নবায়নযোগ্য শক্তি

জলবিদ্যুৎ

কোন পরিবাহিকে কোন চৌম্বক ক্ষেত্রের ভিতর গতিশীল করা হলে অথবা কোন পরিবাহির পাসে পরিবর্তিত চৌম্বক ক্ষেত্র প্রয়োগ করলে ঐ পরিবাহিতে বিদ্যুত উৎপন্ন হয়

জলবিদ্যুৎ, জল বা পানি থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় তাকে জলবিদ্যুৎ বলে। ছোটবেলায় একটা জিনিস কোনভাবেই আমার  মাথায় কাজ করতো না যে পানি থেকে কিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আর বিদ্যুৎ যদি উৎপাদন করা যায় তবে অন্যান্য এতসব মেশিন কেন পানি দিয়ে চালানো হয় না,কেন শুধু শুধু পানি বাদ দিয়ে এত টাকার ডিজেল, পেট্রোল পোড়ানো হয়। আসলে জলবিদ্যুৎ সম্পর্কে আমার  ধারনাটা এমন ছিল যে  পেট্রোল বা ডিজেল ইঞ্জিন যেমন সরাসরি জ্বালানি তেল দিয়ে চালানো হয় জলবিদ্যুতের ক্ষেত্রে ও হয়ত এমন কোন মেশিন আছে যা সরাসরি পানি থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। এখন ভেবেই হাসি পায় যে আমি কত বুদ্ধিমান! ছিলাম। আপনাদের মধ্যে আমার মতো বুদ্ধিমান কেউ থাকলে চলুন আপনার ধারনার সেই জলবিদ্যুৎ আর বাস্তব জলবিদ্যুতের ভিতর কি তফাৎ তা জেনে নিই।

তো আমরা কিভাবে পানি থেকে বিদ্যুৎ পাই? আসলে জলবিদ্যুৎ এবং কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র একই প্রক্রিয়ায় কাজ করে। কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা পুড়িয়ে পানি ফুটিয়ে বাষ্প তৈরি করা হয় তারপর সেই বাষ্পর প্রবাহ কাজে লাগিয়ে একটি টারবাইন ঘোরানো হয় এবং টারবাইনটি একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটরের সাথে যুক্ত থাকে এবং জেনারেটর ঘুরলে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। অপর পক্ষে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরাসরি পানির প্রবাহ কাজে লাগিয়ে একটি টারবাইন ঘোরানো হয় এবং টারবাইনটি যুক্ত থাকে একটি বৈদ্যুতিক জেনারেটর এর সাথে। এক্ষেত্রে পানির প্রবাহ তৈরি করতে অভিকর্ষ শক্তি কাজে লাগানো হয়। কারণ পানি যদি কোন উঁচু জায়গায় জমানো হয় তারপর তা ছেড়ে দিলে অভিকর্ষের প্রভাবে স্রোত সৃষ্টি করে প্রবাহিত হয়।তাই কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হলেও জলবিদ্যুৎ নিরাপদ।  কারণ এখানে কোন কয়লা বা জ্বালানি তে পোড়ানো হয় না।তাই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কোন কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং অন্য কোন বিষাক্ত গ্যাস এবং পদার্থ পরিবেশে ছড়ায় না।

আরো বিস্তারিতভাবে ঘটনাটা এরকমঃ  কোন পাহাড়ি স্রোত সম্পন্ন নদী ( যেমন আমাদের কর্ণফুলী)  অথবা খুব স্রোতজ যেকোনো নদীর গতিপথে যদি বাধ দেওয়া হয় তাহলে সেখানে যে পানি জমা হবে তা কোনো গেটের মাধ্যমে ছেড়ে দিলে প্রচন্ড স্রোত তৈরি করে প্রবাহিত হবে অবশ্য একাজ নদী ছাড়াও উঁচু স্থানে অবস্থিত কোন লেকের মাধ্যমে ও করা যায়।

এখন এই স্রোতের গতিপথে চিত্রের মতো কোন টারবাইন পাতানো হয় তাহলে পানির স্রোত টারবাইনের ব্লেড গুলোকে ঘোরাবে ফলে টারবাইনের সাথে যুক্ত জেনারেটরের রোটর ও ঘুরতে থাকবে আর জেনারেটরের রোটর যখন বৈদ্যুতিক  ক্ষেত্রের ভিতর ঘুরে তখন সেখানে বিদ্যুত উৎপাদন হয়। যা পরবর্তীতে বাসাবাড়ি এবং কলকারখানায় সরবরাহ করা হয় লাইনের মাধ্যমে।

এখানে জেনারেটর মূলত ফ্যারাডের সুত্র অনুযায়ী কাজ করে। ফ্যারাডের সুত্রটি ছিল এমন ” কোন পরিবাহিকে (ধাতব বস্তু বা এমন বস্তু যা বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে) কোন চৌম্বক ক্ষেত্রের ভিতর গতিশীল করা হলে অথবা কোন পরিবাহির পাসে পরিবর্তিত চৌম্বক ক্ষেত্র প্রয়োগ করলে  ঐ পরিবাহিতে বিদ্যুত উৎপন্ন হয়” জলবিদ্যুতের ক্ষেত্রে জেনারেটরের রোটর একটি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের ভিতর সেট করা থাকে তাই টারবাইন যখন জেনারেটরের রোটরকে ঘুরায় তখন ঐ চৌম্বক ক্ষেত্রের পরিবর্তন হয় এবং সুত্রমতে সেখানে বিদ্যুত সৃষ্টি হয়। এই বিদ্যুত লাইনের মাধ্যমে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হয়।

এখন পানির এই মজুদ সবসময় মেইনটেইন করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া চাহিদার সাথে সমান পরিমাণ বিদ্যুৎ সবসময় উৎপাদন নাও হতে পারে।  আবার দিনের সবসময় গ্রাহক পর্যায়ে ব্যবহারও সমান হয় না। কখনো চাহিদা কম থাকে আবার কখনো চাহিদা থাকে সর্বোচ্চ।  তাই চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যেমন সাধারণত দিনের বেলায় চাহিদা সর্বোচ্চ থাকলেও গভীর রাতে তা সর্বনিম্ন হয়।তাই চাহিদা কম থাকার সময়ে অতিরিক্ত টারবাইন এবং জেনারেটর গুলো বন্ধ রেখে পানির মজুদ সংরক্ষণ করা যায়। আবার রাতে যখন গ্রাহক চাহিদা কম থাকে তখন উৎপাদিত বিদ্যুতের একটা অংশ ব্যবহার করে পাম্পের সাহায্যে ব্যবহৃত পানি পুনরায় ড্যামে ফেরত পাঠিয়ে পরবর্তী ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করা হয়।  এবং এভাবেই প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে আর আমরা নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পাই।

আমাদের দেশেও একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে ,কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। যেখানে কর্ণফুলী নদীর স্রোতে বাধ দিয়ে ড্যাম তৈরি করে পানি জমিয়ে রেখে এই কাজটি করা হয়।

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close