পরিবেশপৃথিবীবিবিধ

থ্রি গর্জেস বাঁধ কমিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি

থ্রি গর্জেস বাঁধের রিজার্ভারের পানির উচ্চতা সমুদ্রসীমা হতে প্রায় ৩০০ ফিট উঁচু হয়

থ্রি গর্জেস বাঁধ, আক্ষরিক বাংলায় তিন গলার বাঁধ। এখানে বাঁধ বলতে স্বাভাবিকভাবে আমরা যেটা বুঝি সেটাই বুঝাচ্ছে। বাঁধ হচ্ছে এমন একটি স্ট্রাকচার যা নদীর উপর স্থাপন করে পানির স্রোতকে আটকানো হয়। আর পানির স্রোতকে মানবকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়। যেমনঃ কৃষিকাজে পানি সরবরাহ, বন্যা প্রতিরোধ, স্রোতের এনার্জি থেকে হাইড্রোইলেকট্রিসিটি (সহজ বাংলায় জলবিদ্যুৎ) উৎপাদন।

আমাদের মিরপুরের বেড়িবাঁধের মতোই কিন্তু কষ্টের বিষয় হল এই বাঁধ শুধু বন্যা ঠেকাতে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদনটা আর হয়ে ওঠে না। তাও যেটুকু পাই সেটা প্রয়াত এরশাদ সাহেবের কল্যাণে। যা হোক এই থ্রি গর্জেস বাঁধ হল পৃথিবীর বৃহত্তম বাঁধ। চাইনিজদের বাঁধ খুবই প্রিয়। তাই হয়তো পৃথিবীর বৃহত্তম ২০টি বাঁধের মধ্যে ৯টিই চায়নাতে অবস্থিত।। চায়নার বিপুল জনসংখ্যার বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতেই তাদের এই ব্যবস্থা। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে চায়না বেশ কম খরচেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।    

থ্রি গর্জেস বাঁধ

চায়নার হুবেই প্রদেশের য়িলিং জেলার স্যান্ডৌপিং শহরে ইয়াংজে ( বাংলায় ইয়াং চি কিয়াং) নদীর উপর স্থাপিত এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ২০১২ সালে সম্পূর্ণভাবে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া এই বাঁধটি ২০১৪ সালে ৯৮.৮ টেরাওয়াট-ঘন্টা শক্তি উৎপাদন করে বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টি করে। এই বাঁধে উৎপন্ন হওয়া শক্তি দিয়ে নিউজিল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, আইসল্যান্ড, কোস্টারিকা, বাহামাস এবং রয়ান্ডাকে পুরো এক বছরের জন্য একসাথে চালানো যাবে। অথচ বাঁধটি চায়নার শক্তি চাহিদার মাত্র ১.৫% পূরণে সক্ষম।

থ্রি গর্জেস বাঁধ

কিন্তু তারপরেও এই বাঁধ নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ২০০ বিলিয়ন ডলার খরচে নির্মাণ করা এই বাঁধকে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত প্রকল্প বলা হয়। আধুনিক চায়নার জাতির পিতা সান ইয়েত সেন ১৯১৯ সালে সর্বপ্রথম এই বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব রাখেন। এই প্রস্তাবনায় নির্মাণ জরিপ শুরু হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য তা বাধাগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে সকল জরিপ শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তবে এ নিয়েও বিতর্ক কম নেই।

বিতর্কের কারণ

চায়নার ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি ১৯৯২ সালে বাঁধ নির্মাণের অনুমোদন দেয়। চায়নার কংগ্রেস পার্টি অন্যান্য দেশের মতো  নয়। তারা আজ পর্যন্ত সরকারের কোন প্রস্তাবই নাকোচ করে নি। সরকার প্রতিবার শতভাগ সমর্থনই পেয়ে থাকে। কিন্তু এই প্রকল্পের জন্য কংগ্রেস পার্টির মাত্র ৬৭.৭৫% সদস্য সমর্থন প্রদান করেন। চায়নার পরিপ্রেক্ষিতে এই ঘটনা বিশাল এক বিতর্কের সৃষ্টি করে। এই বাঁধ তৈরিতে চায়নাকে অনেক দুর্ভোগ এখনও পোহাতে হচ্ছে।

নির্মাণকালে চায়নার ১.২৫ মিলিয়ন মানুষকে আশেপাশের এলাকা থেকে সরে যেতে হয়েছে। এই বাঁধের কারণে ইয়াংজে নদীর ইকোলজিক্যাল সিস্টেমও হুমকির সামনে দাঁড়িয়ে। প্রতি বছর বহু জলজ জীব এই নদীতে মারা যাচ্ছে। চায়নার ফ্রেশ ওয়াটার বা পানযোগ্য পানির ৭০ ভাগ পানি এই বাঁধের কারণে নষ্ট হয়।

ইয়ানংজে নদীর একাংশ

 পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী এই বাঁধের বৈর্জ্য অপসারণ পদ্ধতি অনেকটা পুরোনো ধাঁচের। ফলাফল হিসেবে প্রতিবছর ২৬৫ মিলিয়ন গ্যালন বৈর্জ্য এই নদীতে পতিত হচ্ছে। আর চায়নার প্রায় ১৪০টি শহর এই নদীর সাথে সম্পৃক্ত। ক্ষতির পরিমাণ তাহলে অনেকটাই আন্দাজ করতে পারছেন এখন।

কমে যাচ্ছে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি

চায়নার এই বাঁধ পৃথিবীর ঘূর্ণন বেগকে কমিয়ে দিচ্ছে। এটা এতোদিন সবাই গুজব হিসেবেই গ্রহণ করেছে। কিন্তু বিষয়টি গুজব নয়। এর সত্যতা মিলেছে নাসা গবেষকদের এক গবেষণায়। বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি।

এই বিশাল জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটির সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা ২২৫০০ মেগাওয়াট। প্রতিটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে রিজার্ভার নামের একটি অংশ থাকে। রিজার্ভার হল পানি সংরক্ষণকারী এলাকা। একটা নির্দিষ্ট সময়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সকল ইঞ্জিন বন্ধ রাখা হয় রিজার্ভার পূরণের জন্য। রিজার্ভার তার সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতায় পৌঁছালে আবার শক্তি উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়।

যখন থ্রি গর্জেস বাঁধের রিজার্ভারটি পানি দ্বারা  পূর্ণ হয় তখন এর উচ্চতা হয় ১৭৫ মিটার ( ৫৭৪ ফিট )। যা সমুদ্র সীমার চেয়েও প্রায় ৯০ মিটার উঁচু। এই রিজার্ভারটির দৈর্ঘ্য ৬৬০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ১.১২ কিলোমিটার। মোট ক্ষেত্রফল প্রায় ১০৪৫ বর্গ কিলোমিটার। এই রিজার্ভারটির ধারণক্ষমতা ৩৯.৩ কিউবিক কিলোমিটার (৯.৪৩ কিউবিক মাইল) যার ওজন ৩৯ ট্রিলিয়ন কিলোগ্রাম বা ৪২ বিলিয়ন টন।

থ্রি গর্জেস বাঁধের রিজার্ভারের একাংশ

এই পরিমাণ পানি হয়তো পৃথিবীর মোট পানির তুলনায় নগণ্য। কিন্তু এরও একটি প্রভাব আছে। যেকোন পদার্থের যেকোন ধরণের মুভমেন্টের জন্য একটি বাহ্যিক বলের প্রয়োজন (যদি সেটি স্থির অবস্থায় থাকে)। সেই নীতি অনুযায়ী কোন পদার্থের এঙ্গুলার মুভমেন্ট বা কৌণিক সরণ বা বক্র চলনের জন্য টর্ক প্রয়োজন। আপনারা যারা বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র তারা হয়তো খুব সহজেই বুঝে গেছেন। কিন্তু সকলের বোঝার জন্য বলছি, টর্ক বা বলের ভ্রামক হলো একটি বস্তুকে কোন বলের  একটি নির্দিষ্ট  অক্ষের চারদিকে ঘোরানোর প্রবনতা। এবার আসা যাক মোমেন্ট অব ইনার্শিয়া বা জড়তার ভ্রামকে। কোনো একটি অক্ষের সাপেক্ষে ঘূর্ণনরত একটি বস্তুর ঘূর্ণন গতির পরিবর্তনকে বাধা দেওয়ার প্রয়াস হচ্ছে জড়তার ভ্রামক।

মোমেন্ট অব ইনার্শিয়া বা জড়তার ভ্রামক বস্তুর ঘূর্ণন অক্ষের সাপেক্ষে হিসাব করা হয়। ঘূর্ণনশীল কোনো বস্তুর প্রতিটি কণার বৃত্তাকার গতির কেন্দ্রগুলো যে সরলরেখায় অবস্থিত তাকে  ঘূর্ণন অক্ষ বলে।

বিজ্ঞানের কাটখোট্টা বিষয় অনেক হল। এবার আসল কথায় আসি। ঘূর্ণনশীল বস্তুর ঘূর্ণন অক্ষ হতে বস্তুর ভরকেন্দ্রের দুরত্ব হল চক্রগতির ব্যাসার্ধ। এই চক্রগতির ব্যাসার্ধের উপর মোমেন্ট অব ইনার্শিয়া নির্ভরশীল। এই ব্যাসার্ধ যত কম হবে  মোমেন্ট অব ইনার্শিয়ার মান ততো কম হবে। অর্থ্যাৎ বস্তুর ঘূর্ণন বেগ ততো বেশি।

সমানুপাতিক সম্পর্ক। ব্যাসার্ধ বাড়লে মোমেন্ট অব ইনার্শিয়া বাড়বে আর ঘূর্ণন গতি কমবে।

পদার্থের এই নীতিকেই কাজে লাগিয়ে স্কেটাররা ফিগার স্কেটিং করার সময় আর ডাইভাররা সমারসল্টিং এর সময় নিজেদের ভরকেন্দ্রকে ঘূর্ণন অক্ষের কাছাকাছি রাখে। ফলে তারা বেশি সময় ধরে নিজেদের স্পিন করাতে পারে।

অপরদিকে থ্রি গর্জেস বাঁধের রিজার্ভারের পানির উচ্চতা সমুদ্রসীমা হতে প্রায় ৩০০ ফিট উঁচু হয়। ফলে পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের সাপেক্ষে রিজার্ভারের পানির ভরকেন্দ্রের দুরত্ব বৃদ্ধি পায় অর্থ্যাৎ চক্রগতির ব্যাসার্ধ বৃদ্ধি পায়। আর মোমেন্ট অব ইনার্শিয়াও বেড়ে যায়। ফলাফল হিসেবে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি কমে যায়

ঘূর্ণায়মান পৃ্থিবী

তবে এই কমে যাওয়ার পরিমাণটা খুবই কম। প্রতিদিন পৃথিবীর ৬০ ন্যানোসেকেন্ড করে বেশি সময় লাগছে তার কক্ষপথ সম্পূর্ণ আবর্তন করতে। এভাবে চলতে থাকলে ৪৭,৬৫০ সালে পৃথিবীর পুরো ১ সেকেন্ড সময় বেশি লাগবে। এর পাশাপাশি পৃথিবীর মধ্যভাগ ধীরে ধীরে আরো বেশি গোলাকার এবং উপরের অংশ আরো বেশি সমতল হবে। এছাড়াও প্রতিদিন পৃথিবীর দুই মেরু রেখা প্রায় ২ সেন্টিমিটার বা ০.৮ ইঞ্চি করে সরে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন খুবই নগন্য। এতে করে পৃথিবীর কোন প্রকার ক্ষতিসাধন হওয়ার সম্ভাবনা প্রমানিত হয়নি।

এখন কথা হচ্ছে এ ধরণের দৈত্যাকার বাঁধ যদি আরো নির্মাণ করা হয় তবে কি ধরণের পরিবর্তন হতে পারে। সহজ উত্তর।

এধরণের বাঁধ নির্মাণের জন্য ইয়াংজের মতো খরস্রোতা নদী প্রয়োজন। যার পরিমাণ খুবই কম। আর এই বাঁধের কারণে চায়নার ক্ষতির পরিমাণ লাভের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা ২০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে একটি বাঁধ নির্মাণের ক্ষমতাও সব দেশের নেই। তাই এরকম বাঁধ সামনে নির্মাণের কোন সম্ভাবনা দেখা না যাওয়ায় গবেষকরাও এ নিয়ে কাজ করেননি।

এই বাঁধ সম্পর্কিত ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন

যদি কোন প্রশ্ন থেকে থাকে তবে অবশ্যই আমাদের কমেন্ট সেকশনে জানাবেন। আমরা উত্তর দেওয়ার সম্পূর্ণ চেষ্টা করবো।

তথ্যসূত্রঃ Interesting Engineering, Business Insider, Ultimate Science, Half as Interesting, Info Rains1, BBC, The Third Pole.

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close