বিবিধ

ক্লাসে মোবাইলের ব্যবহার ক্লাসের সবার পরীক্ষার নম্বরে প্রভাব ফেলে

মোবাইল ডিসট্রাকশনের অন্যতম একটি কারণ

আপনার  কি ক্লাসে মোবাইল ব্যবহার করতে ভাল লাগে ? আপাত দৃষ্টিতে ক্লাসে মোবাইল ব্যবহার আপনার কাছে খারাপ নাও লাগতে পারে। কিন্তু নতুন একটি স্টাডির ফলাফল থেকে দেখা যায় যে , ক্লাসে যদি মোবাইল চালানোর অনুমতি থাকে তাহলে কলেজের স্টুডেন্টরা ক্লাসে ইনফরমেশন গুলো ভালমতো মনে রাখে না, এ ব্যাপারটি যারা ক্লাসে মোবাইল ব্যবহার করে না তাদের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে ।

Arnold Glass আর  Mengxue kang বলেন,

এ ঘটনায় শুধু কলেজের স্টুডেন্টরা প্রভাবিত হয় না। তারা দুজনেই এ স্টাডি বা গবেষণার লেখক এবং Piscataway এর  Rutger ভার্সিটির সাইকোলজিস্ট।  N.J Glass বলেন,  তিনি যদি মিডল অথবা হাই স্কুলের স্টুডেন্টদের পর্যবেক্ষণ করা হত তখন একই ফলাফল পাওয়া যেত। কিন্তু কেন?    Glass আর  Kang বলেন,  এ রকম  হওয়ার কারণ হল, বয়স বাড়লেও মানুষের মৌলিক প্রবৃত্তির পরিবর্তন হয় না।

এসব গবেষকরা দেখেছে তাদের স্টুডেন্টরা ক্লাস চলাকালীন সময়ে মোবাইল এবং ল্যাপটপ ব্যবহার করছে। গবেষকরা সন্দেহ করেছে এ ব্যাপারটি তাদের স্টুডেন্টদের ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। মানুষের মস্তিষ্ক সাধারণত একসাথে অনেকগুলো কাজে মনোনিবেশ করতে পারে না।

মানুষ মনে করে তারা মাল্টিটাস্কিং করতে পারে। মানুষের মস্তিষ্ক আসলে  একবারে শুধুমাত্র একটি কাজে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে পারে। একটি কাজ করার সময় আরেকটি কাজ করলে মস্তিষ্ক সব কাজে মনোযোগ দিতে পারে না। এতে করে কাজ শেষ করতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লাগে। কোনো একজন ব্যক্তি একজনের কথা শুনার সময় আরেকজনের কথা শুনতে পারে না। এমনকি তারা একসাথে পড়তে এবং শুনতে পারে না , কারণ মস্তিষ্ক কেবলমাত্র একটি কাজে মনোনিবেশ করতে পারে।

তাহলে একজন ছাত্র কি মেইল চেক করার সময় স্যারের লেকচার শুনতে পারে?  অথবা  ফেসবুকে বন্ধুর ছবিতে লাইক দেয়ার সময়  কি ক্লাসরুম ডিসকাশনে অংশগ্রহণ করতে পারে?  Glass এবং kang বলেন , এটি ছাত্রদের লেখাপড়া কে আরো কঠিন করে তোলে এবং কোনো কিছু শিখতে তাদের সময় বেশি লাগে।   Glass এবং kang  এর নতুন তথ্য তাদের এ বক্তব্য কে নিশ্চিত করেছে।

পর্যবেক্ষণ

Glass এবং kang রুটজার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দুটি দল নিয়ে কাজ করেছে। দুটি দলকে একই ধরনের সাইকোলজিক্যাল কোর্স নেয়া হয়েছিল। দুটি গ্রুপেই একই শিক্ষক  এবং  একই ধরনের বিষয়বস্তু  ছিল। শুধু সাক্ষাৎকারের সময়টি ভিন্ন ছিল।

দুটি গ্রুপে আরেকটি পার্থক্য ছিল সেটি হচ্ছে একটি দল একদিন মোবাইল ব্যবহার করতে পারবে আরেকদিন পারবে না। অন্য দলের ক্ষেত্রে একই নিয়ম ছিল কিন্তু দিনটি ছিল বিপরীত দিনে। এই পর্যবেক্ষণ থেকে ছাত্ররা  প্রতিদিন মোবাইল ছাড়া এবং মোবাইল নিয়ে কিভাবে পড়া বা তথ্য মনে রাখছে সেটা  গবেষকরা তুলনা করেছে।

নন-ডিভাইস ডে ( মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার বিহীন) তে একজন পর্যবেক্ষক সব সময় ছাত্রদের নজরে রেখেছে যাতে ছাত্ররা ক্লাসে মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করতে না পারে । ক্লাস শেষ হওয়ার পর ক্লাসে কি কি আলোচনা করা হয়েছে সে সম্পর্কে তারা একটি কুইজ পূরণ করত।

সেমিস্টার শেষ হওয়ার পর,  Glass এবং  kang কুইজের ফলাফল পরীক্ষা করেছে। নন-ডিভাইস ডে এবং ডিভাইস ডে এর কুইজের ফলাফল তারা তুলনা করেছে। এমনকি তার তিনটি ইউনিট পরীক্ষা এবং বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল ও তারা পর্যবেক্ষণ করেছে।

পর্যবেক্ষণ করে তারা স্টুডেন্টদের  মোবাইল ব্যবহার ব্যতীত দিন এবং মোবাইল সহ দিনের ক্লাস কুইজের স্কোরে তেমন কোনো পার্থক্য পায়নি।  কিন্তু স্টুডেন্টদের পরীক্ষার ফলাফল অন্য কথা বলে।

পরীক্ষার ফলাফল পাঁচ ভাগ বেশি ভালো ছিল নন-ডিভাইস ডে তে। ফাইনাল পরীক্ষায় এ পার্থক্য আরো বেশি ছিল। নন-ডিভাইস ডে তে স্টুডেন্টরা ১৩ পার্সেন্ট বেশি ভালো করেছিল।

পরে  Glass এবং kang মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করে ফলাফল খারাপ হওয়া ছাত্রদের পর্যবেক্ষণ করেছে। ক্লাসে  মোবাইল ব্যবহার না করা ছাত্রদের ফলাফল কি ভালো হয়েছে? না  অদ্ভুতভাবে দেখা গেল যে, যখন ডিভাইস ব্যবহার করার অনুমতি ছিল  তখন মোবাইল এর ব্যবহারের অনুমতি থাকার কারণে  সবার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে ; এমনকি তাদেরও  রেজাল্ট খারাপ হয়েছে  যারা ডিভাইস ব্যবহার করেনি।

Glass রিপোর্ট করেন, যখন অনুমতি ছিল তখন প্রায় অর্ধেক স্টুডেন্ট ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করেছিল। “তাহলে যারা মোবাইল ব্যবহার করছিল না, তারা অবশ্যই তাদের পাশে বসে ছিল।” তিনি ধারণা করেন দুই অবস্থাতেই পড়া বুঝা বা শিখা কঠিন হয়ে পড়ে। দেখা  গেল  এ কারণে স্টুডেন্টরা কম প্রশ্ন করেছে, যার ফলে স্টুডেন্ট এবং ইনস্ট্রাক্টর এর মাঝে কথাবার্তা কম হয়েছে।

Glass মন্তব্য করেন, পড়া মনে রাখার জন্য এসব কথাবার্তার গুরুত্ব রয়েছে।

সেল ফোনের ব্যবহার কাছাকাছি মানুষকে ডিস্ট্রাক্ট করতে পারে। এমনকি কাছাকাছি মানুষটি যদি মোবাইল স্ক্রিনের দিকে মনোযোগ দিতে ও না চায় তবুও তার চোখ সেদিকে চলে যায়।  Glass  প্রশ্ন করেন,  আপনি কি কখনো মুভি থিয়েটারে ছিলেন, যেখানে আপনার পাশে কোনো অপরিচিত লোক মোবাইল ব্যবহার করছে । আপনার মনোযোগ কিন্তু অপরিচিত লোকের মোবাইল স্ক্রিনের দিকে নিবদ্ধ ছিল। আপনি কিন্তু মুভির খুব কম অংশই মনে রাখতে পেরেছিলেন। এ একই ঘটনা কিন্তু ক্লাসরুমেও ঘটে থাকে।

ডিসট্রাকশন

Larry Rossen, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির একজন সাইকোলজিস্ট। তিনি, ক্লাসে টেকনোলজি বা ডিভাইস ব্যবহার কেন স্টুডেন্টদের কর্মক্ষমতাকে প্রভাবিত করে তা জানার জন্য  Glass  এবং  Kang এর পর্যবেক্ষণকে গভীর ভাবে দেখার জন্য তিনি নিজে একটি পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি খেয়াল করেন কোনো কিছু হারানো বা  কিছু থেকে বাদ যাওয়ার ভয় বা চিন্তা স্টুডেন্টদের বারবার মোবাইল ব্যবহারের প্রলুব্ধ করে। যেমনটা আমরা ক্লাসে দেখে থাকি। এর প্রভাবে স্টুডেন্ট দের কোনা কিছু শিখার ক্ষেত্রে খারাপ প্রভাব পড়ে; শিখতে সময় বেশি লাগে।

Jean Twenge , ডিয়েগো স্টেট ইউনিভার্সিটির একজন মনোবিজ্ঞানী বলেন, ইলেকট্রনিক ডিভাইসের কারণে হওয়া ক্রমাগত ডিসট্রাকশন এর ফলে স্টুডেন্টরা জটিল কিছু শিখার ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যার সম্মুখীন হবে। তিনি তার একটি গবেষণা থেকে দেখতে পান টিনএজ রা এখন দিনে প্রায় ৬ ঘণ্টা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে।

যার কারণে তারা পড়ালেখা ঠিকমত করেনা। তাই বলে, আমরা প্রযুক্তির ব্যবহার কে না বলবো না। প্রযুক্তির বদৌলতে লেখাপড়া অনেক সহজ হয়েছে। ই-বুক ব্যবহার করে আমরা মোবাইলে বা ল্যাপটপে যেকোনো বই পড়তে পারি।

প্রযুক্তি ব্যবহারের যেমন সুবিধা রয়েছে তেমনি অসুবিধা রয়েছে।  তাই প্রযুক্তি ব্যবহারে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে।

রেফারেন্স ঃ sciencenewsforstudents.org

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close