দৈনন্দিন বিজ্ঞান

মানুষ আত্মহত্যা কেন করে? প্রতি বছর ৮ লক্ষ মানুষ মারা যায় আত্মহত্যার কারণে।

আত্মহতার আক্ষরিক অর্থ আমরা সকলেই জানি। যদি কোন ব্যক্তি নিজেই নিজের জীবন কেঁড়ে নেয় তবে তাকে আত্মহত্যা বলে। আমাদের পরিচিত অনেকেই হয়তো নিজেকে মুক্তি দিতে বেছে নিয়েছিল এই পথ। নিজের কেউ না হলেও আত্মহত্যার খবর নিশ্চয়ই সকলেই শুনেছি।

২০১৯ সাল, একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের বসবাস। এই সময়ে এসে আমরা পেয়েছি আধুনিকতারয় ছোঁয়া। রঙিন জীবন। কিন্তু আধুনিকতায় মাখা রঙিন জীবনের ভেতরটা অন্তঃসারশূণ্য। মানুষের জীবনে বেড়েছে হতাশা, আত্মগ্লানি। আর যখন আত্মগ্লানির বোঝা সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে তখন সেই মানুষগুলো মুক্তির খোঁজে বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। আত্মহত্যা এখন একটি সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে আত্মহত্যা একটি সমস্যায় রূপান্তরিত হয়েছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার কিছু তথ্য আপনাদের জানাইঃ      

  • প্রতিবছর পৃথিবী জুড়ে ৮ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে।  
  • প্রতিটি আত্মহত্যার পেছনে থাকে একাধিক আত্মহত্যার প্রচেষ্টা।
  • ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ আত্মহত্যা।
  • পৃথিবীর মোট আত্মহত্যার ৭৯ শতাংশ আত্মহত্যা ঘটে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের দেশগুলোতে।
  • প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহত্যা করে। বলা যায়, এই আর্টিকেলের এই অংশ পর্যন্ত আপনার পড়তে পড়তে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও কেউ একজন আত্মহত্যা করে ফেলেছে।    

আজকের এই আর্টিকেলে আত্মহত্যা সম্বন্ধিত সকল বিষয় আলোচনা করে যাওয়ার চেষ্টা করবো।

মানুষ আত্মহত্যা কেন করে?

আত্মহ্যার কারণ আসলে অসংখ্যা হতে পারে। আর ব্যক্তিভেদে কারণেরও পার্থক্য হয়ে থাকে।

ডিপ্রেশন ও মানসিক অসুস্থতা

আত্মহত্যা করার প্রধান কারণ নানাবিধ ডিপ্রেশন। ডিপ্রেশনকে নির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা দ্বারা স্পেসিফাই করার পক্ষে আমি না। এটা মানুষের জীবনের একটি ফেস(phase) বা অবস্থা যেটা খারাপ ঘটনার একটি সিরিজের যোগফল। এর ফলে যে কেউ একাকীত্ব বা আত্মগ্লানিতে ভুগতে পারে। ডিপ্রেশনের কারণ যেকোন খারাপ অভিজ্ঞতা বা ঘটনা হতে পারে। ৫০ শতাংশ আত্মহতাার কারণ ডিপ্রেশন।   

এবার আসি মানসিক রোগের দিকে। মানসিক রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করে সিজিওফ্রোনিক রোগীরা। এই রোগীরা তাদের আশেপাশে অদ্ভুত বা অস্বাভাবিক অবয়বের উপস্থিতি অনুভব করে। এমনকি তাদের সাথে কথাও বলতে পারে। এছাড়াও বাইপোলার ডিসঅর্ডার, বর্ডারলাইন পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার, ইটিং ডিসঅর্ডার ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত রোগীরাও মুক্তির জন্য আত্মহত্যাকে বেছে নেয়।

ট্রমাটিক স্ট্রেস

এটা হল খুব বড় কোন মানসিক আঘাত। ধরুণ বাল্যকালে ঘটা সেক্সুয়াল এবিউসের কোন ঘটনা, রেপ, ফিজিকাল এবিউস, ওয়ার ট্রমা বা চোখের সামনে খুব বড় কোন যুদ্ধ হতে দেখেছে। এধরণের ঘটনা একটি মানুষকে ভেতর থেকে শূণ্য করে দিতে পারে। ২২ শতাংশ রেপ ও ২৩ শতাংশ ফিজিকাল এবিউস ভিকটিমরা আত্মহত্যার চেষ্টা করে।

খুব বড় কোন কিছু হারানোর ভয়

এটা যেকোন গুরুত্বপূর্ণ কিছু হতে পারে। সামাজিক অবস্থা, চাকরী, টাকা-পয়সা, বাবা-মা, বন্ধু, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ইত্যাদি। আবার কোন লজ্জ্বাকর পরিস্থিতি বা জেলে যাওয়ার ভয় থেকেও হতে পারে। আবার এসব ঘটনার থেকে ডিপ্রেশনও হতে পারে।

হোপলেস হওয়া, নিজের উপর হতে বিশ্বাস হারানো, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা থেকেও মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে।

বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যার পরিমাণ

বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যার পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিটি জাতি, সংস্কৃতিকেই প্রভাবিত করেছে আত্মহত্যা। আত্মহতাার হারের মানিচিত্র দেখলে বিষয়টি আরো ভালো বোঝা যায়। কোন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের দেশগুলোতে আত্মহত্যা বেশি হচ্ছে- একথা এখন আর বলা যাচ্ছে না। আত্মহত্যার হারে এগিয়ে থাকা দেশগুলো হল-

  • লিথুয়ানিয়া। আত্মহত্যার হার ৩১.৯
  •  রাশিয়া। আত্মহত্যার হার ৩১
  • গায়ানা। আত্মহত্যার হার ২৯.২
  • সাউথ কোরিয়া। আত্মহত্যার হার ২৬.৯   
  • বেলারাস। আত্মহত্যার হার ২৬.২
  • সুরিনেম ও কাজাগিস্তান। উভয়েরই আত্মহত্যার হার ২২

এখানে আত্মহত্যার হার প্রতি ১ লক্ষ মানুষে হিসাব করা হয়েছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়টি হচ্ছে ভূটানেও আত্মহত্যার হার ১১.৪। ভূটান অন্যান্য দেশ থেকে আলাদা। তারা সুখী জীবনের উপর গুরুত্ব দেয় বেশি। তারা তাদের আর্থ সামাজিক অবস্থার মান নির্ণয় করে GDH (Gross Domestic Happiness) দ্বারা। জিডিপি সেখানে মূখ্য বিষয় না। তারপরেও ভূটানের আত্মহত্যার হার উল্লেখযোগ্য। এদের বাইরে আত্মহত্যায় এগিয়ে রয়েছে জাপান, চায়না ও আমেরিকার মত উন্নত রাষ্ট্র। বিভিন্ন দেশের আত্মহত্যার হার জানতে ক্লিক করুন এখানে

প্রতি ১ লক্ষ মানুষে পৃথিবী জুড়ে আত্মহত্যার হার
২০১৬ সালে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আত্মহত্যার হার

জাপানে আত্মহত্যা একটি মারাত্মক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ২০-৪৪ বছর বয়সী পুরুষ এবং ১৫-৩৪ বছর বয়সী নারীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ আত্মহত্যা। নারীদের চেয়ে পুরুষদের আত্মহত্যার হার দ্বিগুণ। শুধু জাপান নয় বরং সমগ্র পৃথিবী জুড়েই পুরুষদের আত্মহত্যার হার অনেক বেশি। আগে থেকে জেনে না থাকলে হয়তো অবাকই হবেন, পৃথিবীর মোট আত্মহত্যার ৭৬ শতাংশ আত্মহত্যা করে পুরুষরা। যাহোক, পুরুষদের বেশি আত্মহত্যার বিষয়টি পরবর্তী আর্টিকেলে নাহয় কথা বলবো। 

চায়নাতে আত্মহত্যা মৃত্যুর পঞ্চম প্রধান কারণ হিসেবে রয়েছে। চায়নাতে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের পরিমাণ অনেক বেশি। নারী নির্যাতন চায়নার একটি বড় সমস্যা। তাই সেখানে নারী আত্মহত্যার হারই বেশি। তবে এখন চিত্র পাল্টাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে দেশটি এখন শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে। তাই নারী স্বাধীনতার পরিমাণও বেড়েছে। আর ফলাফল বিবাহ বিচ্ছেদ বা ডিভোর্সের হারের উর্ধ্বগামী যাত্রা।   

আমেরিকাতেও আত্মহত্যা একটি বড় সমস্যা। ২০১৭ সালে ৪৭১৭৩ জন আত্মহত্যা করে। আর আত্মহত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে মোট ১৪ লক্ষ বার। ২০১৫ সালে আত্মহত্যার প্রচেষ্টা জনিত কারণে আমেরিকার ব্যয় হয় ৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যারা আত্মহত্যা করেছে তাদের ৭০ শতাংশ পুরুষ। আর পুরুষদের আত্মহত্যার প্রবণতা নারীদের চেয়ে ৩.৫ গুণ বেশি। প্রতিদিন প্রায় ১২৯ জন আমেরিকান আত্মহত্যায় মারা যান।

বারবাডোজ আর এন্টিগুয়া এন্ড বারবুদা এই দুটি দেশে আত্মহত্যা প্রায় নেই বললেই চলে। এদুটি দেশে আত্মহত্যার হার যথাক্রমে ০.৮ ও ০.৫।

আত্মহত্যার উপায়

এ সম্পর্কে আসলে লেখার কিছু নেই। গলায় দড়ি আর বিষ খেয়েই অধিকাংশ মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে।

বাংলাদেশে আত্মহত্যা

বাংলাদেশেও আত্মহত্যা একটি বড় সমস্যায় পরিণত হচ্ছে দিনকে দিন। প্রতিবছর প্রায় ১১০০০ মানুষ তার জীবন দিচ্ছে আত্মহত্যার মাধ্যমে। আর এই পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন প্রায় ৩০ জন আত্মহত্যা করছে আমাদের দেশে। আমাদের দেশে আত্মহত্যার হার ৫.৯। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশি দেশগুলোতে অবস্থা আরও ভয়াবহ। ভারত ও শ্রীলঙ্কাতে আত্মহত্যার হার যথাক্রমে ১৬ ও ১৪ এর উপরে।

বাংলাদেশে আত্মহত্যার হার

আমাদের দেশে পুরুষদের চেয়ে নারীদের আত্মহত্যার হার বর্তমানে  বেশি থাকলেও সামনে মনে হয় আর বেশি থাকবে না। পূর্বের চেয়ে পুরুষের আত্মহত্যার হার ৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার আগের চেয়ে ৩ গুণ প্রায়।   

আত্মহত্যা কি মানসিক রোগের বহিঃপ্রকাশ?

অধিকাংশই মনে করবেন যে, আত্মহত্যা তারাই করে যারা মানসিক ভাবে দুর্বল একইসাথে মানসিক রোগীও বটে। কিন্তু বিষয়টি এতো সহজ না। মানসিক রোগ নয় বরং মানসিক স্বাস্থ্যহানির একটি বহিঃপ্রকাশ হল আত্মহত্যা। মানসিক রোগ, মানসিক স্বাস্থ্যহানির কারণেই হয় কিন্তু তবুও একটি বিস্তর ফাঁরাক রয়েছে। যদি এমনটা না হত তবে তো সকল মানসিক রোগীই আত্মহত্যা করতো। 

শারীরিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা কমবেশি সকলেই সচেতন। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর আছে ক’জনের? প্রায় নেই বললেই চলে। মানসিক স্বাস্থ্যহানি একদিনে ঘটে না। এটা একটা সিরিজের ফলাফল। সিরিজটা কি? সিরিজটা হল নিত্য ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা যা আপনি মেনে নিতে পারছেন না। মানসিক স্বাস্থ্যহানি বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না। পুরোটাই ঘটে মনের ভেতরে।

মেনে না নিতে পারা ঘটনার কারণে মানসিক স্বাস্থ্যহানি ঘটে। আর এটাই বেশি হয়ে গেলে সেটা মানসিক রোগে পরিণত হয়। এদের মধ্যে যারা প্রচন্ড আত্মগ্লানিতে ভোগে তারা আত্মহত্যা করে বসে। এধরণের মানুষের প্রতি আমরা কিছু না জেনে বুঝে দ্রুতই জাজমেন্টাল হয়ে পড়ি। তাদের চরিত্রে দুর্বলচিত্ত মন, স্বার্থপর  ইত্যাদির ট্যাগ লাগাই।

তারা মোটেও দুর্বল চিত্তের মানুষ না। পৃথিবীর সবাই একরকম হয় না। এটা চিরন্তন সত্য। তারা হয়তো তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়েই জীবনের সাথে যুদ্ধটা চালিয়ে যায়। কিন্তু যখন আর পেরে উঠে না তখনই তারা এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। তাদের সমস্যা একটাই। কোন ঘটনা মেনে নেওয়ার ক্ষমতা তাদের কম। আর এই মেনে নিতে না পারা থেকেই সব ঝামেলা। সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়তো এটাই, যে কোন কিছুকে একসেপ্ট করা বা মেনে নেওয়া।

আমদের পক্ষে জানা সম্ভব নয় কার মনে কি চলছে, বা কে কতটা বাজে সময় পাড় করছে। এটাই স্বাভাবিক, তাই না জেনে বুঝে কাউকে দুর্বল চিত্তের মানুষ বলাটাও ঠিক না। কিন্তু কিছু খবর আমরা পাই, অনেক অর্থহীন বিষয়ে অনেকেই আত্মহত্যা করে বসে। সেটা ব্যাতিক্রম। আবার কাউকে দেখবেন যা কিছুই হোক না কেন তাতেই সে মনে করে তার বেঁচে থাকার কোন মানে নেই। আত্মহত্যার চেষ্টা করে বসবে। এরা হচ্ছে মানসিক রোগী। এদের কাউন্সিলিং প্রয়োজন। এরা সাধারণত ডিপ্রেশন নয় হুজুকে পড়ে আত্মহত্যা করতে চায় আবার করতে গিয়ে ভয়ও পায়। এই হুজুক টাকেই তারা ডিপ্রেশন বলে। এদের যত দ্রুত পারুন সাইক্রিয়েটিস্টের কাছে নিয়ে যান।     

আত্মহত্যা রোধে করণীয় কি?

আপনি হয়তো জানেন না আপনার খুব কাছের বন্ধু বা পরিবারের সদস্য আত্মহত্যার কথা ভাবছে। তাই কাছের মানুষদের সময় দিন। তাদের বোঝার চেষ্টা করুন। কেউ যদি কখনও আত্মহতাার কথা বলে তবে তাকে মোটিভেট করার চেষ্টা করুন। সংশোধানাগারের শরনাপন্ন হোন।

কারো খারাপ সময়ের কথা শুনলে তার কাছে গিয়ে নিজের খারাপ সময়ের গল্প করবেন না। নিজের সমস্যাকে তার সামনে বড় করে দেখিয়ে তাকে মোটিভেট করার চেষ্টা করবেন না। এটা খুব সস্তা একটা পদ্ধতি। এতে হিতে বিপরীত হয়। মানসিক শক্তির যোগান দেওয়াটা খুব কঠিন একটি কাজ। কিন্তু পরিজনের জন্য এটুকু হয়তো করাই যায়।

যারা আত্মহত্যা করে তারা প্রচন্ড সাহসী, না হলে নিজের জীবন টা তারা নিতে পারতো না। যারা এরকম অবস্থায় রয়েছে তাদের শুধু দরকার সাহায্যের হাত। হয়তো আমি আপনিই পারবো নিজেদের কাছের কাউকে আত্মহত্যার হাত থেকে বাঁচাতে যদি একটু সচেতন হই।       

কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্টে জানাবেন।

তথ্যসূত্রঃ World Health Organization (WHO), Harvard Health Publishing, verywellmind, worldpopulationreview.com, BBC, afsp.org, ncbi.nlm.nih.gov,

https://bigganbortika.org/why_chickenpox_is_more_worse_for_adults_than_kids/                                                                                     

আপনার মতামত লিখুন :

ট্যাগ
Back to top button
Close