মহাকাশ

মহাকাশ ও আমাদের অস্তিত্ব

একটি সুদূর বিস্তৃত মরুভূমিতে একটি মাত্র বালুকণা যতটা নগন্য, মহাবিশ্বে অামাদের অবস্থান তার থেকেও বেশি নগন্য

” Twinkle twinkle little star,How I wonder what you are!”

 

কবিতাটি শৈশবে পড়েনি, এমন ব্যক্তি খুবই কম পাওয়া যাবে। অতি সাধারণ মানুষরাও রাতের বেলায় বাসার ছাদে কিংবা কোনো নির্জন ফাঁকা জায়গায় বসে দূরের তারা দেখে বিষণ্ণতাকে দূরে ঠেলে দেয়।আবার যারা মহাকাশ নিয়ে একটু আধটু নাড়াচাড়া করে, তারা হয়ত রবি ঠাকুরের সেই গানের লাইন, “ওই যে সুদূর নীহারিকা,যারা পড়ে আছে ওই আকাশেরও নীল” মনে করে নীহারিকা নিয়ে ভাবতে বসে যাবেন। যদিও তারা দেখার মতো নীহারিকা দেখা এতো সহজ নয়।

আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে কথা বলতে হলে প্রথমে আমাদের জানতে হবে যে আমাদের জন্ম আসলে কবে হয়েছিল। যদি বলি আমাদের জন্ম আজ থেকে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে হয়েছিল, তাহলে হয়ত অনেক মানুষই হতবাক হয়ে পরবেন।  সত্যি বলতে আমাদের দেহের সকল পরমাণু ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পূর্বে সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর অআমাদের অস্তিত্ব অনেক সময় ধরে কোনো তারকার দেহের অংশবিশেষ হিসেবে বিরাজমান ছিল। তাই বলা হয়ে থাকে, আমরা সকলেই নক্ষত্রের সন্তান। শুধু তাই নয়, দৃশ্যমান বস্তুর সকল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা একই ভাবে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে গঠিত হয়েছিল বিগ ব্যাং এর কিছু সময় পরে।

মহাবিশ্ব আমাদের কৌতূহল মনকে যে কয়েকটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, তার মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হলো; মহাবিশ্বের কি শুরু আছে? আর শুরু থাকলে এর শেষ পরিণতি কি? আবার, মহাবিশ্ব অসীম নাকি সসীম? প্রথম প্রশ্নটির অর্ধেকাংশের উত্তর ‘বিগ ব্যাং‘ তত্ত্বের মাধ্যমে পাওয়া যায়। আর দ্বিতীয় প্রশ্নের ক্ষেত্রে একদল বিজ্ঞানী মনে করেন যে মহাবিশ্ব অসীম। আরেকদল বিজ্ঞানী মনে করেন মহাবিশ্ব সসীম।এই লেখায় বিগ ব্যাং, মহাবিশ্বের সুদূর ভবিষ্যৎ, মহাবিশ্বের কিছু আশ্চর্য, ওয়ার্ম হোল ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হবে।

বিগ ব্যাং:

মহাবিশ্ব সৃষ্টি তত্ত্বে বিগ ব্যাং বা বৃহৎ বিস্ফোরণ বিজ্ঞানীমহলে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য।রোমান ক্যাথলিক পুরোহিত বিজ্ঞানী লেমাইটার বিগ ব্যাং তত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা ছিলেন।বিগ ব্যাং তথ্যানুযায়ী বর্তমান মহাবিশ্বের সমস্ত ভর ও শক্তি একটি ক্ষুদ্র বিন্দুতে আবদ্ধ ছিল।এরপর বিস্ফোরণের মাধ্যমে তা প্রচণ্ড গতিতে চারদিকে ছড়িয়ে পরতে থাকে।এখনও মহাবিশ্বের বাইরের দিকের বস্তুগুলো প্রচণ্ড গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা যদি সময়কে পিছনের দিকে নিয়ে যেতে থাকি, তাহলে বুঝতে পারব যে একসময় সকল বস্তু একসাথে আবদ্ধ ছিল। এই যুক্তি উপস্থাপন করেও বিগ বন্য তত্ত্বের সত্যতা যাচাই করা যায়।

মহাবিশ্বের সৃষ্টি:

বিগ ব্যাং সংগঠিত হবার মুহূর্তে মহাবিশ্বটা কেমন ছিল তা এখনো উদঘাটন করা সম্ভব হয় নি। কারণ, প্রারম্ভিক অবস্থায় সেই বিন্দুর ঘনত্ব এবং তাপমাত্রা ছিল অসীম। এই সময়টাকে বলা হয় ব্যতিক্রমী অবস্থা।এই অবস্থায় পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্রগুলো ভেঙে পড়ে।এই ব্যতিক্রমী অবস্থার স্থায়িত্বকাল ছিল মাত্র ১০^(-৪৩) সেকেন্ড।একে প্ল্যাঙ্ক কাল বলা হয়।এরপর অতিস্ফীতি ঘটে যার ফলে মহাবিশ্বের আয়তন মিলিয়ন মিলিয়ন গুন বেড়ে যায়।প্ল্যাঙ্ক কালে মহাবিশ্বের তাপমাত্রা ছিল ১০^৩২ কেলভিন।

পরমাণু সৃষ্টি:

বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন ভর ও শক্তি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কোনো নক্ষত্রের কেন্দ্রীয় সংশ্লেষে ভর যেমন শক্তিতে রূপান্তর হয়, তেমনি শক্তি থেকেও ভরে রূপান্তর হতে পারে।এক জোড়া কণা-প্রতিকণার সংঘর্ষে যেমন ফোটন উৎপন্ন হয়, তেমনি দুটি ফোটন কণার সংঘর্ষেও কণা-প্রতিকণা সৃষ্টি হয়।মহাবিশ্বের বয়স যখন মাত্র ৩ মিনিট, তখন এরূপ ভাঙা-গড়ার খেলা বন্ধ হয় এবং ততক্ষণে ইলেকট্রন,প্রোটন, নিউট্রন সৃষ্টি হয়ে যায়।এখানে কণা ও বিপরীত কণার ক্ষয়প্রাপ্তির হারে কিছুটা তারতম্য দেখা যায় যার ফলে বিপরীত কোয়ার্কের চেয়ে কোয়ার্কের পরিমাণ বেশি থাকে।

বিগ ব্যাং তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা:

বিগ ব্যাং তত্ত্ব আমাদের মহাবিশ্ব সৃষ্টির ব্যাপারে মোটামুটি ভালো ধারনা দিতে পারলেও এই তত্ত্ব আমাদের মহাবিশ্বকে সম্পূর্ণ রূপে ব্যাখ্যা করতে পারে নি। তাই এই তত্ত্বের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

১/বিগ ব্যাং তত্ত্ব ক্ষুদ্র বিন্দুর বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্ব সৃষ্টির কথা বললেও সেই বিন্দুটি কোথা থেকে এলো তা এখনো জানা যায় নি।

২/বিগ ব্যাং তত্ত্ব প্ল্যাঙ্কের সময়ের সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারে নি।

৩/সুদূর ভবিষ্যতে মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি কি হবে, তা জানা যায় নি।

ভবিষ্যতঃ

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি কি হবে এই ব্যাপারে এখনো কোনো প্রমাণিত তত্ত্ব আবিষ্কার হয় নি।তবে বিভিন্ন বিজ্ঞানী কয়েকটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। এদের মধ্যে ‘বিগ ক্রাঞ্চ’ তত্ত্ব, ‘বিগ ফ্রিজ’ তত্ত্ব অন্যতম।এই সকল তত্ত্বের মধ্যে বিগ ক্রাঞ্চ তত্ত্ব সবচেয়ে বেশি আলোচিত।এই তথ্যানুযায়ী মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে হতে এক পর্যায়ে তার প্রসারণ থামিয়ে দেবে এবং শুরু হবে মহা সংকোচন। এই সংকোচন অব্যাহত থাকতে থাকতে মহাবিশ্ব পুনরায় বিগ ব্যাং এর অবস্থায় চলে যেতে পারে।

মহাবিশ্বের বিশালতাঃ

আমাদের অনেকের মধ্যেই মনে প্রশ্ন জাগে যে আমাদের মহাবিশ্বটা আসলে কত বড়।একটি সুদূর বিস্তৃত মরুভূমিতে একটি মাত্র বালুকণা যতটা নগণ্য, মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান তার থেকেও বেশি নগণ্য।পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব ১৫ কোটি কি.মি.।আলো ১ সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কি.মি. পথ অতিক্রম করতে পারে।সেই হিসেবে সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ৮ মিনিট ১৭ সেকেন্ড।আকাশের নক্ষত্ররাজি দেখলে মনে হয় তারা যেন পরস্পর অনেক কাছাকাছি রয়েছে।আসলে এমনটি নয়।আমাদের সূর্যের সবথেকে কাছের নক্ষত্রের নাম হলো আলফা-সেন্ট্রি যার দূরত্ব ৪.২ আলোকবর্ষ দূরে।তার মানে আলোর গতিতে ছুটলেও সবথেকে কাছের নক্ষত্রে যেতে অআমাদের ৪ বছরেরও বেশি সময় লাগবে।এরকম বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র নিয়ে অআমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি গঠিত।গ্যালাক্সি হলো এমন এক স্থান যেখানে কোটি কোটি তারা এবং গ্যাস মহাকর্ষীয় প্রভাবে নিদিষ্ট স্থানে অবস্থান করে।আমরা যেই গ্যালাক্সিতে অবস্থান করছি তার নাম মিল্কিওয়ে যা ১ লক্ষ আলোকবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত।মিল্কিওয়ের সবথেকে কাছের গ্যালাক্সির নাম অ্যান্ড্রোমিডা যা ২.৫ মিলিয়ন অআলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত।এই গ্যালাক্সি গুলো মহাবিশ্বে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরে বেড়ায়।গ্যালাক্সি গুচ্ছকে বলা হয় গ্যালাক্সি ক্লাস্টার।আবার গ্যালাক্সি-গুচ্ছ সমূহ দৃঢ় ভাবে বাক্স বন্দি অবস্থায় থাকে, যাকে সুপার ক্লাস্টার বলে।আমাদের মিল্কিওয়ে লানিয়াকিয়া সুপার ক্লাস্টারে অবস্থিত।তাহলে সহজেই বুঝতে পারছি যে আমাদের আবাসভূমি পৃথিবী কতটা হাস্য রকম ক্ষুদ্র।

মহাবিশ্বের কিছু বিস্ময়

ব্ল্যাক হোলঃ

মহাবিশ্বের বিস্ময় কথা বলতে গেলে প্রথমেই ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণবিবরের কথা মাথায় আসে।ব্ল্যাক হোল এমন এক মহাবিশ্ব যার মহাকর্ষ ক্ষেত্র এতটাই শক্তিশালী যে সেখান থেকে আলোও বের হয়ে আসতে পারে না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন প্রায় সকল গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটি বিশাল ভর বিশিষ্ট ব্ল্যাক হোল থাকে।আমাদের মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে যে ব্ল্যাক হোলটি রয়েছে তার নাম “Sagittarious A”। এছাড়া আমাদের সবথেকে কাছের ব্ল্যাক হোলের নাম “V616” যা ৩০০০ আলোকবর্ষ দূরে।যে সকল মৃত নক্ষত্রের ভর আমাদের সৌর ভরের দেড় গুনের চেয়ে বেশি,তারাই ব্ল্যাক হোলে রূপ নিতে পারে। আমাদের মিল্কিওয়েতে ছোট বড় প্রায় ১ মিলিয়নের বেশি ব্ল্যাকহোল রয়েছে।

ওয়ার্ম হোলঃ

ব্ল্যাক হোলের পর আসি ওয়ার্ম হোলের ব্যাপারে।যদিও ওয়ার্ম হোলের অস্তিত্বের কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায় নি।তবে অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন আমাদের মহাবিশ্বে এমন কিছু সহজ রাস্তা থাকতে পারে যার মাধ্যমে আমরা অন্য মহাবিশ্বে প্রবেশ করতে পারব অথবা মহাবিশ্বের অনেক দীর্ঘ পথ ছোট করে অল্প সময়ে পাড়ি দিতে পারব।

ডার্ক ম্যাটার:

আমরা অনেকেই জানি যে যার ভর রয়েছে সে স্থান কালকে বাকিয়ে দেয়।বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন যে মহাবিশ্বের কিছু কিছু জায়গায় দৃশ্যমান পদার্থ না থাকা সত্ত্বেও সেসকল স্থানের স্থান কাল বেঁকে যাচ্ছে।আর স্থান কাল বেঁকে যাচ্ছে মানে সেখানে অবশ্যই ভর রয়েছে।কিন্তু বিজ্ঞানীরা অনেক চেষ্টা করেও তার কোনো সঠিক নিদর্শন পান নি। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিলেন ডার্ক ম্যাটার।অর্থাৎ, ডার্ক ম্যাটার এমন এক বিস্ময় যা দেখা যায় না কিন্তু এর অস্তিত্ব অনুভব করা যায়।স্টিফেন হকিং ধারণা করেন,নিউট্রিনো এবং বিপরীত নিউট্রিনো পরস্পরকে ধ্বংস করতে পারে নি।এই সকল কণার বর্তমানে অস্তিত্ব থাকার কথা।এরাও ডার্ক ম্যাটার হতে পারে। এছাড়া গ্যালাক্সি গুলোর বাইরের দিকের নক্ষত্রগুলোর অস্বাভাবিক গতিবিধিও ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতির কারণে হয়ে থাকে বলে ধারণা করা হয়।

তথ্যসূত্রঃ

1. A Brief History Of Time by Stiphen W. Hawking

2.http:/www.astronomy.com/

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close