলপের আশাবাদ ব্যক্ত করেছে করেছে যার মধ্যে কিউবিটকে উপস্থাপন করা হবে অর্ধপরিবাহী একটি পদার্থের মাধ্যমে যার মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়া এবং না হওয়া (1) এবং (0) কে নির্দেশ করবে।বিশেষ এই সেমিকন্ডাক্টরের তাপমাত্রা -২৭৩.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি রাখা হবে।

মাইক্রোসফট কর্তৃক তৈরি কোয়ান্টাম কম্পিউটারে কিউবিট হিসেবে কাজ করবে ভ্যাকুয়াম চেম্বারে আবদ্ধ কিছু আয়ন যাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে লেসারের মাধ্যমে। ইতস্তত বিচরণরত চার্জগুলোই কিউবিট হিসেবে কাজ করে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করবে।

 

পরিশেষে..

কোয়ান্টাম কম্পিউটার আবিষ্কারের মাধ্যমে হয়তো মানব সভ্যতা আরও কয়েক শতাব্দী এগিয়ে যাবে। সাথে সাথে খুলে যাবে অপার এক সম্ভাবনার দ্বার যেখানে আধুনিক বিজ্ঞানের জগতে রাজত্ব করবে কোয়ান্টাম মেকানিক্স।টেলিপোর্টেশনের মত তাত্ত্বিক ধারণাগুলো হয়তো বাস্তবায়িত হবে কোয়ান্টাম কম্পিউটারের হাত ধরেই। আজকে এখানেই শেষ করছি।ইনশাআল্লাহ আবারো হাজির হবো আমার প্রিয় পদার্থবিদ্যা কিংবা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সুন্দরতম কোন বিষয়ের আলোচনা নিয়ে।বিজ্ঞানকে ভালবাসুন,বিজ্ঞানের সাথে থাকুন।

Links & Reference

  • https://www.quantumrun.com/prediction/how-quantum-computers-will-change-world-future-computers
  • https://en.wikipedia.org/wiki/Moore%27s_law
  • https://en.wikipedia.org/wiki/Quantum_superposition
  • https://www.scientificamerican.com/article/how-close-are-we-really-to-building-a-quantum-computer/
  • https://www.wired.co.uk/article/quantum-computing-explained

Intel বনাম AMD, জনম জনমের প্রতিদ্বন্দ্বী।

 

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close