ইতিহাসবিবিধ
জনপ্রিয়

পিরামিড তৈরির রহস্য!

সব থেকে বৃহৎ পিরামিড নির্মিত হয় ২৫৫০ খ্রিষ্টপূর্বে যার উচ্চতা ৪৫০ ফুটেরও বেশি।

পিরামিড! নাম শুনলেই ভেসে উঠে নীলনদ সহ পুরো মিশরের ছবি, মনে পড়া যায় মমির কথা, কানে বাজে আরব্য রজনীর সুর, আরো কত কী! মানবসভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় নিদর্শন হলো পিরামিড। আজ থেকে প্রায় ৪৫০০ বছর আগে নির্মিত হলেও তা বিজ্ঞানীদের মাথাকে ঘোরাচ্ছে এখনও, কীভাবে মিশরীয়রা এই অদ্ভুত সুন্দর, রহস্যময় জিনিস তৈরি করল।
প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার অনেক কিছুই পিরামিডের মধ্যে লিখিত রয়েছে। তাঁদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, সমাজ সবকিছুই গিজার পিরামিডের দেয়ালে ছবি আকারে বা হায়রোগ্লিফিক বর্ণে লিপিবদ্ধ। প্রাচীন মিশরকে জানার জন্য বিজ্ঞানীদের কাছে এর থেকে বড় উৎস আর কিছু হতে পারেনা। কিন্তু একটা বিষয়ে মিশরীয়রা বরাবরই চুপ থেকেছে। সেটি হলো কীভাবে পিরামিড তৈরি হলো। এ বিষয়ে কোথাও স্পষ্ট করে কোনো প্রমাণ তাঁরা রেখে যায়নি। এটি এমন এক রহস্য যা হাজার বছর ধরে ইতিহাসবিদদের মাথার চুল ছিঁড়েছে, তাঁদের ভাবিয়েছে। অনেক বছরের বিতর্কের পর, হয়তবা এবার প্রত্নতত্ত্ববিদরা খুঁজে পেয়েছেন এই রহস্যময় পিরামিড গুলো কীভাবে তৈরি হয়েছে।

যেখানে ধাঁধাঁর শুরু!

বর্তমান যুগের প্রকৌশল আর স্থাপত্য শিল্পে আমরা যা দেখি তা নিতান্তই স্বাভাবিক। কিন্তু পিরামিডীয় যুগে যদি এসবের দেখা পাওয়া যায় তবে সেটা নিতান্তুই হবে ভৌতিক! কারণ আধুনিক সভ্যতার প্রযুক্তি তখনকার যুগে থাকার কথা না। যেমন, চাকা। ৯০ টন ওজনের পাথরের ব্লক এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেয়া চাকার সাহায্য ছাড়া খুবই কঠিন। তাঁদের কাছে ক্রেন সদৃশ কোনো যন্ত্র ছিল না, ছিল না লোহার জিনিস মসৃণ করে সূক্ষ্মভাবে তৈরি করার মত প্রযুক্তি।
Khufu, সব থেকে বৃহৎ পিরামিড নির্মিত হয় ২৫৫০ খ্রিষ্টপূর্বে যার উচ্চতা ৪৫০ ফুটেরও বেশি। আর যে সকল পাথরের ব্লক দ্বারা নির্মিত হয়েছে সেগুলোর কথা তো উপরেই বললাম। এবং ৪৫০০ বছরের ঝড়, দুর্যোগ সহ্য করে এখনও টিকে আছে! অথচ এই পিরামিড গুলো এতটা সূক্ষ্মভাবে মাপজোখ নিয়ে নির্মিত হয়েছে, দেখে মনে হবে বর্তমান সময়ের কোনো কারিগর সেখানে সময় পরিভ্রমণ করে গিয়ে তৈরি করে দিয়ে আসছে!

Pyramid of Khufu

উত্তেজনাপূর্ণ বিতর্কঃ যেভাবে পিরামিড তৈরি হলো

এত বিশাল পাথরগুলো কীভাবে দূর থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল সেটা বের করতে গিয়ে কিছু গবেষক ধারণা করেন হয়তবা আদি মিশরীয়রা ওগুলোকে মরুভূমির মধ্য দিয়ে টেনে নিয়ে এসেছে। যদিও তখন কোনো চাকা বা circular shape এর কোনো বস্তু ছিলনা তাও তাঁরা অনুমান করেছিলেন হয়ত গাছের শাখা কেটে সেগুলোতে রেখে টেনে নিয়ে এসেছে। মোটামুটি ছোটো বা মাঝারি আকৃতির পাথরের ব্লকের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এরকম ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু বড় আকৃতির কিছু পাথরের ক্ষেত্রে এই জিনিসটা একেবারেই অসম্ভব! কিন্তু এই থিওরীর আদৌ কোনো প্রমাণ আসলে নেই বা চিত্রকর্ম থেকেও টেনে পাথর নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কোনো হদিস উল্লেখ করা হয়নি যে এ কাজটা এরকমই করা হয়েছিল।

তারপর আসে এত ভারী পাথর নিরবচ্ছিন্নভাবে উঁচু হওয়া পিরামিডের উপরে তোলা। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদরা, যারা জন্মগ্রহণ করেন পিরামিড নির্মাণের শেষে, তাঁরা ভাবতেন মিশরীয়রা এ ক্ষেত্রে ঢালু কোনো তল ব্যবহার করত সিঁড়ির মতো যেটাকে বলা হয় ramp. কিন্তু গবেষকরা দেয়ালের ভেতর অদ্ভুত বাতাসের জন্য ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা দেখে ভাবলেন যদি ramp থাকেও তা ছিল ভেতরের দিকে তাই বাহিরে সেটার অস্তিত্ব প্রমাণের কোনো লক্ষণ ছিলনা।
যাইহোক, দিনশেষে কোনো আইডিয়া বা যুক্তিই সমাধানের আলো দেখা পেল না।

অবশেষে চমকপ্রদ কিছু সমাধান যা কড়া নাড়ে সব বিতর্কে!

হঠাৎই দুটি চমকপ্রদ সম্ভাবনা আলোর দেখা পায়। একটি হচ্ছে, একদল ডাচ গবেষক যখন পুনরায় মিশরীয় চিত্রকর্মের দিকে লক্ষ্য করেন তখন দেখেন শ্রমিকরা স্লেজের মতো করে কিছু টেনে নিচ্ছে এবং সামনে আরেকজন কিছু একটা ঢেলে দিচ্ছে। তাঁরা বুঝতে পারলেন এটা কোনো আচার- ঐতিহ্য নয়, এখানে বালুতে পানি ঢালা হচ্ছে যে পথ দিয়ে পাথর গুলো নিয়ে যাওয়া হবে। ফ্লুইড মেকানিক্সের নীতি অনুযায়ী তরল ঘর্ষণ কমায়। এখানে পানি ঢাললে বালু পিচ্ছিল হবে এবং খুব সহজেই বিশাল পাথরের ব্লক সামনে নিয়ে যাওয়া যাবে। সেই দল এই থিওরির সাপেক্ষে নিজেদের রেপ্লিকা বা মডেল তৈরি করে ব্যাপারটা বাস্তবে প্রয়োগ করল। আর ফলাফল? এই উপায়ে আরো বিশাল পাথরের ব্লক নিয়ে যাওয়া সম্ভব যা হয়ত ইতিহাসবিদ বা প্রত্নতত্ত্ববিদরা চিন্তাও করেন নি।
শুধু তাই নয়, Egyptologist Mark Lehner, যিনি কিনা একজন দক্ষ গবেষক আরেকটি থিওরি উন্মোচন করলেন।
এমনিতে পিরামিড কায়রো শহরের মধ্যে বিশাল মরুভূমিতে অবস্থিত। কিন্তু প্রাচীন কালে নীলনদের শাখা উপশাখা শহরজুড়ে বিস্তৃত ছিল। এবং এভাবে কোনো গতিপথ গিয়েছিল পিরামিডের পাশ দিয়ে যেখানে নির্মাণ কাজ চলছিল। হয়ত মিশরীয়রা নৌকাতে করে পাথর গুলো নিয়ে আসা যাওয়া করত এবং সেখানে বন্দর ছিল যেখানে পাথর নৌকা থেকে রাখা হতো। ঠিক যেন পাজলের টুকরো টি জায়গামত বসল!

Mark Lehner

এবং আরেকটি রহস্যের উন্মোচন…

Mark Lehner এর খনন আরেকটা বিষয়কে আলোকপাত করে, সেটা হচ্ছে দাস শ্রমিকেরা। এরা ছিল প্রচন্ড দক্ষ কারিগর এবং মমি নির্মাণে সুনিপুণ। তাঁদের প্রচুর পরিমাণে মোহরানা দেয়া হতো। এমনকি পিরামিডের আশেপাশে খনন কালে ১৯৯৯ সালে পাওয়া যায় “পিরামিড সিটি” যেখানে শ্রমিকদের বাসা বাড়ি নির্মাণ করে দেয়া হয়েছিল। পাশে পাওয়া গিয়েছিল একটা কবরস্থান যেখানে কাজে নিহত হওয়া শ্রমিকদের কবর দেয়া হতো। আরেকটি কারণে বুঝা যায় এরা প্রচুর দক্ষ ছিল সেটি হচ্ছে এরা কী পরিমাণ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজগুলো করত। কারণ স্বভাবতই আপনি একটি কাজে এক্সপার্ট না হলে সেটি যত সহজই হোক পা বাড়াবেন না কিন্তু তাঁরা ছিল অসম্ভব মাত্রায় সাহসী। কেন এতটা ঝুঁকি নিয়ে কাজগুলো করত সেটাও এখনও রহস্য।…
আজ আমরা জানলাম পিরামিডের তৈরি রহস্যের সমাধানের একটা প্রবল সম্ভাব্য দিক নিয়ে। এই জানার কোনো শেষ নেই। খনন হচ্ছে, আরো হবে এবং একদিন হয়ত পুরো পিরামিডের রহস্যই আমরা উদঘাটন করে জানতে পারব। কে জানি কী চমক লুকিয়ে আছে!

তথ্যসূত্রঃ allthatsinteresting

Map of Giza Pyramid Complex

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close