টিপসদৈনন্দিন বিজ্ঞানবিবিধ

কোভিড-১৯ এবং মাস্ক সমাচার!

করোনা মহামারীতে এ যাবৎ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আমরা যে কথাগুলো শুনেছি সেগুলোর মধ্যে মাস্ক নিয়ে আলোচনার বিষয়বস্তু সবসময়ই ছিল হট কেক। প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাই কোনো না কোনো ভাবে মুখে ব্যবহার করার মাস্ক নিয়ে বিভিন্ন রকম আলোচনা- সমালোচনায় জড়িয়েছে। কেন আমরা এখনও মাস্ক ব্যবহার করব? কী ধরনের মাস্ক আমাদের ব্যবহার করা উচিত? আদৌ কি মাস্ক ব্যবহারের প্রয়োজন রয়েছে? এই সকল বিষয়গুলো নিয়ে থাকছে আজকের লিখাটি।

The Best And Worst Face Masks For COVID-19, Ranked by Their Level ...

বিজ্ঞান এখানে সবার জন্য স্পষ্ট যে মুখে মাস্ক ব্যবহার করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করতে পারে এবং অনেক জীবন রক্ষা করতে সক্ষম। আমরা জানি বিষয়গুলো কিন্তু কেউই পুরোপুরি মানার চেষ্টা করিনা। সেটা হোক সচেতনতার অভাবে অথবা হোক অজ্ঞতার ফলশ্রুতি। ১৯৪ টা দেশ থেকে গবেষণার ভিত্তিতে কিছু প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণের পর দেখা যায় যেসব জায়গায় মাস্ক পরিধানের ব্যাপারে জনগণ সচেতন ছিল না সেখানে প্রতি সপ্তাহে মৃত্যুহার প্রায় ৫৫ ভাগ বেশি ছিল সেসব জায়গার তুলনায় যেখানে মাস্ক ব্যবহারকে সবাই বাধ্যতামূলক ভাবে মেনে নিয়েছিল। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মডেলে দেখা যায় যদি যুক্তরাষ্ট্রের ৯৫ ভাগ মানুষ নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করত তবে নভেম্বরের মধ্যে প্রায় ৪৫ হাজারেরও বেশি মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব ছিল। তবে সব ধরনের মাস্ক কিন্তু সমান স্তরের প্রতিরক্ষা দেয়না। আদর্শ ফেস মাস্ক গুলো অনেকটাই কার্যকর হয় বেশিরভাগ ভাইরাস প্রতিরোধ করতে যেগুলো হাচি বা কাশির মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস ছড়ানোর প্রধান এবং প্রাথমিক মাধ্যম হচ্ছে এরোসল বা ক্ষুদ্র বাতাসের কণা যেগুলো মানুষের নিশ্বাস অথবা কথা বলার সময় প্রতিনিয়ত নির্গত হয়।

  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে মেডিকেল বা সার্জিকাল মাস্ক ব্যবহার করা উচিত সকল প্রকার স্বাস্থ্যকর্মীদের যারা সরাসরি রোগীর সংস্পর্শে আসেন, বৃদ্ধ এবং সেইসকল মানুষ যারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আছেন।
  • যেসকল মানুষ সুস্থ আছেন অথবা উপরোক্ত কোনো ক্যাটাগরিতে পড়েন না তাদের উচিত কাপড়ের মাস্ক ব্যবহার করা। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থাও জনসাধারণকে কাপড়ের মাস্ক পরতে উৎসাহিত করেছে।

কিন্তু এখানেও কিছু বিষয় রয়েছে, কাপড়ের মাস্ক সব সমান নয়। ক্যালিফোর্নিয়ার মেরিন কাউন্টির ডাক্তার Ramzi Asfour এর মতে কাপড়ের মাস্ক সম্পূর্ণ নির্ভর করে মানের উপর। কেউ যদি এখন ৬০০ থ্রেড কাউন্ট মিশরীয় সুতা দ্বারা একটি মাস্ক বানায় তাহলে তা অবশ্যই সাধারণ গেঞ্জি বা টি শার্টের কাপড়ের থেকে তৈরি মাস্কের চেয়ে আলাদা হবে গুণে ও মানে। গত কয়েক মাস ধরেই বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালাচ্ছিলেন বিভিন্ন প্রকার মাস্ক, কোন বস্তু ব্যবহার করলে ভাইরাসের আক্রমণ ঝুঁকি সর্বনিম্নে থাকে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে। নিম্নে সেই গবেষণা গুলোর ফলাফল দেয়া হলো সবচেয়ে বেশি কার্যকরী থেকে কম কার্যকরী মাস্কেরঃ

N95 এবং N99 মাস্ক

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে এই দুই ক্যাটাগরির মাস্ক। বিভিন্ন সংস্থা স্বাস্থ্যকর্মীদের এই দুইটি মাস্ককে সবসময় খুব বেশিই প্রাধ্যন্য দিতে বলে। এর কারণ হচ্ছে এই মাস্কগুলো খুব শক্ত ভাবে নাকে এবং মুখের সাথে আটকে থাকে যার ফলে সহজে এরোসল মুখে প্রবেশ করতে পারেনা। তাছাড়া যে সুতা দিয়ে এগুলো তৈরি করা হয় তা খুবই উন্নত মানের এবং জটিল; অনেকাংশেই ভাইরাস বা দূষিত কণাকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়। জার্নাল অব হসপিটাল ইনফেকশনের একটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ১০ টি ভিন্ন ভিন্ন মাস্ক নিয়ে খুবই উচ্চ দূষণযুক্ত এবং বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করা হয়। এদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বেশি প্রতিরোধ প্রদান করতে সক্ষম হয়েছে এন ৯৫ এবং এন ৯৯ মাস্ক। ঝুকি প্রতিরোধ মাত্রা ছিল প্রায় ৯৫-৯৯ ভাগ। এদের নামের পাশের সংখ্যাটা এটাই প্রমাণ করে এরা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কতটা শক্তিশালী।

N99 Mask

সার্জিক্যাল মাস্ক

এটা সচরাচর প্রায় সবাই- ই ব্যবহার করে থাকেন। সার্জিক্যাল মাস্ক নির্মিত হয় নন- ওভেন ফেব্রিক দ্বারা সেজন্য যেসব স্বাস্থ্যকর্মীদের নিকট এন ৯৫ বা এন ৯৯ সহজলভ্য নয় তারা নির্দ্বিধায় এটি ব্যবহার করতে পারেন। এপ্রিল মাসে করা একটি স্টাডি দেখায় সার্জিকাল মাস্ক অনেকাংশেই ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে সক্ষম। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর সহজলভ্যতা। একে তো সার্জিকাল মাস্ক অন্য সকল কাপড়ের মাস্ক থেকে তিনগুণ বেশি শক্তিশালী অপর দিকে পৃথিবীর বেশিরভাগ জায়গায়ই এই মাস্ক খুব সহজলভ্য। প্রত্যন্ত অঞ্চল যখানে এন ৯৫ এর মতো মাস্ক সহজপ্রাপ্য না সেখানে সার্জিকাল মাস্ক সবচেয়ে বেশি কার্যকরী।

হাইব্রিড বা ঘরে তৈরি মাস্ক

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের গবেষকরা একটি পেপারে প্রকাশ করেছেন মিশ্র ধরনের কাপড়ের মাস্কের কথা যা অনেকাংশেই ভাইরাস প্রতিরোধে সক্ষম। এখানে ব্যবহৃত হয়েছে ২ স্তর বিশিষ্ট ৬০০-থ্রেড-কাউন্ট তুলার সাথে সিল্ক অথবা সিফন-ফ্লানেলের কাপড়। এটি প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষুদ্র কণা(৩০০ ন্যানোমিটারের নিচে) প্রতিরোধ করতে পারে এবং ৯০ শতাংশ কণার(৩০০ ন্যানোমিটার থেকে বড়) ক্ষেত্রে ভীষণ কার্যকরী। গবেষণা দেখিয়েছে যে তুলা এবং সিল্ক সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধ দেয়। তাছাড়াও তুলা এবং ফ্লানেল,সিল্ক এবং সিল্কের ৪ স্তরের কাপড় উপযুক্ত প্রতিরোধ প্রদান করে ভাইরাসের বিরুদ্ধে। রিসার্চ দল এটাও দেখতে পায় যে ৬০০-থ্রেড-কাউন্ট তুলার কাপড় সার্জিকাল মাস্কের চেয়েও বেশি কার্যকরী এবং তা অনেক সূক্ষ্ম কণাকে ফিল্টার করতে পারে। তাছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরামর্শ দেয় তিন স্তর বিশিষ্ট সিল্কের মাস্ক পরিধান করতে যাতে একটি স্তর কাজ করবে ছাকুনি হিসেবে, অপর দুটি থাকবে যথাক্রমে শোষক এবং বাতাসের কণা প্রতিরোধক পলিএস্টার দ্বারা নির্মিত। Illionois বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা দেখায় তিন স্তর বিশিষ্ট একটি সিল্ক শার্ট অথবা ১০০% সুতি কাপড়ের তৈরি মাস্ক সার্জিকাল মাস্কের মতোই শক্তিশালী। সুতি কাপড়ের একটি বৈশিষ্ট হলো এতে রয়েছে স্থিরবৈদ্যুতিক ধর্ম যা খুব সহজে অতি ক্ষুদ্র কণাকেও আটকে ফেলতে পারে।

Cotton- Chiffon Mask

ভ্যাক্যুম ক্লিনার ব্যাগ

দেখতে ব্যতিক্রমী শোনালেও ভ্যাক্যুম ক্লিনারে থাকা ব্যাগ শক্তিশালী মাস্ক হিসেবে কাজ করতে পারে। ভ্যাক্যুম ক্লিনার ব্যাগের তৈরি ফিল্টার প্রায় ৬০ শতাংশ সুরক্ষা দিতে পারে প্রচন্ড দূষিত পরিবেশেও। প্রায় সার্জিকেল মাস্কের মতোই সমানভাবে এরোসল এবং অন্যান্য দূষক পদার্থ ফিল্টার করতে সক্ষম এটি। মে তে হওয়া আরেকটি গবেষণায় দেখা যায় যদি বিশ্বের সব মানুষ ন্যূনতম ৫০ ভাগ ফিল্টার ক্ষমতা সম্পন্ন মাস্কও ব্যবহার করে থাকে তবে খুব সহজেই মহামারী নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে।

তোয়ালে অথবা বালিশের কভার!

নাম দেখেই বুঝা যাচ্ছে এইসকল বস্তু কখনোই খুব ভালো ফিলটার হিসাবে কাজ করেনা। কিন্তু এগুলো এক স্তর বিশিষ্ট সুতি কাপড় থেকে অনেক বেশি উন্নত এবং ভ্যাকুম ব্যাগের পরিবর্তেও ব্যবহার করা যায়। সিল্ক বা সাটিনের তৈরি তোয়ালে এবং বালিশের কাভার মোটামুটিভাবে এরোসল ফিলতার করতে সক্ষম বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। সুতি ওড়না বা এক ফালি কাপড় মুখে দিলেই মাস্ক হয়ে যায়না, কিন্তু সেগুলো মুখে কিছু না থাকা থেকে অন্তত উত্তম। এক স্তর বিশিষ্ট সুতি কাপড় অত্যন্ত দুর্বল হলেও তা ক্ষুদ্র পরিসরে জীবাণু ফিলতার করতে পারে। সুতি ওড়না বা গেঞ্জির কাপড় অত্যন্ত দূষিত পরিবেশে প্রায় ২০ মিনিট পর্যন্ত ৪৫ ভাগ জীবাণু/ ভাইরাস ফিল্টার করতে পারে এবং ২০ মিনিট পরে তা নেমে আসে ২৪ শতাংশে। কিন্তু এটা অবশ্যই ০ থেকে ভালো! এরোসল কণা মুখে মাস্ক না থাকা অবস্থায় হাচি বা কাশির সাথে ১৬ ফুট দূর পর্যন্ত যেতে পারে। কিন্তু মুখে সবচেয়ে পাতলা মাস্ক পরলেও তা মাত্র ৫ ফুট পর্যন্ত যায়। যারা মাস্ক পরেন না তাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা যারা শুধুমাত্র সুতি কাপড় দ্বারা মাস্ক পরেন তাদের থেকে ৫৪ শতাংশ বেশি। আপনি যদি কাগজ দিয়েও মাস্ক বানান অন্তত সেটাও ৩৯ শতাংশ কার্যকর।

COVID-19 prevention illustration, the incorrect examples of wearing a mask

আপনি কীভাবে মাস্ক পরেন সেটার উপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। এন ৯৫ এবং সার্জিক্যাল মাস্কের মধ্যে মূল পার্থ্যক্যটাই হচ্ছে তাদের মধ্যবর্তী সীমিত ফাঁকা স্থান। যে মাস্কই পরা হোক না কেন, নিশ্চিত করতে হবে তাতে যেন এয়ার লিকের পরিমাণ প্রায় ০ শতাংশ থাকে। যথাযথ ভাবে মাস্ক না পরলে অথবা সেটা এয়ারটাইট না থাকলে মাস্ক পরা না পরা প্রায় সমানই থেকে যায়। আমাদেরকে এ দিকটাতেও নজর রাখতে রাখতে হবে। সর্বোপরি বিভিন্ন গবেষণা এটাই দেখায়, যেহেতু কোভিড- ১৯ সংক্রমণের মূল মাধ্যম হচ্ছে বাতাসের কণা এবং এরোসল আপনি কখনোই মাস্ক পরার গুরুত্বকে উড়িয়ে দিতে পারবেন না এবং প্রত্যেকটা মানুষ ঠিকভাবে এই নীতিমালা অনুসরণ করলে প্রায় ৪ সপ্তাহের মধ্যেই সংক্রমণের হারে বিরাট হ্রাস ঘটবে। তাই একটাই অনুরোধ, দয়া করে মাস্ক পরুন, নিজের স্বার্থে, জাতির সুস্থতার জন্য।

Coronavirus life span on surfaces like cardboard, plastic, wood ...

তথ্যসূত্রঃ Business insider, sciencealert

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close