ইতিহাসবিবিধ

বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারক কে? Joseph Swan নাকি Edison?

রাতের আধার দূর করার জন্য বাল্বের আবিষ্কারক কে বা কারা?

যদি বলা হয়, বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারক কে?

সবাই এক কথায় উত্তর দিবে যে, টমাস আলভা  এডিসন। আজকে আপনাদের সামনে তুলে ধরবো বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কারের পেছনে লুকিয়ে থাকা কিছু অজানা তথ্য।

বিজ্ঞানী ভোল্টা এর নাম আমরা শুনেছি। ভোল্টা সেল এর জন্য তিনি বিখ্যাত। তার সেল আবিষ্কারের পর থেকেই বাতি তৈরির পরিকল্পনা আসে। ভোল্টা তার সেল কে যখন কপারের চিকন কোনো তার দিয়ে শর্ট করেন, তখন দেখতে পান তারটি পুড়ে যাওয়ার আগে উজ্জ্বল হয়। সে সময় কিছু তাপশক্তি এবং আলোকশক্তি বিকিরিত হয়। কিন্তু ভোল্টার এই সম্পর্কে পুরোপুরি ধারনা না থাকায় তিনি কপার এর তারের ফিলামেন্ট তৈরি করেন এবং আলোর বদলে তাপ ই বেশি পান।

সাল ১৮৪০, বাতি তৈরি প্রায় ৩০ বছর আগে, ব্রিটিশ বিজ্ঞানী Warren de la Rue একটি বাল্বের মডেল ডেভেলপ করেন। কপারের এনোড এবং ক্যাথোড এর মাঝে প্লাটিনামের ফিলামেন্ট। বায়ুশূন্য কোনো কাচের বক্সে রাখলে ভালোই আলো দেয়। কিন্তু সে সময়ে প্লাটিনাম খুবই বিরল ছিলো বলে তা খুব একটা জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে নি।

ঠিক এর ৮ বছর পরে, ১৮৪৮ সালে William Staite একটি আর্ক ল্যাম্প তৈরি করেন। কিন্তু এর মেকানিজম ছিলো খুবই মজার। তিনি কার্বন রড এর ফিলামেন্ট ইউজ করেন। তিনি খেয়াল করেন যে, বেশিক্ষণ একই ফিলামেন্ট রাখলে তা থেকে খুবই বেশি তাপ বের হয়। তাই তিনি এতে মেকানিক্যালি ফিলামেন্ট যুক্ত করেন। কয়েকটি কার্বন রড বাল্বের ভেতরে ফিলামেন্টের জায়গা দখল করবে নির্দিষ্ট সময় পর পর অথবা ম্যানুয়ালি একটি হ্যান্ডল ঘুরিয়ে। তার এই পদ্ধতি খুব বেশি পরিমাণ পাওয়ার শোষণ করতো। একে-তো তখন মাত্র ডিসি কারেন্ট এর উৎপত্তি এবং এডিসন তখনো তার ডিসি পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করেন নি, তাই সবাই তখন ভোল্টার সেলের ব্যাটারি ব্যবহার করতো। ঐ ব্যাটারি দিয়ে  William Staite এর বাল্ব  চালানো খুবই ব্যয় সাপেক্ষ ছিলো। তাই তার বাল্ব জনপ্রিয় হয়ে উঠে নি।

বুঝাই যাচ্ছে বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কারের জন্য অনেক অনেক বিজ্ঞানী কাজ করেছে। অনেক প্যাটার্ন পাঠানো হয়েছে কিন্তু বাদ পরেছে। এখন আশা যাক জোসেফ সোয়ান(Joseph Swan) এবং এডিসন এর কাছে।

জোসেফ সোয়ান ১৮৫০ সালে, স্বল্প খরচে তৈরি করেন কার্বন পেপার ফিলামেন্ট। তিনি ঐ ফিলামেন্ট টা প্লাটিনামের বদলে বসিয়ে দেন এবং বাতি তৈরি করেন। এসবের মাঝে প্রায় ১০ বছরের মতো চলে যায়। তিনি পেটেন্ট জমা দিলে ১৮৭৯ সালে তা ডেমন্সট্রেট করার জন্য নিউক্যাসেল(ইংল্যান্ড) এ যান।  সেখানে তিনি বৈদ্যুতিক ল্যাম্প নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি তা ডেমন্সট্রেট করেন ঠিকই কিন্তু তা দীর্ঘদিন চালানো যাবে কিনা তা নিয়ে সতর্ক ছিলেন না। যেহেতু এখনকার মতো আগে এতো শক্তিশালী ভ্যাকিউম মেশিন ছিলো না, তাই তার ফিলামেন্ট কিছুক্ষণ জলার পরপরই পুড়ে যাচ্ছিলো।

এডিসন সমস্যাটি বুঝতে পারেন। তিনি বুঝতে পারেন যে, যদি ফিলামেন্টটি আরো চিকন হয় এবং রোধের মান বেশি হয় তবে তা সহজে পুড়বে না। অন্যদিকে সোয়ান ও তার বাল্ব নিয়ে গবেষণা শুরু করে দেয়। যেহেতু সোয়ান আগে পেটেন্ট জমা দিয়েছে তাই হয়তো এডিসন যদি একই পেটেন্ট কে মডিফাই করে দেয় তাহলে তাকে হয়তো আবিষ্কারক দেওয়া হবে না, এই ভেবে এডিসন তার কাজ শুরু করেন।

দিন যত যাচ্ছিলো, বৈদ্যুতিক বাতির প্রতিযোগিতা বেড়েই চলছিলো। প্রতিযোগী হিসেবে যোগ দিলেন Henry Woodward এবং Matthew Evans । তারা গ্লাস সিলিন্ডার এর ভেতর রড এর ফিলামেন্ট দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছিলো। গ্লাস সিলিন্ডারের ভেতরে নাইট্রোজেন গ্যাস দিয়েও চেষ্টা করে যাচ্ছিলো। কিছুদিনের মধ্যে তারাও পেটেন্ট করে ফেলে।

ঠিক সেই সময়ে এডিসন শুরু করলো ইউনিভার্সিটিতে টপ করা স্টুডেন্টদের ইন্টার্ন দেওয়া এবং রিসার্চারদের নিয়োগ দেওয়া। কাজ একটিই, তা হলো ফিলামেন্ট এর জন্য মেটারিয়ালের কম্বিনেশন খুঁজে বের করা। প্রায় ৬০০০ হাজারের বেশি ধরনের ফিলামেন্ট দিয়ে চেষ্টা করা হয়। কয়েকমাসের মধ্যে এডিসন নিজের নামে পেটেন্ট পায়, carbonized bamboo ফিলামেন্ট এর জন্য। এই ফিলামেন্ট প্রায় ১২০০ ঘণ্টা অবধি জ্বলতে পারতো। ১৮৮২ সালে Lewis Howard Latimer, এডিসন এর গবেষকদের একজন পুনরায় কার্বন ফিলামেন্ট নিয়ে কাজ করা শুরু করেন এবং ১৯০৩ সালে Willis R. Whitney (এডিসন এর গবেষকদের একজন) একটি পদ্ধতি বের করেন কিভাবে এই ফিলামেন্ট কে পুড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা যায়। তার পদ্ধতি প্রয়োগ করে বাল্ব কে প্রায় ৩০০০ ঘণ্টা চালানো যায়। তখনই এই কার্বন ফিলামেন্ট বাল্বকে এডিসনের নামে পেটেন্ট করা হয় যেখানে পেটেন্ট করার কথা ছিলো Joseph Swan এর নামে। ১৯১০ এর দিকে টাংস্টেন ধাতুর আবিষ্কার এর পরে কার্বন ফিলামেন্ট এর বদলে ব্যবহার শুরু হয় টাংস্টেন ফিলামেন্ট এর।

এখন সিদ্ধান্ত আপনার উপর, আপনি কাকে বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারক বলে মনে করেন।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close