মহাকাশ

আমাদের সৌরজগৎ(পর্ব ৫)ঃ বলয় রাজ শনি!

শনি গ্রহের কথা মাথায় আসতেই যে বিষয়টা আমাদের মাথায় খেলা করে তা হলো বিখ্যাত বলয়। হ্যাঁ, আজ সেই বলয় রাজকে নিয়েই থাকছে বিভিন্ন তথ্য ও সন্নিবেশ। শনি হচ্ছে সৌরজগতে সূর্য থেকে দূরত্বের হিসাবে ষষ্ঠ এবং ২য় বৃহত্তম গ্রহ। এটাই সবচেয়ে দূরবর্তী গ্রহ যা পৃথিবী থেকে খালো চোখে দেখা যায়। তবে এর বলয় গুলো দেখার জন্য মোটামুটি মানের একটা টেলিস্কোপের দরকার হবেই। যদিও অন্য গ্যাস দানব তথা বৃহস্পতি, ইউরেনাস এবং নেপচুনের বলয় আছে, তা সত্ত্বেও শনির বলয় গুলো অত্যন্ত বিশাল, বিস্তৃত এবং শক্তিশালী ভাবে দৃশ্যমান, যার ফলে এর নাম হয়েছে বলয় রাজ!

শনি গ্রহও একটি গ্যাস দানব যা তৈরি হয়েছে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম গ্যাস দ্বারা। শনির আয়য়তন পৃথিবী থেকে ৭৬০ গুণ বেশি এবং সৌরজগতের দ্বিতীয় বিশাল গ্রহ। এর ভর প্রায় পৃথিবীর ভরের ৯৫ গুণ। শনির ঘনত্বের হিসাব দিতে গেলে এমন হবে যে, যদি কোনো বিশাল বাথটাব বা চৌবাচ্চা বানানো যেত গ্রহটিকে ধারণ করার জন্য তাহলে তাও গ্রহটি সেখানে ভেসে থাকত।

হলুদ এবং সোনালী রঙের যে ব্যান্ড আমরা দেখতে পাই শনির বায়ুমণ্ডলেসেগুলো হচ্ছে অতি দ্রুত বায়ু প্রবাহের মধ্যে সূর্যের উত্তাপের ফল। উপরের বায়ুমণ্ডলীয় স্তরে বাতাস প্রায় ঘন্টায় ১৮০০ কিলোমিটার বেগে ছুটে যেতে পারে। প্রতি সাড়ে দশ ঘন্টায় শনি নিজের অক্ষে একবার ঘূর্ণন সম্পন্ন করে! এত দ্রুত ঘূর্ণনের ফলে শনির বিষুবীয় অঞ্চল একটু চ্যাপ্টা এবং মেরুগুলো সমতল রূপ ধারণ করেছে। গ্যালিলিও গ্যালিলি ১৬১০ সালে প্রথম শনির বলয় দেখতে পান টেলিস্কোপ ব্যবহার করে। তিনি তখন সেটিকে হাতলের মত আকারের দেখতে পান। ৪৫ বছর পর ডাচ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্রিস্টিয়ান হাইগেন নিজের শক্তিশালী টেলিস্কোপ ব্যবহার করে শনি পর্যবেক্ষণ করেন এবং নিশ্চিত হোন শনির বলয় সম্পর্কে। দিনে দিনে প্রযুক্তি উন্নত হতে থাকে, বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ভাবে এখন শনির বলয় গুলো নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। শনির অনেক গুলো বলয় রয়েছে যা তৈরি বরফ এবং পাথর দ্বারা। এই উপাদান গুলোর আকৃতি চিনির দানা থেকে শুরু করে একটি বিশাল ফুটবল মাঠের সমান পর্যন্ত হতে পারে। ধারণা করা হয় এই পাথুরে উপাদান গুলোর আবির্ভাব হয়েছিল বিভিন্ন  ধূমকে্তু, উল্কাপিণ্ড এবং উপগ্রহের সংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি হওয়া ধ্বংসাবষেষ থেকে।

সবথেকে বড় যে বলয় সেটি শনির ব্যাসার্ধ থেকে সাত হাজার গুণ বেশি বৃহত! প্রধান বলয় গুলোর পুরুত্ব প্রায় ৩০ ফুট বা ৯ মিটার হইয়ে থাকে। কিন্তু ক্যাসিনি-হাইগেন মহাকাশযানের অনুসন্ধান থেকে দেখা যায় কিছু কিছু বলয়ের উলম্বিক উচ্চতা ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। বলয়গুলোকে বর্ণ ক্রমানুসার ভিত্তিক সাজানো হয়েছে। সবচেয়ে ভেতরের দিকে থাকা অত্যন্ত হালকা বলয় টি হলো D যা আবিষ্কৃত হয়েছিল ২০০৯ সালে। ইহা এতই বড় যে এর ভেতর এক বিলিয়ন পৃথিবীকে জায়গা দেয়া সম্ভব। যে মধ্যবর্তী শূন্য স্থান বলয় “এ” এবং “বি” কে আলাদা করে রেখেছে একে বলা হয় ক্যাসিনি বিভাজন স্তর। এর বিস্তৃতি হলো ৪৭০০ কিলোমিটার। বিজ্ঞানীরা শনির বলয়ে রহস্যময় কিছু “স্পোক” সন্ধান পেয়েছেন। সেগুলো কোনো হদিস ছাড়াই হঠাত দৃশ্যমান হয় এবং কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মিলিয়ে যায়। ধারণা করা হয় এই স্পোক গুলো ছোটো ধূলিকণার বিদ্যুতায়ন থেকে তৈরি হয়(যখন উল্কা এসে বলয়ে আঘাত করে) অথবা গ্রহের মধ্যে সংঘটিত হওয়া ব্জ্রপাতের ইলেক্ট্রন রশ্মির মাধ্যমে। “এফ” বলয়টিতেও কিছু রহস্যময় রশির মতো অস্তিত্ব দেখা যায়। এই বলয়টি আরো সরু বলয় দ্বারা গঠিত যেগুলোর সংকোচন এবং বক্রায়নের ফলে ভ্রম তৈরি হয় যে বলয়টিতে দড়ি সদৃশ কোনো বস্তু রয়েছে। 

Spokes on the left side

ক্যাসিনি মহাকাশযান অন্য কোনো যান থেকে শনির বলয় গুলোর সর্বোচ্চ নিকটে যেতে পেরেছিল। স্পেস প্রব থেকে পাঠানো তথ্য গুলো এখনও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে ধীরে ধীরে। তবে ইতিমধ্যে আমরা যা পেয়েছি তা হচ্ছে শনির উপগ্রহ গুলোর বর্ণ সম্পর্কে। তাছাড়াও বলয়ের মধ্যবর্তী শূন্যস্থান টির মধ্যে রহস্যজনক কিছু রাসায়নিক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে যা “বলয় বৃষ্টি” সংঘটিত করে এবং শনির বায়ুমণ্ডল এ থেকে প্রভাবিত হয়। শনির রয়েছে প্রায় ৮২ টি উপগ্রহ। এর মধ্যে একটি হচ্ছে টাইটান যেটি বুধ গ্রহ থেকেও বড়! টাইটান হচ্ছে সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপগ্রহ, প্রথমটি হচ্ছে বৃহস্পতির গ্যানিমিড।(পৃথিবীর টা পঞ্চম)। কিছু কিছু উপগ্রহের রয়েছে চরম কিছু বৈশিষ্ট্য। প্যান এবং এটলাসের আকৃতি ফ্লাইং সসারের মত! লেইপটাস এর এক পাশ বরফের মতো সাদা এবং অন্যপাশ আমাদের বিষাদ জমা হৃদয়ের মতো অন্ধকারে আবৃত! ইনসিলাডাস এর মধ্যে লক্ষ্য করা যায় বরফের আগ্নেয়গিরি! ধারণা করা হয় এর ভূ-গর্ভস্থ রয়েছে লুকায়িত সমুদ্র এবং কিছু রাসায়নিক পদার্থ যা ১০১ হিমবাহ থেকে আগত। এটি দক্ষিণ মেরুতে অবস্থিত আছে। প্রমিথিউস এবং প্যান্ডোরা কে বলা হয় রাখাল উপগ্রহ কারণ সেগুলো প্রতিনিয়তই শনির বলয়ের সাথে সম্পর্কে থাকে এবং সেগুলোকে কক্ষপথে ধরে রাখতে সক্ষম হয়। শনির সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে এর উপগ্রহ ক্রমাগতই তৈরি হয় এবং ধ্বংসও হয় একই সাথে!

First photo of Saturn from Pioneer 11

যেহেতু শনি হচ্ছে সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রহ, তাই বৃহস্পতির মতো শনির সাথে সূর্যের আকর্ষণ আমাদের সৌরজগতের আকৃতি সঠিক রাখতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। তাছাড়াও বিপুল পরিমাণ মহাজাগতিক বর্জ্য পদার্থকে বাধা প্রদানের মাধ্যমে অন্যান্য গ্রহ এবং প্রধানত পৃথিবীকে খুব চমৎকার ভাবে সুরক্ষিত রাখছে। বিজ্ঞানীরা এখনও এই গ্যাস দানবদের নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা বুঝার চেষ্টা করছেন সৌরজগতের মধ্যে এই গ্রহ গুলোর ভূমিকাটা আসলে কী। ২০১৭ সালে প্রকাশিত হওয়া একটি পেপারে বলা হয়েছে বৃহস্পতির মতো শনিও পৃথিবীকে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের উল্কাপাত ও গ্রহাণুর আঘাত থেকে আড়াল করে আসছে।

পাইওনিয়ার ১১, হচ্ছে সেই মহাকাশযান যা ১৯৭৯ সালে প্রথম শনির বলয় গুলোর ২২ হাজার কিলোমিটার পাশ দিয়ে উড়ে যায়। এর কারনে বিজ্ঞানীরা শনির দুটি বলয় আবিষ্কারে সক্ষম হোন এবং একই সাথে ধারণা পান গ্রহের তীব্র চৌম্বক ক্ষেত্র সম্পর্কে। ভয়েজার সহায়তা করে এটা জানতে যে এই বলয় গুলোও আরো ছোটো ছোটো উপবলয় দ্বারা তৈরি! এই মহাকাশযান গুলোর তথ্যের ভিত্তিতে আবিষ্কৃত হয় শনির অনেক গুলো উপগ্রহ। শনিকে প্রদক্ষিণকারী ক্যাসিনি মহাকাশযান হচ্ছে গ্রহ অনুসন্ধানের জন্য তৈরিকৃত সবচেয়ে বড় যান। এটি ইনসিলাডাস এর লুকায়িত সমুদ্র বা বরফ আগ্নেয়গিরি সম্পর্কে জানতে সহায়তা করেছে এবং হাইগেন স্পেস প্রবটিকে যা টাইটানে গবেষণা চালাচ্ছিল, তা উদ্ধার করেছে। এক দশক অনুসন্ধানের পর ক্যাসিনি আমাদের দিয়েছে এক অবিস্মরণীয় তথ্য যার মাধ্যমে আমরা শনি থেকে পৃথিবী, মঙ্গল এবং বুধকে অস্পষ্ট দেখতে পাই। এই ছবিটি ক্যাসিনি তুলেছিল ২০১৩ সালে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে জ্বালানি ফুরিয়ে আসায় ক্যাসিনি পতিত হয় শনির বুকে।

The Cassini spacecraft’s onboard cameras acquired a panoramic mosaic of Saturn that allows scientists to see details in the rings as they are backlit by the sun. This image spans about 404,880 miles (651,591 kilometers) across.

অদূর ভবিষ্যতে বলয় রাজ শনিকে নিয়ে কোনো মিশনের চিন্তা না থাকলেও বিজ্ঞানীরা ভাবছেন টাইটান এবং বরফপূর্ণ ইনসিলিডাস এ প্রব পাঠিয়ে বিস্তর অনুসন্ধান চালাতে। হয়ত সেই মিশন গুলোতে পাঠানো হবে অত্যাধুনিক রভার…

তথ্যসূত্রঃ space.com, NASA Solar System Observatory ,JPL

আপনার মতামত লিখুন :

Back to top button
Close