নবায়নযোগ্য শক্তিপরিবেশ
জনপ্রিয়

গোলাকার সৌরকোষ কি পারবে সমতল সৌরকোষকে টেক্কা দিতে?

গবেষকদের সর্বাধুনিক গবেষণা অনুযায়ী, সাধারণ সৌরকোষ অপেক্ষা গোলাকার সৌরকোষ তুলনামূলক বেশি শক্তিকে আবদ্ধ করতে পারে। তাই, একটি গোলাকার নকশার সৌর কোষ সাধারণ সমতল কোষ থেকে বেশি সুবিধা দেয়। তবে অদূর ভবিষ্যতেই গোলীয় সৌরকোষ দ্বারা সমতল সৌরকোষের ব্যবহারের সকল ক্ষেত্র প্রতিস্থাপিত হবে না এমনটাই বিজ্ঞানীরা আভাস দিয়েছেন। তবে তাদের মতে একে উপযুক্ত জায়গামত কাজে লাগাতে পারলে অনেক কিছুই আশা করা সম্ভব গোলীয় সৌরকোষ থেকে।  

একথা বর্তমানে নতুন করে প্রমাণের কিছু নেই যে, অনবায়নযোগ্য শক্তির দিন দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে এবং আমাদের যত দ্রুত সম্ভব নবায়নযোগ্য শক্তির উপর নির্ভর করতে হবে। আর সেটা করতে হবে আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের কথা চিন্তা করেই। আমাদের পরিবেশের কথা চিন্তা করে, এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখার চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে, এই উদ্ভুত পরিস্থিতিতে এছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো বিকল্প নেই। এখন, নবায়নযোগ্য শক্তির যে উৎসগুলো আমরা ব্যবহার করতে পারি, তার মধ্যে সোলার এনারজি বা সৌরশক্তি অন্যতম। এই সৌরশক্তি আমরা পাই সোলার সেল বা সৌরকোষ থেকে।

A typical solar cell picture
একটি গতানুগতিক ফ্ল্যাট বা সমতল সৌরকোষ । Image Source: New Atlas

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার ভাষ্যমতে, সোলার সেল বা সৌরকোষ হল এমন এক ফটোভোল্টাইক কোষ যে কিনা সূর্যালোককে সরাসরি তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে। বেশিরভাগ কোষেই সিলিকন ব্যবহৃত হয়। এগুলো নন ক্রিস্টালাইন, ক্রিস্টালাইন এমনকি পলি ক্রিস্টালাইনও হতে পারে। এগুলো তৈরির সময় কর্মদক্ষতা বা এফিসিয়েন্সির কথা চিন্তা করে বানানো হয়। এতদিন আমরা সচরাচর ফ্ল্যাট বা সমতল সৌরকোষই দেখে আসছি, যদিও বিজ্ঞানীরা নতুন কিছু উদ্ভাবনের চেষ্টা করে চলেছেন অবিরত। সেই সূত্র ধরে, এই খাতও পিছিয়ে নেই। একদল প্রকৌশলী এবং গবেষক চেষ্টা চালাচ্ছেন গোলাকার সোলার সেল বানানোর। আর তারা এর ভবিষ্যতও বেশ উজ্জল বলেই মনে করছেন।

সমতল সৌরকোষের প্রধান সীমাবদ্ধতা হল, এরা সূর্যালোকের সম্পূর্ণ ব্যবহার করতে পারে না। গোলীয় কোষের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা সহজেই দূর করা সম্ভব কোনো অতিরিক্ত যন্ত্রপাতি না লাগিয়েই। এই সম্ভাবনাকে সামনে তুলে ধরেছেন একদল সৌদি গবেষক। তাদের উদ্ভাবিত এই নতুন গোলীয় কোষ বেশ ছোট, হাতের ভেতর করেই বহন করা সম্ভব। প্রায় পিং পং বলের মতই হ্যান্ডি (বহনে সুবিধা) আর চমৎকার এই কোষ। ইনডোর এক্সপেরিমেন্টে দেখা গেছে, এর ব্যাকগ্রাউন্ডে কী রাখা হচ্ছে তার উপর ভিত্তি করে এই গোলীয় কোষ সমতলের চেয়ে ১৫ থেকে ১০০ শতাংশ বেশি শক্তির যোগান দেয়। প্রাকৃতিকভাবে উন্নতি সাধন করা এই প্রযুক্তির ব্যাপারে গবেষক দল বেশ আশাবাদী।

A huge solar power generator
একটি বৃহদাকার গোলীয় সৌরকোষ । Image Source: Alternative Energy News

সৌদি আরবের প্রকৌশলী এবং পদার্থবিদদের দলটি যে গোলাকৃতির সৌর কোষ তৈরি করেছে তা কোনো ধরণের লাইট ট্র্যাকিং ডিভাইসের সাহায্য ছাড়াই বিভিন্ন দিক থেকে সূর্যের আলোকে আবদ্ধ করতে পারে। গবেষকরা বলেছেন যে, তাদের প্রযুক্তি আগে তৈরি করা গোলাকার কোষগুলির চেয়ে আরও সরল মেকানিজমে কাজ করে এবং আরও দক্ষতার সাথে সূর্যের আলোকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে। এর অনবদ্য আকার কর্মদক্ষতাকে বাড়িয়ে তাপ-অপচয়কে রোধ করে এবং এর মাধ্যমে অধিক পরিমাণে কোষের বিদ্যুৎ উত্পাদন করে থাকে। সাথে সাথে এটি ধুলাবালি জমা হ্রাস করে পরিষ্কারের ব্যয়কেও সাশ্রয় করে। 

A sphelar spherical solar cell
এই ধরণের সৌরকোষকে বলা হয় স্ফেলার স্ফেরিক্যাল সোলার সেল । Image Source: Inhabitat

বিজ্ঞানীরা মনোক্রিস্টালাইন সিলিকন ব্যবহার করে কোষটির একটি প্রোটোটাইপ (নমুনা) তৈরি করেছিলেন। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী কোষের নিচে বালি, সাদা কাগজ বা অ্যালুমিনিয়াম কাপের মতো হালকা প্রতিবিম্বক উপকরণ রাখার মাধ্যমে এর পাওয়ার আউটপুট একই ঘরানার প্রথাগত ফ্ল্যাট (সমতল) কোষগুলোর চেয়ে বহুলাংশে বাড়ানো যেতে পারে। সৌদি আরবের কিং আবদুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (KAUST) বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী মুহাম্মদ মোস্তফা হুসেনের মতে,

এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাসা-বাড়ি ও অফিসের ছাদে ব্যবহারের উপযোগী করে একটি ছোট অঞ্চল থেকে আরও বিদ্যুৎ উত্পাদন করা সম্ভব হবে।

হুসেন ও তার দল এই কোষের উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য একটি সাধারণ, স্বয়ংক্রিয় উত্পাদন প্রক্রিয়া বিকাশের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। 

এই দলেরই একজন সদস্য, কিং আবদুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (KAUST) মাইক্রোসিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন পোস্ট ডক্টরাল গবেষক, নাজেক এল আতাব বলেন,

এই কোষের বিশেষত্ব হল এতে মাছির বহুমুখী চোখের মত রিসেপ্টর লাগানো আছে। মাছি যেমন আনুভূমিক বরাবর কৌণিক ভাবে ২৭০ ডিগ্রি পর্যন্ত দেখতে সক্ষম, ঠিক তেমনই এই কোষও বহুমুখী ভাবে সূর্যালোক গ্রহণ করতে সক্ষম।

এই সোলার সেল ডিজাইন করতে গিয়ে এল আতাব এবং তাঁর সহকর্মীগণ তাদের পূর্ববর্তী উদ্ভাবন ব্যবহার করছেন। আর তা হল কীভাবে থিনার প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফ্লেক্সিবল সোলার সেল বানানো যায়, এ ব্যাপারে একটি থিসিস পেপার লিখে বিখ্যাত ক্যাম্ব্রিজ জার্নালে রিভিউয়ের জন্য জমাও দিয়েছেন।

A spherical solar cell
গবেষণাকেন্দ্রে গোলীয় সৌরকোষ | Image Source: IEEE Spectrum

গবেষক দল সোলার সিমুলেটর ল্যাম্পের সাহায্যে ইনডোর পরীক্ষা করে দেখেছেন, গোলীয় সোলার সেলে সমতল সেলের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি পাওয়ার আউটপুট পাওয়া যায়। এই মান বেড়ে ৩৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকে যখন উভয় সেলকেই উত্তপ্ত করা হয়। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এই গোলীয় সেলে তাপের নির্গমন বা নিষ্কাশন ব্যবস্থা অপেক্ষাকৃত ভালো। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এই শতকরা হার বেড়ে ৬০ শতাংশে যায়, যখন এই পরীক্ষণ সিমুলেটর দ্বারা উৎপন্ন সূর্যের বিক্ষিপ্ত আলো সদৃশ তরঙ্গের সাপেক্ষে করা হয়। কিন্তু এক্সট্রা ব্যাকগ্রাউন্ড যোগ করলে এই হার অনিয়মিত হারে বাড়তেই থাকে। অ্যালুমিনিয়াম কাপ বা কাঁচ বা বালি ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে যোগ করলে গোলীয় সেল সমতল সেলের তুলনায় আশ্চর্যজনকভাবে ১০০ শতাংশ বেশি পাওয়ার সাপ্লাই দিয়েছে।

সৌদি দলটি শেষমেশ মনো ক্রিস্টালাইন সিলিকন দিয়ে এই সেল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন, যার মাধ্যমেই বর্তমান বিশ্বের ৯০ শতাংশ সোলার সেল তৈরি। এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হল, সারা বিশ্বে এই নতুন প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেয়া। এতে করে প্রোডাকশন বাড়বে, সাথে সাথে দামও সাধ্যের মধ্যে নেমে আসবে।  

a typical spherical solar cell
একটি গোলীয় সৌরকোষের মডেল । Image Source: IEEE Spectrum

এই গবেষণায় জড়িত নন এমন একজন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌরকোষ বিকাশের বিশেষজ্ঞ ঝেনকিয়াং মা বলেছেন,

গোলাকৃতির সৌরকোষগুলো তাদের নতুন নান্দনিক স্থাপত্য এবং আকর্ষণীয় ডিজাইনের জন্য অবশ্যই বিজ্ঞানমহলে এবং প্রযুক্তিগত সম্প্রদায়ের কাছে অধিক মনোযোগের দাবি রাখে। তারা সমতল কোষগুলোকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে কিনা সেটা ভবিষ্যতের জন্য প্রশ্ন হয়ে উঠবে, কারণ তাদের প্রতিষ্ঠিত প্রযুক্তির সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে। তবে, সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলোতে এই গোলীয় কোষগুলো নিজেদের চিহ্নিত করতে পারে, যেখানে ভূমি থেকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়। যেখানে ধূলিকণা জমে থাকা একটি বড় সমস্যা এবং যেখানে ধারাবাহিকভাবে সূর্যের আলো ট্র্যাক করা একটি ব্যয় উদ্বেগের বিষয় সেইসব জায়গায় এর ব্যবহার যথেষ্ট কার্যকর করা সম্ভব।

তাই এতসব আলোচনার শেষে আমরা এটুকু আশ্বস্ত হতেই পারি যে, সামনের দিনগুলোতে গোলীয় সৌরকোষের ব্যবহার দিনকে দিন বাড়তেই থাকবে।

তথ্যসূত্রঃ

  1. Nature Middle East
  2. IEEE Spectrum

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Back to top button
Close