নবায়নযোগ্য শক্তি
জনপ্রিয়

রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রঃপর্ব ২

কেন্দ্র থেকে বছরে ১৯.৩৪ বিলিয়ন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে

আগের পর্বে দেখা গেছে কিভাবে স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে।

এই কেন্দ্র থেকে বছরে ১৯.৩৪ বিলিয়ন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে যা প্রায় ৬ কোটি মানুষের বিদ্যুৎ চাহিদা মিটাতে সক্ষম।

আমাদের এই পর্বে আমরা এর নিরাপত্তা, শক্তির বিশালত্ব, পারমাণবিক চুল্লি নিয়ে জনমনে বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটাতে যাচ্ছি ।

প্রথমেই বলে রাখা ভালো যে, এই চুল্লিটির সার্বিক কাজ রাশিয়া করছে, কিন্তু বর্তমানে ভারত ও এর সাথে যুক্ত হবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, তারই পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষ জনবল সৃষ্টিতে প্রশিক্ষণ দিতে ভারতের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে, যেহেতু তাদের দেশে প্রায় ২২টি সক্রিয় চুল্লি রয়েছে, কিন্তু এর সম্পূর্ন ভার রাশিয়ার উপরে, ভারত শুধু রক্ষণাবেক্ষণ করে।

যাক সেসব কথা, এবার একটা ছবি দেখে নেওয়া যাক,

 

ছবিতে দেখানো হয়েছে রুপপুর এর  কেন্দ্রটিতে ৫ ধাপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে 

১. ফুয়েল পেলেট:

নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রথমটি হচ্ছে ফুয়েল পেলেট, যা অতি উচ্চ তাপমাত্রায় তার জ্বালানী বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারে। ফুয়েল পেলেট সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরী করা হয়, ফলে তেজস্ক্রিয়  ফিশন প্রোডাক্টসমূহ পেলেটের ভেতরে অবস্থান করে।

 

২. ফুয়েল ক্ল্যাডিং:

ফুয়েল পেলেটগুলো জিরকোনিয়াম অ্যালয়ের তৈরী ফুয়েল ক্ল্যাডিং দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। বিশেষ কোন কারণে সামান্য পরিমাণ ফিশন প্রোডাক্ট ফুয়েল পেলেট থেকে বের হয়ে আসলেও তা এই ক্ল্যাডিং এ ভেদ করতে পারবে না।

 

৩. রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল:

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের জন্য বিশেষ মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পুরু ইস্পাতের প্রেশার ভেসেল তৈরী করা হয় যা, উচ্চ তেজষ্ক্রিয় অবস্থাতেও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

 

৪. প্রথম কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং:

রিইনফোর্সড কনক্রিট দিয়ে ১.২ মিটার পুরুত্বের প্রথম কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং তৈরী করা হয়, যা যেকোন পরিস্থিতিতে তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখে।  

 

৫. দ্বিতীয় কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং:

নিরাপত্তা ব্যবস্থা অধিকতর জোরদার করার জন্য আধুনিক নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টগুলোতে  প্রথম কন্টেইনমেন্ট বিল্ডিং-এর পর আরও  ০.৫ মিটার পুরুত্বের আরও একটি কন্টেইনমেন্ট  বিল্ডিং যুক্ত করা হয় যা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিমান দুর্ঘটনা ইত্যাদি থেকে প্লান্টকে সুরক্ষা করে।

এই পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের কারণে মনুষ্য সৃষ্ট ঘটনা/দূর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন- শাক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, ভুমিকম্প, বন্যা ইত্যাদিও প্রভাব মোকাবেলায় সক্ষম থাকবে এই পারমাণবিক চুল্লি।

এই পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য ছাড়াও এই প্লান্টের ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে যাতে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পেও প্লান্ট নিরাপদ থাকবে।এছাড়া ৫.৭ টন পর্যন্ত ওজনের বিমানের আঘাতেও এটি অক্ষত থাকবে। 

সর্বশেষ প্রজন্মের অত্যাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্বলিত প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে রিঅ্যাক্টর বিল্ডিং থেকে ৮০০ মিটারের (এক্সক্লুসিভ জোন) বাইরেই স্বাভাবিক জীবন যাপন করা যাবে।

 

ভূমিকম্পে যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য এমন জায়গা নির্বাচন করা হয়েছে যা বাংলাদেশের নিম্ন ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত এছাড়াও এটি প্রায় ৩০ কিলোপ্যাসকেলের সম্মুখমুখী চাপ নিতে সক্ষম,

অবাক করার মত বিষয় যে, ১২০মি/সে বেগে আগত ঘূর্নিঝড়েও এর কিছু হবে না।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি?

না , বিগত ১০০ বছরে এ অঞ্চলের পানির উচ্চতা ১৪.৩২মিটার এর বেশী হয়নি, তবুও নিরাপত্তার কথা ভেবে এই কেন্দ্রের  উচ্চতা ১৯মিটার করা হয়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে পারমাণবিক নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, নির্বাচন করা হয়েছে বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে নিরাপদ ও সর্বাধুনিক রিঅ্যাক্টর VVER-1200 (AES 2006)

পাশেই তো পদ্মা নদী, তো কুলিং টাওয়ারের পানির চাহিদা মেটাতে গিয়ে পদ্মার কোন ক্ষতি হবে না তো?

সে আশংকা অমূলক,  কুলিং টাওয়ারের পানির চাহিদা ২.৬কিউবিক মিটার/সেকেন্ড যা কিনা শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার গড় পানি প্রবাহের(২৬৬কিউবিক মিটার/সেকেন্ড) তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলা চলে।

 বলা যায়,  রুপপুর কে ঘিরে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি গুলোর সাহায্যই নেওয়া হচ্ছে।

 

নির্গত তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবঃ

পরিবেশগত  ভাবে  নির্গত তেজস্ক্রিয়তার মানের তুলনায় অনেক কম পারমাণবিক চুল্লি থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয়তা, শতকরা প্রায় ১ ভাগেরও কম।

একবার এক্সরে, সিটি স্ক্যান করালে যে পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তার স্বীকার হতে হয়, সেটি অত্যন্ত ভয়ানক, তার তুলনায় সারাজীবন পারমাণবিক কেন্দ্রের পাশে বসবাস করা অনেক সেফ বলা চলে।

সর্বাক্ষনিক মনিটরিং এর মধ্যে রাখা হবে বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং এর আশেপাশের এলাকার তেজস্ক্রিয়তার মানে , কোনরূপ প্রব্লেম দেখা দিলে খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

কিভাবে এই প্ল্যান্ট কাজ করবে?

-আমরা জানি, ইউরেনিয়াম বিভাজনের ফলে প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়, এখানে তাপ বিকিরণকারী উপাদান হিসেবে ইউরেনিয়াম ডাই-অক্সাইড নামক ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয়। তারপর চেইন রিয়াক্টর বিক্রিয়া চালু করা হয় রিয়াক্টর চালুকরণের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম -২৩৫ ভাঙ্গার কাজ শুরু হয় ,তারপর ভাঙ্গা ইউরেনিয়ামের থেকে বের হয়ে আসা ক্ষণস্থায়ী কিছু নিউট্রন আশেপাশের ইউরেনিয়াম-২৩৫ বিভাজন শুরু করে, এভাবে প্রতি ধাপে শক্তি পাওয়া যায়।

 

উল্লিখিত রিয়াক্টর হেভি ওয়াটার এ প্রেশারাইজড অবস্থায় রাখা হয় ফলে ইউরেনিয়াম ভাঙার ফলে উৎপন্ন তাপে সেই পানি বাষ্পে পরিণত হয়, যা টার্বাইন ঘুরিয়ে জেনারেটর এর দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

আচ্ছা কিভাবে এর চেইন বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রন করা হবে?

বোরন / ক্যাডমিয়াম এর তৈরি কন্ট্রোল রড ব্যবহার করা হয় যা বিক্রিয়ায় অতিরিক্ত নিউট্রন শোষণ করে নিয়ে সাম্যবস্থা বজায় রাখে।

 

কিভাবে প্ল্যাণ্ট টি  শাটডাউন করা হবে?

-কন্ট্রোল রড টি পুরোটাই রিয়াক্টর এ ঢুকিয়ে দিয়ে নিউট্রন এর গতি একদম মন্থর করে দিয়ে বিক্রিয়ার গতি ০ করে দিবে,

আচ্ছা আমরা যে কুলিং টাওয়ারের উপরে যে সাদা ধোঁয়া  দেখতে পাই তা কি তেজস্ক্রিয় পদার্থ যুক্ত?

-না, সেটি স্রেফ বাষ্প ছাড়া কিছুই না।

প্রতি ৩ বছরে প্ল্যানমাফিক বড় মেরামত করা হয়।

শুধু ইউরেনিয়াম কেন ব্যবহার করা হয়?

– যে ইউরেনিয়াম পাওয়া যায় তা তিনটি আইসোটোপের মিশ্রণ(ইউরেনিয়াম২৩৪,২৩৫,২৩৮)

এদের মধ্যে একটাই , ইউরেনিয়াম ২৩৫ , পারমাণবিক রিয়াক্টরে নিউট্রনের সাথে ভালো করে বিভাজিত হয়, অর্থাৎ চেইন রিয়াকশন শুরু হতে দেয়

বিশ্বে আর কোন মৌল পাওয়া যায় না, যার মধ্যে বিভাজন উপযুক্ত আইসোটোপ আছে

??? ইউরেনিয়াম= ??? কয়লা/তেল?

      ১ কেজি পারমাণবিক জ্বলানি= ১০০টন উচ্চমানের কয়লা অথবা ৬০টন খনিজ তেল।

বলা যায়, একটি বড় পারমাণবিক রিয়াক্টর কয়েক বছর চালাতে গেলে মাত্র কয়েকটন ইউরেনিয়াম লাগবে।

 

সো বলা যায় , সর্বাধিক নিরাপত্তা নিয়েই কাজ করা হচ্ছে।

আশা করা যায় খুব ভালভাবেই কাজটি সম্পন্ন হবে।

TO CHECK PART 1, CLICK BELOW

রুপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যাণ্টঃপর্ব ১

আপনার মতামত লিখুন :

Back to top button
Close